ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয় ও অপব্যয় (শেষ পর্ব)

ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয় ও অপব্যয় (শেষ পর্ব)

মুহাম্মাদ আকবার হোসাইন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৪০ ২১ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৯:৪২ ২১ অক্টোবর ২০২০

‘নিচের হাতের চেয়ে উপরের হাত উত্তম। উপরের হাত হচ্ছে দাতা আর নিচের হাত হচ্ছে গ্রহীতা’।  (বুখারি হা/১৪২৯, ‘জাকাত’ অধ্যায়; মিশকাত হা/১৮৪৩) 

‘নিচের হাতের চেয়ে উপরের হাত উত্তম। উপরের হাত হচ্ছে দাতা আর নিচের হাত হচ্ছে গ্রহীতা’।  (বুখারি হা/১৪২৯, ‘জাকাত’ অধ্যায়; মিশকাত হা/১৮৪৩) 

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 

لاَ يَنْظُرُ اللهُ إِلَى مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلاَءَ 

‘যে ব্যক্তি অহংকারবশত তার কাপড়কে (টাখনুর নীচে) ঝুলিয়ে পরে (কেয়ামতের দিন) আল্লাহ তায়ালা ওই ব্যক্তির প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না’। (বুখারি হা/৫৭৮৩, ৫৭৮৮ ‘পোষাক’ অধ্যায়)

আরো দেখুন >>> ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয় ও অপব্যয় (পর্ব-২)

আর অপচয় ও অপব্যয়ের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে অহংকার। কেননা সাধারণতঃ অহংকার বশেই মানুষ প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয় করে। যা অপচয়ের শামিল। কাজেই অহংকার পরিত্যাগ করতে পারলে অপচয় থেকে বেঁচে থাকাও সক্ষম হবে।

৪. বিলাসবহুল জীবন যাপন না করা : দুনিয়ার চাকচিক্য ও বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে না দেয়া। বিলাসিতাকে ইসলাম সমর্থন করে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيْهَا فَفَسَقُوْا فِيْهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيْرًا 

‘যখন আমরা কোনো জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন আমরা সেখানকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নির্দেশ দেই। তখন তারা সেখানে পাপাচারে মেতে ওঠে। ফলে তার ওপর শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। অতঃপর আমরা ওটাকে বিধ্বস্ত করে দেই’। (সূরা:বনী ইসরাঈল ১৭/১৬)

৫. দুনিয়া বিমুখতা : এটি একটি প্রশংসনীয় গুণ। খুব কম মানুষই এই গুণে গুণান্বিত হতে পারে। নবী-রাসূলগণ এ গুণের অধিকারী ছিলেন। আর এ গুণের অধিকারী হতে হলে অবশ্যই নিজের চাহিদাকে সংবরণ করতে হয় এবং নিজের উপরে অপরকে প্রাধান্য দিতে হয়। আর অর্থনীতির ক্ষেত্রে তা অনেক কল্যাণকর। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَالَّذِيْنَ تَبَوَّءُوْا الدَّارَ وَالْإِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّوْنَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُوْنَ فِيْ صُدُوْرِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوْا وَيُؤْثِرُوْنَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوْقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ 

‘আর যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে এ নগরীতে বসবাস করত এবং ঈমান এনেছিল। যারা মুহাজিরদের ভালোবাসে এবং তাদেরকে (ফাই থেকে) যা দেওয়া হয়েছে, তাতে তারা নিজেদের মনে কোনোরূপ আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না। আর তারা নিজেদের উপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তাদেরই রয়েছে অভাব। বস্ত্ততঃ যারা হৃদয়ের কার্পণ্য হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম’। (সূরা: হাশর ৫৯/৯)

৬. জীবিকা উপার্জনে সতর্কতা অবলম্বন করা : জীবিকা উপার্জন ভালোভাবে বুঝে শুনে করা। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, কিছু সংখ্যক আনছার সাহাবি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট কিছু চাইলে তিনি তাদের দিলেন। পুনরায় তারা চাইলে তিনি তাদের দিলেন। এমনকি তার নিকট যা ছিল সবই শেষ হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, 

مَا يَكُونُ عِنْدِى مِنْ خَيْرٍ فَلَنْ أَدَّخِرَهُ عَنْكُمْ، وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللهُ، وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللهُ، وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرْهُ اللهُ، وَمَا أُعْطِىَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ 

‘আমার নিকট যে সম্পদ থাকে তা তোমাদের না দিয়ে আমার নিকট জমা রাখি না। তবে যে যাচ্ঞা থেকে বিরত থাকে, আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে রাখেন। আর যে পরমুখাপেক্ষী হয় না, আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত রাখেন। যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করে আল্লাহ তাকে সবর দান করেন। সবরের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নেয়ামত কাউকে দেয়া হয়নি’।  (বুখারি হা/১৪৬৯, ‘জাকাত’ অধ্যায়; মিশকাত হা/১৮৪৪)

সুতরাং মনের দিক থেকে অল্পে তুষ্ট থাকা, কারো নিকটে হাত না পাতা, ধৈর্যধারণ করা কাম্য। আর শারীরিক দিক থেকে কাম্য হলো কাজ করে হালাল পথে জীবিকা উপার্জন করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,

لأَنْ يَأْخُذَ أَحَدُكُمْ حَبْلَهُ فَيَأْتِىَ بِحُزْمَةِ الْحَطَبِ عَلَى ظَهْرِهِ فَيَبِيعَهَا فَيَكُفَّ اللهُ بِهَا وَجْهَهُ، خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ أَعْطَوْهُ أَوْ مَنَعُوْهُ 

‘তোমাদের কেউ তার রশি নিয়ে জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ করে পিঠে বহন করে বাজারে যায়, তারপর সেখানে তা বিক্রি করে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করবেন, এটা মানুষের কাছে তার হাত পাতার চেয়ে উত্তম। কারণ মানুষ তাকে কিছু দিতেও পারে, নাও দিতে পারে’। (বুখারি হা/১৪৭১)

এজন্যই মক্কার লোকেরা ব্যবসা করত, আর মদিনার লোকেরা চাষাবাদ করত।

৮. নিজস্ব আয়ের মধ্যেই ব্যয় সীমাবদ্ধ করা : রাসূল (সা.) বলেন,

فِرَاشٌ لِلرَّجُلِ وَفِرَاشٌ لاِمْرَأَتِهِ وَالثَّالِثُ لِلضَّيْفِ وَالرَّابِعُ لِلشَّيْطَانِ 

‘একটি বিছানা স্বামীর জন্য, আরেকটি স্ত্রীর জন্য, তৃতীয়টি মেহমানের জন্য আর চতুর্থটি শয়তানের জন্য’। (মুসলিম হা/৫৫৭৩) 

এর উদ্দেশ্য হলো খরচ কম করা, যাতে করে ঋণ করতে অন্যের দারস্থ হতে না হয়। নিজের সম্পদ দ্বারাই যেন নিজের ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয়।

৯. দানের অভ্যাস করা : রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 

الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى، فَالْيَدُ الْعُلْيَا هِىَ الْمُنْفِقَةُ، وَالسُّفْلَى هِىَ السَّائِلَةُ 

‘নিচের হাতের চেয়ে উপরের হাত উত্তম। উপরের হাত হচ্ছে দাতা আর নিচের হাত হচ্ছে গ্রহীতা’।  (বুখারি হা/১৪২৯, ‘জাকাত’ অধ্যায়; মিশকাত হা/১৮৪৩) 

হাদিছের উদ্দেশ্য হলো, সামাজ থেকে দারিদ্র্য দূর করা, যাতে দানকারীর সংখ্যা বেশি হয় এবং গ্রহণকারীর সংখ্যা হ্রাস পায়।

এছাড়া পরকালে হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে চিন্তা করা, রাসূল (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিনের জীবন পরচালনা পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হওয়া, অপচয়কারীদের সাহচর্য পরিহার করা এবং মৃত্যু সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে অপব্যয় ও অপচয় থেকে বিরত থাকা সম্ভব হবে। ইনশাআল্লাহ!

অপচয়ের বদঅভ্যাস আমাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। আমরা হরহামেশা এ জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়ে আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হচ্ছি। অথচ ইসলাম অপচয় ও অপব্যয়কে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে। কোনো মুসলিম কখনো তার অর্থ-সম্পদের সামান্য অংশও অপচয় কিংবা অপব্যয় করতে পারে না।

অপচয়-অপব্যয় বন্ধ করতে হলে, শুরু করতে হবে নিজ থেকেই। ব্যক্তি যখন নিজে অপচয় ও অপব্যয় না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করে পরকালে জবাবদিহিতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে, তখনই কেবল অপচয় ও অপব্যয় বন্ধ হতে পারে, অন্যথা নয়। তাই ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত সব স্তরেই এই অপচয় ও অপব্যয় থেকে বিরত থাকা আবশ্য কর্তব্য। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দান করুন। আমিন!

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে