দরিদ্রদের প্রতি ইসলামের সম্মান (শেষ পর্ব)

দরিদ্রদের প্রতি ইসলামের সম্মান (শেষ পর্ব)

ওমর শাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:২৩ ২০ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৮:২৬ ২০ অক্টোবর ২০২০

বেহেশতে প্রবেশকারী অধিকাংশ লোক মিসকিন।

বেহেশতে প্রবেশকারী অধিকাংশ লোক মিসকিন।

নিম্ন শ্রেণির লোকদের সঙ্গে আমাদের আচরণ:

এ সব হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, কোনো মানুষের বাহ্যিক অবস্থা দেখে তাকে মামুলি ও মূল্যহীন মনে করা ঠিক হবে না। মুখে তো আমরা বলি, সব মুসলমান ভাই ভাই। আল্লাহ তায়ালার নিকট আমির গরিব সমান। আল্লাহ তায়ালার কাছে দরিদ্রদের অনেক মর্যাদা।

আরো দেখুন >>> দরিদ্রদের প্রতি ইসলামের সম্মান (পর্ব-২)

প্রশ্ন হলো, যখন আমরা তাদের সঙ্গে আচরণ করি, তখন কি এ কথাগুলো আমাদের মনে থাকে? নিজের চাকর-বাকরদের সঙ্গে, সেবক অধীনস্তদের সঙ্গে এবং দরিদ্র লোকদের সঙ্গে আচরণের সময় কি এ কথাগুলো আমাদের মনে থাকে কি না; মুখে তো আমরা বক্তব্য দিয়ে দিই ও বক্তব্য শুনি। তবে যখন করার বিষয় আসে তখন বেমালুম ভুলে যাই।

সেবকের সঙ্গে থানবি রহ. এর আচরণ:

হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (রহ.) এর এক সেবক ছিল ‘ভাই নিয়াজ’। খানকায় আগমনকারী সবাই তাকে ‘ভাই নিয়াজ’ বলে ডাকত। হজরত থানবি রহ. এর বিশেষ খাদেম ছিল। যেহেতু হজরতের খেদমত করতেন এবং হজরতের সোহবত লাভ করেছিলেন, এরূপ লোকদের মধ্যে কিছুটা অহংকার সৃষ্টি হয়ে যায়। এর ব্যতিক্রম ছিল না নিয়াজ। তার ভেতরেও কিছুটা অহংকারী ভাব দেখা দিয়েছিল। এ জন্য খানকায় আগমনকারীদের সঙ্গে কখনো রূঢ় আচরণ করে ফেলতেন।

এক ব্যক্তি হজরতের কাছে ভাই নিয়াজের ব্যাপারে অভিযোগ করলেন। হজরত! এ লোকটা মানুষের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করে। আমাকেও সে মন্দ বলেছে। ইতিপূর্বেও তার ব্যাপারে কয়েকটি অভিযোগ পৌঁছেছিল। এ জন্য হজরতের খুব কষ্ট লেগেছে। হজরত তাকে ডাকলেন। ধমক দিয়ে বললেন, মিয়া নিয়াজ! এটা তুমি কী করছ? সব মানুষের সঙ্গে ঝগড়া করে চলছ! এ কথা শুনেই উত্তর দিল, হজরত! মিথ্যা বলো না, আল্লাহকে ভয় করো। এ শব্দ একজন চাকর তার মালিককে বলেছে। মালিকও থানবি রহ. এর মতো মহান ব্যক্তি।

আসলে তার উদ্দেশ্য এটা ছিল না-হজরত! আপনি মিথ্যা বলবেন না। বরং উদ্দেশ্য ছিল, যারা আপনার কাছে অভিযোগ পেশ করেছে, তারা মিথ্যা অভিযোগ করেছে। তারা যেন মিথ্যা না বলে এবং আল্লাহকে ভয় করে। তবে অনিচ্ছায় মুখ থেকে এ শব্দ বের হয়ে গেছে মিথ্যা বলো না, আল্লাহকে ভয় করো। লক্ষণীয় বিষয় হলো, যদি কোনো মালিক তার চাকরকে ধমক দেয় আর চাকর বলে মিথ্যা বলো না, তখন তো মালিকের ক্রোধ আরো তীব্র হবে। তবে ইনি তো হাকীমুল উম্মত ছিলেন। তাই একদিকে চাকর বলছে ‘মিথ্যা বলো না, আল্লাহকে ভয় করো’ অন্যদিকে হজরত থানবি রহ. তৎক্ষনাত মাথানত করে বললেন,

أستغفر الله .. أستغفر الله .. أستغفر الله 

আল্লাহর বিধানের সামনে অবনত:

এরপর তিনি বললেন, আমার ভুল হয়ে গেছে, আমি এক পক্ষের কথা শুনে তাকে ধমক শুরু করেছি। অথচ শরীয়তের নির্দেশ হলো, কোনো এক পক্ষের কথা শুনে মীমাংসা করবে না, যতক্ষণ না দ্বিতীয় পক্ষের কথা শুনবে। প্রথমে আমি তাকে জিজ্ঞাসা না করে ধমক শুরু করেছি, ভুল করেছি। যখন সে বললো, আল্লাহকে ভয় করো, আমি আল্লাহ অভিমুখী হয়েছি। জানতে পেরেছি, বাস্তবেই আমার ভুল হয়েছে। আমি أستغفر الله ..  أستغفر الله ..  পড়েছি। তাদের ব্যাপারেই বলা হয়েছে,

كان وقافا عند حدود الله

আল্লাহর বিধানের সামনে নত হয়ে যায়। খাদেম, চাকর, অধীনস্তদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা চাই। তাদেরকে কখনো অবজ্ঞা করা উচিত নয়।

বেহেশতের অধিকাংশ মানুষ মিসকিন শ্রেণির,

عن أسامة رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه و سلم قال : قمت على باب الجنة، فكان عامة من دخلها المساكين، غير أن أصحاب النار قد أمر يهم إلى النار و قمت على باب النار، فإذا عامة من دخلها النساء

হজরত উসামা (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বড় প্রিয় সাহাবি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পোষ্যপুত্র হজরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) এর ছেলে। তিনি বর্ণনা করেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি বেহেশতের দরজায় দাঁড়িয়ে আছি। সম্ভবত এটা মেরাজের ঘটনা হবে। কারণ মেরাজের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বেহেশত-দোযখ উভয়টা ভ্রমণ করানো হয়েছে।

অথবা অন্য কোনো স্থানে স্বপ্নযোগে বা কাশফ (আউলিয়াদের মনে যে খবর প্রকাশ পায়) এর জগতে এরূপ হয়ে থাকবে। আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। আমি দেখলাম বেহেশতের অধিকাংশ লোক মিসকিন শ্রেণির লোক। আমি দেখলাম স্বচ্ছল, পদ মর্যাদার অধিকারী, সম্পদশালীদেরকে-যাদেরকে দুনিয়ায় সৌভাগ্যবান মনে করা হতো, তাদেরকে বেহেশতের দরজায় আটকে দেয়া হবে।

যেমন কেউ তাকে প্রবেশ থেকে বাধা দিয়েছে। আটকে দেয়ার দুই অর্থ। ১. সে বেহেশতে প্রবেশের উপযুক্ত ছিল তবে যতক্ষণ পর্যন্ত হিসাব-কিতাব পরিষ্কার না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশের অনুমতি হবে না। এ জন্য সে দরজায় দণ্ডায়মান থাকবে। তাদের মধ্যে যারা দোযখী, তাদের ব্যাপারে হুকুম হবে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার। দোযখের দরজায় দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম, দোযখে প্রবেশকারী অধিকাংশই নারী।

মিসকিনগণ বেহেশতে যাবে:

এ হাদিসের দু’টি অংশ বর্ণনা করেছেন। ১. বেহেশতে প্রবেশকারী অধিকাংশ লোক মিসকিন। এর বিস্তারিত আলোচনা পেছনে চলে গেছে। মিসকিন দ্বারা দরিদ্র বা ফকির উদ্দেশ্য হওয়া আবশ্যক নয়। বরং যাদের স্বভাব নম্র আল্লাহ চাহে তো তারাও মিসকিনদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে