ফেতনার যুগের আলামত (শেষ পর্ব)

ফেতনার যুগের আলামত (শেষ পর্ব)

ওমর শাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৩৩ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৯:৩৭ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

‘হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ফেতনা থেকে পানাহ চাই। (মুসনাদে আহমদ)।

‘হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ফেতনা থেকে পানাহ চাই। (মুসনাদে আহমদ)।

মতবিরোধ সত্ত্বেও পারস্পরিক সুসম্পর্ক: মতবিরোধ সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্পর্ক কিরূপ হবে, আল্লাহ তায়ালা সাহাবায়ে কেরামের জীবনেই তা দেখিয়েছেন।

যেসব সাহাবি হজরত মুয়াবিয়া (রা.) হকের ওপর আছেন বলে মনে করতেন তারা হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) পক্ষ অবলম্বন করেছেন আর যারা হজরত আলি (রা.) হকের ওপর আছেন বলে মনে করতেন তারা হজরত আলি (রা.) এর পক্ষ অবলম্বন করেছেন। কোনো এক পক্ষ অবলম্বন করা সত্ত্বেও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এত সহানুভূতিপূর্ণ ছিল, পৃথিবীর ইতিহাস যা পূর্বে কখনো দেখেনি।

আরো পড়ুন >>> ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-৫)

উভয় পক্ষ নিজ নেতৃত্বের অনুকূলে লড়াই করছিল কিন্তু হজরত আলি (রা.) এর বাহিনীর কেউ ইন্তেকাল করলে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর লোকেরা তার জানাযায় শরিক হত। এবং হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর বাহিনীর কেউ ইন্তেকাল করলে হজরত আলি (রা.) এর লোকেরা তার জানাযায় শরিক হত। এর কারণ ছিল, তাদের লড়াই কোনো ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য ছিল না বরং হজরত আলি (রা.) আল্লাহ তায়ালার হুকুমের মর্ম এক রকম বুঝেছিলেন এবং তার ওপর আমল করছিলেন আর হজরত মুয়াবিয়া (রা.) অন্যরকম বুঝেছিলেন এবং তদানুযায়ী আমল করছিলেন। উভয়েরই লক্ষ্য ছিল আল্লাহ তায়ালার হুকুম পালন করা।

হজরত আবু হোরায়রা (রা.) এর কর্মপন্থা:

হজরত আবু হোরায়রা (রা.) শিক্ষক ছিলেন। তার কর্মপন্থা ছিল, তিনি উভয় পক্ষের লোকদের কাছেই যেতেন; বিশেষ কোনো পক্ষাবলম্বন করেননি। নামাজের সময় হলে হজরত আলি (রা.) এর সেনাছাউনিতে এসে আলি (রা.) এর পেছনে নামাজ পড়তেন। খাবারের সময় হলে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) এর সেনাছাউনিতে গিয়ে তাদের সঙ্গে খাবারে শরিক হতেন। একবার জনৈক ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করল, আপনি এরূপ কেন করেন? উত্তরে তিনি বলেন, নামাজ ওখানে ভালো হয় আর খাবার এখানে ভালো হয়।

রোম সম্রাট হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর জবাব:

সাহাবিদের এ দু’পক্ষের লড়াই চলাকালে একদিন রোম সম্রাটের একজন দূত হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর কাছে আসে। রোম সম্রাট হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-কে পত্রমারফত লিখেন, আমি শুনেছি, আপনার ভাই হজরত আলি (রা.) আপনার প্রতি জুলুম করছেন এবং হজরত উসমান (রা.) এর হত্যাকারীদের বিচার করছেন না। আপনি চাইলে আপনার সাহায্যার্থে আমি একটি বড় বাহিনী প্রেরণ করতে পারি, এতে আপনি হজরত আলি (রা.)-কে সহজেই পরাস্ত করতে পারবেন। 

উত্তরে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) তাৎক্ষণিকভাবে লিখে পাঠান, ‘এই খ্রিস্টান, তুমি ভাবছ আমাদের পারস্পরিক মতবিরোধের সুযোগ নিয়ে তুমি হজরত আলি (রা.) এর ওপর হামলা করবে, মনে রেখ, যদি তুমি হজরত আলি (রা.) এর প্রতি চোখ তুলে তাকানোর দুঃসাহস কর তাহলে হজরত আলি (রা.) এর বাহিনীর যে সৈন্যকে তুমি সর্বাগ্রে দেখবে, যে তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবে সে হলো মুয়াবিয়া।’ (তাজুল উরুস, ৭/২০৮)।

সব সাহাবি আমাদের কাছে সম্মানিত ও মর্যাদাবান:

আজকাল অনেক লোক সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করে অথচ সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা বুঝা সহজ কাজ নয়। আজ তাদের পারস্পরিক মতবিরোধ ও লড়াইকে আমরা আমাদের মতবিরোধ ও লড়াইয়ের মতো মনে করছি। 

অথচ প্রকৃত সত্য হলো, আল্লাহ তায়ালা তাদের পারস্পরিক লড়াই ও মতবিরোধকে উপলক্ষ করে পুরা উম্মতকে দিশা দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে মুসলমানদের মধ্যে কখনো এরূপ অবস্থা হলে কি কর্মপন্থা অবলম্বন করতে হবে। হজরত আলি (রা.), হজরত মুয়াবিয়া (রা.), হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হজরত আবু হোরায়রা (রা.), যে সাহাবিই হোক না কেন, প্রত্যেকের জীবনেই আমাদের জন্য আদর্শ আছে। তাই যারা সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক মতবিরোধকে কেন্দ্র করে তাদের সমালোচনা করে তাদের ব্যাপারে আমাদের সর্তক থাকতে হবে।

হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর তাকওয়া:

হজরত মুয়াবিয়া (রা.) নিজের ছেলে ইয়াজিদকে তার পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দান করেছিলেন, এ জন্য অনেক লোক তার সমালোচনা করে। অথচ ইতিহাসের কিতাবে লেখা আছে, একবার জুমার নামাজের খুতবায় মিম্বরের ওপরে দাঁড়িয়ে তিনি দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ! আমি যে আমার ছেলে ইয়াজিদকে আমার পরবর্তী খলিফারূপে মনোনীত করেছি। আপনি আমার নিয়ত সম্পর্কে অবগত আছেন। তাকে মনোনীত করার সময় মুসলমানদের কল্যাণচিন্তা ছাড়া আমার মাথায় কিছুই ছিল না। যদি আমার মনে এতদভিন্ন অন্য কোনো চিন্তা থাকে তাহলে আমি দোয়া করছি যে, হে আল্লাহ! আমার এ মনোনয়ন কার্যকর হওয়ার পূর্বেই আপনি তাকে দুনিয়া থেকে তুলে নিন। (তারিকুল খোলাফা)।

দেখুন, হজরত মুয়াবিয়া (রা.) জুমার খুতবার মতো দোয়া কবুলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যে দোয়া করেছেন কোনো পিতা নিজ সন্তানের জন্য এরূপ দোয়া করতে পারে না। এ থেকে বুঝা যায়, হজরত মুয়াবিয়া (রা.) যা কিছু করেছেন তা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে করেছেন। মানুষের ভুল হতে পারে, নবীরা ছাড়া যেকোনো মানুষের ভুল হতে পারে, সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে কিন্তু তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা আল্লাহর জন্য এখলাসের সঙ্গেই নিয়েছিলেন।

একলা চলার নীতি গ্রহণ কর:

মোটকথা, হজরত সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ফেতনার যুগের সব হাদিসের ওপর আমল করে ফেতনার যুগে আমাদের করণীয় কি, তার নমুনা রেখে গিয়েছেন। হজরত আলি ও হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর মাঝে যখন লড়াই হয় তখনো সাহাবায়ে কেরামের একটি বড় দল নিরপেক্ষ ছিলেন। এদের মধ্যে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এর মতো প্রখ্যাত সাহাবিও ছিলেন। সে যুগেও যখন হক ও বাতিল কোনটি তা নিশ্চিতভাবে চেনা যায়নি, নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করা ছাড়া এরূপক্ষেত্রে অন্য কোনো পথও ছিল না।

মূলত এটা আল্লাহ তায়ালারই বিস্ময়কর ফয়সালা ছিল যে, সাহাবায়ে কেরামের একটি বড় দল সেই যুগে নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিলেন। তাদের দ্বারা আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের অনেক বড় খেদমত নিয়েছেন। যদি সব সাহাবি যুদ্ধে শামিল হত, হয়ত অনেক সাহাবি শহিদ হয়ে যেতেন এবং তারা দ্বীনের যে আজিমুশ্বান খেদমত আনজাম দিয়েছিলেন তা তারা দিতে পারতেন না। 

যে সাহাবিরা নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন তারাই হাদিস সংকলনের সূচনা করেছিলেন এবং তাদের এ পদক্ষেপের কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত দ্বীন এবং তাঁর হাদিসসমূহ বিধিবদ্ধরূপে সংকলিত হয়।

নিজের ইসলাহের ফিকির কর:

যাহোক, ফেতনার যুগের নির্দেশ হলো ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাক এবং আল্লাহ আল্লাহ করো আর নিজের ইসলাহের ফিকির করো যে, আমি কীভাবে গুনাহ থেকে বেঁচে যেতে পারি, আল্লাহর অনুগত এবং বাধ্যগত বান্দা হতে পারি এবং আমি আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদেরকে আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে দ্বীনের ওপর রেখে যেতে পারি। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। নানাপ্রকার মানুষ নিয়েই সমাজ গড়ে উঠে। যদি একজন ব্যক্তির ইসলাহ হয় তাহলে কমপক্ষে একজন খারাপ লোক থেকে সমাজ মুক্ত হলো এবং তার দেখাদেখি আরো লোক যদি ভালো হয় এভাবে একজন-দুজন করেই একসময় সমাজ খারাপ লোক থেকে মুক্ত হবে।

নিজের দোষ দেখ:

বর্তমানে আমরা যে যুগে বাস করছি, এটি মারাত্মক ফেতনার যুগ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোদ্দশত বছর পূর্বে এ যুগের মুসলমানদের জন্য বলে গিয়েছেন যে, কোনো দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, ঘরেই নিভৃতে জীবনযাপন কর। কি ঘটেছে তা জানার জন্য কিংবা কৌতূহল মেটানোর জন্য ঘরের বাইরে যেও না, নিজের ইসলাহের ফিকির কর। দেখ, নিজের মধ্যে কি কি দোষ আছে, সমাজে যে ফেতনা ছড়িয়ে পড়েছে, হতে পারে তা আমার গুনাহরই ফল। 

প্রতিটি মানুষের এভাবেই চিন্তা করা উচিত যে, যা কিছু হচ্ছে তা আমার গুনাহর কারণে হচ্ছে। একবার হজরত জুননুন মিগরি (রহ.) এর কাছে কিছু লোক দুর্ভিক্ষ ও অভাবের অভিযোগ নিয়ে গেল। তিনি তাদের বলেন, এ সব কিছু আমার গুনাহর কারণে হচ্ছে, আমি এখান থেকে চলে গেলে হয়ত আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর রহমত নাজিল করবেন।

পক্ষান্তরে আজকে আমাদের অবস্থা হলো, আমরা শুধু অন্যদের দোষ দেখি; অমুকের মাঝে এই এই দোষ, অমুকের এই এই সমস্যা, এর কারণে আজকে সমাজে অশান্তি। নিজের দোষ দেখা লোকের সংখ্যা সমাজে আজ পাওয়া কঠিন। তাই এখনকার কাজ হলো, অন্যদের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের সংশোধনের ফিকির কর।

গুনাহ থেকে বাঁচাও:

নিজের সংশোধনের জন্য সর্বপ্রথম পদক্ষেপ হবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যেসব গুনাহ হয় সেগুলো একটি একটি করে ছাড়ার ফিকির করা। প্রতিদিন আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়ে বিনীতভাবে তাওবা ও ইসতেগফার করো। আল্লাহর কাছে দোয়া করো যে, হে আল্লাহ! এটা ফেতনার যুগ। আমাকে, আমার পরিবারকে এবং আমার ছেলে-মেয়েদেরকে নিজ অনুগ্রহে এ ফেতনা থেকে হেফাজত করুন।

اللهم انا نعوذبك من الفتن ما ظهر منها وما بطن

‘হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ফেতনা থেকে পানাহ চাই। (মুসনাদে আহমদ)।

দোয়া করার সঙ্গে সঙ্গে গিবত থেকে, চোখের গুনাহ থেকে, অশ্লীলতা ও উলঙ্গপনার গুনাহ থেকে, অন্যদের মনে কষ্ট দেয়ার গুনাহ থেকে, সুদ ও ঘুষের গুনাহ থেকে নিজেকে যথাসাধ্য বাঁচানো চেষ্টা করতে হবে। 

আল্লাহ তায়ালা আমাদের এসব কথার ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে