কারো মনে আঘাতকারী প্রকৃত মুমিন নয়

১ম পর্ব

কারো মনে আঘাতকারী প্রকৃত মুমিন নয়

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:১১ ৯ জানুয়ারি ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

হযরত আবু মুসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, প্রকৃত মুসলমান সে, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। অর্থাৎ না তার মুখে কেউ কষ্ট পায় না তার হাতে। 

এ হাদিসে রাসূল (সা.) মুসলমানদের পরিচয় দিয়েছেন। যা মধ্যে এ গুণ পাওয়া যাবে সেই প্রকৃত মুসলমান। অতএব যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে না সে মুসলমান বলার উপযুক্ত নয়। যে ব্যক্তি নামায পড়ে না তাকে যেমন কোনো মুফতি কাফের হওয়ার ফতওয়া দেয় না, বলে না-সে কাফের হয়ে গেছে, তবে সে মুসলমান বলার উপযুক্ত নয়। কারণ সে আল্লাহ প্রদত্ত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফরয আদায় করেনি। এমনিভাবে যে ব্যক্তির মুখ ও হাতে অন্য মানুষ কষ্ট পায়, যদিও কোনো মুফতি তাকে কাফের বলবে না তবে সে প্রকৃত মুসলমান বলার উপযুক্ত নয়। কারণ সে মুসলমানের কাজ করছে না।

অন্যকে কষ্ট প্রদান হতে বেঁচে থাক  
নফল নামায, তাসবীহ, যিকির-আযকার যদি তুমি করতে পার, ইনশাআল্লাহ আখেরাতে সওয়াব। আর যদি করতে না পার পরকালে জবাবদিহি করতে হবে না। অমুক নফল কেন পড়নি? যিকির আযকার কেন করনি? অবশ্য এসবগুলো ফজিলতপূর্ণ কাজ, অবশ্যই করা চাই। করলে পরকালে সওয়াব পাবে। না করলে গুনাহ হবে না। অপরদিকে তোমার দ্বারা অন্য কেউ কষ্ট পেল, এটা কবিরা গুনাহ হয়ে গেল। এর জন্য পরকালে জবাবদিহি করতে হবে-এরূপ কেন করেছিলে? এই কারণে কোন সময় যদি নফল নামায ও ইসলামি জীবন বিধানের মধ্যে দ্ব›দ্ব হয়ে যায়, নফল নামায পড়বে না ইসলামি জীবন যাপনের বিধানের উপর আমল করে অন্যকে কষ্ট থেকে বাঁচাবে, এ ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হলো নফল নামায ছেড়ে জীবন যাপনের বিধানের উপর আমল করবে।

এমন ব্যক্তির মসজিদে আসা জায়েজ নেই  
সমস্ত ফোকাহায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত- যদি কোনো ব্যক্তি দুর্গন্ধযুক্ত, ঘৃণার্হ্য কোনো রোগে আক্রান্ত হয়, তার জন্য মসজিদে এসে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করা জায়েজ নেই। শুধু এটা নয় যে, জামাতের সঙ্গে নামায আদায়ের হুকুম তার থেকে রহিত হয়ে গেছে, বরং জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করা জায়েজ নেই। যদি সে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করে গুনাহগার হবে। কারণ যদি সে মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করে, তার পাশে দন্ডায়মান ব্যক্তির কষ্ট হবে।  

লক্ষণীয় বিষয় হলো মানুষকে কষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য জামাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ এবাদত ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

হাজরে আসওয়াদ চুমুকালে কষ্ট দেয়া  
হাজরে আসওয়াদ-এর ফজিলত ও গুরুত্ব কে না জানে? হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া অনেক পুণ্যময় কাজ। হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া মানুষের পাপ মুছে দেয়। রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম খেয়েছেন, এর দ্বারা তার মর্যাদাই প্রতীয়মান হয়।

অপরদিকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-হাজরে আসওয়াদ চুমুকালে কাউকে ধাক্কা দিয়ে কষ্ট দেয়ার আশংকা হয়, তখন হাজরে আসওয়াদকে চুমু দেয়া জায়েজ নেই, বরং পাপ। দেখুন, মানুষকে কষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য শরীয়ত হাজরে আসওয়াদ চুমু খাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এবাদত ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।

উঁচু আওয়াজে তেলাওয়াত করা  
কোরআনে কারিম তেলাওয়াত করা একটি এবাদত। এত গুরুত্বপূর্ণ এবাদত-এক অক্ষরে দশ নেকি লেখা হয়। যেন তেলাওয়াতের সময় পুণ্যের ভান্ডার জমা হয়ে যায়। সমস্ত যিকির-আযকার ও তাসবীহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো কোরআন তেলাওয়াত। তেলাওয়াতের মধ্যে উত্তম হলো-উচ্চস্বরে করা। আস্তে আস্তে তেলাওয়াতের চেয়ে উচ্চস্বরে তেলাওয়াতে সওয়াব বেশি। তবে যদি তেলাওয়াতের কারণে কারো ঘুম বা আরামে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়, তাহলে উচ্চস্বরে তেলাওয়াত করা জায়েজ নেই।

তাহাজ্জুদের সময় রাসূল (সা.) যেভাবে উঠতেন
  
নবী কারীম রাসূল (সা.) তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য উঠতেন। সমস্ত জীবনে কখনো তাহাজ্জুদ নামায ছাড়েননি। আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.) দয়াপরবশ হয়ে তাহাজ্জুদের নামায ওয়াজিব করেননি। তবে রাসূল (সা.)-এর উপর তাহাজ্জুদের নামায ওয়াজিব ছিল। কখনো তিনি তাহাজ্জুদ কাযা করেননি। হাদিস শরিফে এসেছে, যখন তিনি তাহাজ্জুদের জন্য উঠতেন, আস্তে আস্তে উঠতেন। আস্তে আস্তে দরজা খুলতেন, যেন আমার এ আমলের কারণে আমার স্ত্রীর চোখ খুলে না যায় এবং তার ঘুম ভেঙ্গে না যায়। ‘অন্যকে কষ্ট দিও না’- এ নির্দেশে কোরআন-হাদিস পূর্ণ। পদে পদে শরীয়ত এর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে।

মানুষের যাত্রাপথে নামায পড়া  
মানুষের যাত্রাপথে নামাযের জন্য দাঁড়ানো জায়েজ নেই। কেউ কেউ এর প্রতি একেবারেই খেয়াল করে না। পুরো মসজিদ খালি রয়েছে, পেছনের সারিতে নামাযের জন্য দাড়িয়ে নিয়ত করে ফেলে। ফলে অতিক্রমকারী হয়ত নামাযির পেছন দিয়ে দীর্ঘ পথ মাড়িয়ে যেতে হবে অথবা নামাযির সামনে অতিক্রম করে পাপে জড়াবে। এভাবে নামায পড়া জায়েজ নেই, বরং পাপ।

“মুসলিম” শব্দে নিরাপত্তা রয়েছে  
হাদিস শরিফে এসেছে- মুসলমান সে যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। যেন এ কথার প্রতি ইঙ্গিত যে, মুসলমান শব্দের ভেতরেই ‘সালামতি’ বা নিরাপত্তা রয়েছে।
 
আসসালামু আলাইকুম-এর অর্থ  
অন্যান্য ধর্মাবলম্বী লোকেরা যখন পরস্পর সাক্ষাত করে কেউ বলে- হ্যালো, কেউ বলে-গুডনাইট, গুডমর্নিং, কেউ বলে-নমষ্কার, কেউ বলে- আদাব। বিভিন্ন জন পরস্পরে সম্বোধনের জন্য বিভিন্ন শব্দ অবলম্বন করে রেখেছে। তবে ইসলাম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে- যখন তোমরা পরস্পর সাক্ষাত কর, বলো-আসসালামু আলাইকুম। যার অর্থ -তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।

একদিকে তো এতে শান্তি ও নিরাপত্তার দোয়া রয়েছে। অন্যদের সম্বোধনে কোনো দোয়া নেই। এ কারণে শ্রোতা ওই শব্দগুলোর মাধ্যমে কোনো উপকার লাভ করে না। তবে কেউ যখন বলে, সে শ্রোতাকে তিনটি দোয়া দেয়। অর্থাৎ তোমার উপর শান্তি, রহমত ও বরকত নাযিল হোক। যদি একবারের সালামও কোনো মুসলমানের ব্যাপারে আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়, তাহলে সমস্ত জীবনের বেড়া পার হয়ে যাবে। সালামের মাধ্যমে দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, দু’জন মানুষের সাক্ষাতের সময় যে জিনিসটি বেশি কাঙ্খিত, তা হলো পরস্পরের নিরাপত্তা, কাউকে কষ্ট না দেয়া। মুসলমান সাক্ষাতকালে এ বার্তা দিচ্ছে আমি তোমার জন্য নিরাপত্তা নিয়ে এসেছি। আমি তোমার জন্য শাস্তি ও কষ্টদায়করূপে আসিনি।

মুখে কষ্ট না দেয়ার অর্থ  
এ হাদিসে দু’টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। হাত এবং মুখ। অন্য মুসলমান দু’পি জিনিস থেকে নিরাপদ থাকবে। ১. হাত থেকে, ২. মুখ থেকে। মুখ থেকে নিরাপদ থাকার অর্থ হলো-সে এমন কথা বলবে না যা শ্রোতাকে কষ্ট দেয়। যদি কোন মুসলমানের কোন বিষয়ে সমালোচনা করতেই হয়, তাহলে এমন শব্দ ব্যবহার করবে যাতে তার মনে একেবারেই কষ্ট না হয় বা কম হয়। উদাহরণস্বরূপ- তাকে বলে দেবে-আপনার অমুক কথা আমার কাছে ভালো লাগেনি। বা আপনার অমুক কথার ব্যাপারে আরো চিন্তা করুন। সেটি সংশোধনযোগ্য ও শরীয়ত মোতাবেক নয়। তবে এমন কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা যার দ্বারা তাকে মন্দ বলা হয়, যেমন গালি দেয়া বা তিরষ্কার করা বা সরাসরি না বলে পেঁচিয়ে এমনভাবে কথা বলা যা হৃদয়কে আহত করে। আরবী কবির একটি কবিতা-

বর্শাঘাতে ক্ষত জোড়া লেগে যায় * আর রসনার আহত ভঙ্গুর থেকে যায়

এই জন্য কারো কোন কথা তোমার পছন্দ না হলে পরিষ্কারভাবে বলে দাও-আপনার অমুক কথা আমার কাছে পছন্দনীয় নয়। কোরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে- হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো, সত্য সঠিক কথা বলো। পেঁচিয়ে কথা বলা অপছন্দনীয়। বর্তমানে তীর্যক কথাবার্তা বলা একটি বিষয় হয়ে গেছে। অর্থাৎ সরাসরি না বলে পেঁচিয়ে বা ইশারায় কথা বলা। যে কথায় অপর ব্যক্তি অস্থির হয়ে যায়। মানুষ এদের খুব প্রশংসা করে যে, লোকটি খুব জোকার, রসিক, চমৎকার কথাশিল্পী।

বাকি অংশ জানতে ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গেই থাকুন...

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে