আজ সেই ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর; যেদিন সালাউদ্দিনরা গিয়েছিলেন জেলে

আজ সেই ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর; যেদিন সালাউদ্দিনরা গিয়েছিলেন জেলে

স্পোর্টস ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:৫৭ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৩:১৮ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

পুলিশের গাড়িতে সালাউদ্দিন (কালো চেক টি-শার্ট পরিহিত) ও অন্যরা

পুলিশের গাড়িতে সালাউদ্দিন (কালো চেক টি-শার্ট পরিহিত) ও অন্যরা

ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ ২১ সেপ্টেম্বর। নিতান্তই সাধারণ একটি তারিখ হলেও বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ এক কারণে দিনটি স্মরণীয় হয়ে আছে। এদিন খেলায় গন্ডগোলকে কেন্দ্র করে জেলে যেতে হয়েছিল চার তারকা ফুটবলারকে। তাদের মধ্যে ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনও। ক্রীড়াঙ্গনে আজকের দিনটি স্মরণীয় হয়ে আছে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর হিসেবে। 

মূল ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে ৩৮ বছর আগে, ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী-মোহামেডান। এখন তেমন উত্তেজনা না থাকলেও তখন ফুটবল মানেই ছিল অন্যরকম পাগলামি, রোমাঞ্চ। বিশেষ করে আবাহনী-মোহামেডান লড়াই মানেই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আলাদা আকর্ষণ। 

সন্ধ্যায় সুপার লিগে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল মুখোমুখি হয়। পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষে থেকে আগেই শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলেছিল মোহামেডান। কিন্তু মর্যাদার লড়াই বলে দুই দলের সমর্থকদের কাছে এই ম্যাচের গুরুত্ব ছিল অনেক। সেই ম্যাচে কোহিনূরের গোলে প্রথমার্ধে এগিয়ে যায় মোহামেডান। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই পুরো ম্যাচ ছিল আবাহনীর নিয়ন্ত্রণে, তবে কোনোভাবেই তারা সমতা ফেরাতে পারছিল না।

ম্যাচের ৮০ মিনিটে ঝামেলার সূত্রপাত। আবাহনীর খোরশেদ বাবুল ডি-বক্সের বাইরে থেকে মোহামেডানের পোস্ট লক্ষ্য করে দুর্দান্ত এক শট নেন। সাদা-কালোদের গোলরক্ষক মহসিন দৃঢ়তার সঙ্গে সেটি রুখে দেন। কিন্তু আবাহনীর খেলোয়াড়রা দাবি করে বসেন, বল ধরলেও মহসিন টাচলাইন ক্রস করেছেন। অর্থাৎ এটা গোল দিতে হবে। 

আটক হওয়ার পর সালাউদ্দিনসহ চার ফুটবলারসালাউদ্দিন, চুন্নু, হেলালরা লাইনসম্যান মহিউদ্দিনের কাছে তাৎক্ষণিক ছুটে যান। রেফারি মুনির হোসেনও তার কাছে জানতে চান গোলরক্ষক টাচলাইন ক্রস করেছিল কি না। যখন মহিউদ্দিন না করে দেন তখনই দুই দলের সমর্থকদের মাঝে ভয়ঙ্কর মারামারি বেঁধে যায়। আবাহনীও গোলের দাবিতে বাকি সময়ে খেলতে আপত্তি জানায়। এমতাবস্থায় ম্যাচটি পণ্ড হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্টেডিয়ামের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে গণ্ডগোল।

ফুটবলে এর আগেও এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে লিগের দুই প্রধান দলের ম্যাচে হট্টগোল হওয়াটা সেসময় ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সেদিনের ঘটনার জন্য আবাহনীকে দায়ী করে তাদের ফুটবলারদের সারা রাত রমনায় অবস্থিত অস্থায়ী আর্মি ক্যাম্পে রাখা হয়। সেসময় দেশে সামরিক শাসন থাকায় আবাহনীর পক্ষে কেউ কথা বলতে সাহস পাননি। 

পরদিন (২২ সেপ্টেম্বর) সবাইকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু আবাহনী অধিনায়ক আনোয়ার, কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু ও গোলাম রব্বানী হেলাল এই চার তারকা ফুটবলারের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহী মামলা করা হয়। এমনকি সংক্ষিপ্ত সময়ের মাঝে সেদিনই সামরিক আদালতে রায় দিয়ে তাদের জেলে পাঠানো হয়। দুপুরের দিকে ট্রেন যোগে সালাউদ্দিন ও চুন্নুকে যশোর এবং হেলাল ও আনোয়ারকে রাজশাহী কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

জেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ফুটবলারদেরবাংলাদেশ তো বটেই, পৃথিবীর আর কোথাও খেলার মাঠে হট্টগোলের জন্য ফুটবলারদের জেলে পাঠানোর ঘটনা নেই। ফলে চার ফুটবলারকে জেলে নেয়ার পর থেকেই সারা দেশে নিন্দার ঝড় বইতে থাকে। এমনকি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরাও এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিনা শর্তে চার ফুটবলারকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান। 

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে এই ভয়ে দুই সপ্তাহ পরই চার ফুটবলারকে মুক্তি দেয়া হয়। তারা মুক্তি পেলেও এই ঘটনা দেশের ফুটবলে অন্যতম এক দুঃখজনক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। এসব কারণে অনেকের কাছেই ২১ সেপ্টেম্বর তারিখটি ফুটবলের কালো রাত্রি বা ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। 

বাংলাদেশের ফুটবল তো বটেই, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরিয়ে আটকের এই ঘটনা বিশ্ব ফুটবলেও এক ন্যক্কারজনক ঘটনা হিসেবে অভিহিত হয়ে আছে। প্রতিবছর এই দিনটি পালিত হয় লজ্জার এক দিন হিসেবেই। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এএল