সব ভালো কাজের সূচনা বাক্য ‘বিসমিল্লাহ’ 

সব ভালো কাজের সূচনা বাক্য ‘বিসমিল্লাহ’ 

ধর্ম ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৪২ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৮:০২ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

আসুন, সব ভালো কাজ শুরু করার আগে আমরা বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি।

আসুন, সব ভালো কাজ শুরু করার আগে আমরা বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি।

পবিত্র কোরআনুল কারিমের ১১৪টি সূরার মধ্যে সূরা তওবা ছাড়া বাকি ১১৩টি সূরা শুরু করা হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে। 

بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ

বাংলায় উচ্চারণ: ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ 

বাংলা অর্থ: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। 

সংক্ষেপে বলা হয় বিসমিল্লাহ। 

এছাড়া হাদিস থেকে জানা যায়, প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলতেন।

আরো পড়ুন >>> অতীতের সব গুনাহ থেকে মুক্তির পথ

‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ অমূল্য ও অতুলনীয় এই বাক্যের মাধ্যমে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পায়।

যেকোনো ভালো কাজ ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে শুরু করা মানে আল্লাহর নাম নিয়ে কোনো কিছু শুরু করা। এতে আল্লাহ ওই কাজে রহমত ও বরকত দান করেন। 

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত থেকে শুরু করে আল্লাহর নির্দেশিত ও ইসলামি বিধানমতে সব ভালো কাজ শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হয়। কিন্তু অন্যায় ও ইসলামের বিরুদ্ধ-কাজের জন্য ‘বিসমিল্লাহ’ বলা আল্লাহদ্রোহের শামিল।

মহানবী রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক ভালো কাজের শুরুতে যদি ‘বিসমিল্লাহ’ বলা না হয়, তা হলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।’ (আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ)। আমরা অনেকেই সব কাজে দূরে থাক অন্তত খাওয়ার আগেও এই বিসমিল্লাহ বলতে অনেকে ভুলে যাই। বিসমিল্লাহ বলা সব মুসলমানের অবশ্যই উচিত। বিসমিল্লাহ বলে কোনো কাজ শুরু করা মানেই এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহই আমাকে এ কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন। যদি এ কাজে আল্লাহর সায় না থাকত, আমি কখনোই তা করতে পারতাম না। হে আল্লাহ! একমাত্র আপনার সন্তুষ্টির জন্যই এ কাজটি করছি। আপনি এ কাজে বরকত দিন।

কেউ কখনো হারাম কাজ করতে গিয়ে বিসমিল্লাহ বলতে পারে না। যদি বলে, সে আসলে দ্বিগুণ গুনাহ করছে। কারণ, সে যখন বলে বিসমিল্লাহ, সে তখন সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আল্লাহই তাকে এ কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন। অথচ আল্লাহ কখনোই সে কাজের বৈধতা দেননি। এটা হলো একটা গুনাহ। আর দ্বিতীয়টা হলো ওই হারাম কাজের গুনাহ।

কাজ ও কথার শুরুতেই বিসমিল্লাহ বলা মুস্তাহাব। হাদিসে এসেছে, যে কাজ বিসমিল্লাহ দ্বারা শুরু করা না হয় তা কল্যাণহীন ও বরকতশূন্য থাকে। এর মাধ্যমে কাজের শুরুতে আল্লাহর আনুগত্য করা ও বিনয় ভাব প্রকাশ পায়। এ বাক্যের মাধ্যমে কাজ শুরু করলে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত থাকা যায়।

হুজায়ফা (রা.) বলেন: নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘শয়তান সেই খাদ্যকে নিজের জন্য হালাল করে নেয়, যে খাদ্যের ওপর বিসমিল্লাহ বলা হয় না।’ (মুসলিম, আবু দাউদ)।

জাবির (রা.) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বিসমিল্লাহ বলে তুমি তোমার দরজা বন্ধ কর। কারণ শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। বিসমিল্লাহ বলে বাতি নিভিয়ে দাও। একটু কাঠখড়ি হলেও আড়াআড়িভাবে বিসমিল্লাহ বলে পাত্রের মুখ ঢেকে রাখ। বিসমিল্লাহ বলে পানির পাত্র ঢেকে রাখ।’ (বুখারি হাদিস:৩২৮০, মুসলিম হাদিস:২০১২, আবু দাউদ হাদিস: ৩৭৩১, তিরমিজি হাদিস: ২৮৫৭)।

আয়েশা (রা.) বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কোনো ব্যক্তি খাদ্য খাবে সে যেন বিসমিল্লাহ বলে। যদি বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায় তাহলে সে যেন বলে, বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু।’ (আবু দাউদ হাদিস: ৩৭৬৭, ইবনু মাজাহ হাদিস: ৩২৬৪)।

বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করলে আল্লাহ তাকে রহমত দান করেন, হেফাজতে রাখেন ও কাজে বরকত দান করেন। আনাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলে, ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।’ 

অর্থাৎ: ‘আল্লাহর নামে বের হলাম, আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম, আল্লাহ ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই, ক্ষমতা নেই; আল্লাহ তখন ওই ব্যক্তিকে শয়তানের হাত থেকে পথ রক্ষা করেন।’

বিসমিল্লাহর গুরুত্ব ও বরকত অপরিসীম। বিসমিল্লাহ না বলার কারণে নেক নিয়ত থাকলেও অনেক কর্মে বরকত না হওয়ায় অসম্মানিত হতে হয়। কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা হলে সে কাজে আল্লাহর রহমত ও বরকত অবধারিত হয়।

সাধারণত আয়াতের অনুবাদে বলা হয়ে থাকে, পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। এ অনুবাদ বিশুদ্ধ হলেও এর মাধ্যমে এ আয়াতখানির পূর্ণভাব প্রকাশিত হয় না। কারণ, আয়াতটি আরো বিস্তারিত বর্ণনার দাবী রাখে। প্রথমে লক্ষণীয় যে, আয়াতে আল্লাহর নিজস্ব গুণবাচক নামসমূহের মধ্য হতে ‘আর-রাহমান ও আর-রাহিম’ এ দু’টি নামই এক স্থানে উল্লিখিত হয়েছে।

‘রহম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে দয়া, অনুগ্রহ। এই ‘রহম’ ধাতু হতেই ‘রহমান’ ও ‘রহিম' শব্দদ্বয় নির্গত ও গঠিত হয়েছে। রহমান শব্দটি মহান আল্লাহ তায়ালার এমন একটি গুণবাচক নাম যা অন্য কারো জন্য ব্যবহার করা জায়েয নেই। (তাবারী)।

কোরআন ও হাদিসে এমনকি আরবদের সাহিত্যেও এটি আল্লাহ ছাড়া আর কারো গুণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। পক্ষান্তরে ‘রহিম’ শব্দটি আল্লাহর গুণ হলেও এটি অন্যান্য সৃষ্টজগতের কারো কারো গুণ হতে পারে। তবে আল্লাহর গুণ হলে সেটা যে অর্থে হবে অন্য কারো গুণ হলে সেটা সে একই অর্থে হতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

প্রত্যেক সত্তা অনুসারে তার গুণাগুণ নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। এখানে একই স্থানে এ দুটি গুণবাচক নাম উল্লেখ করার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কোনো কোনো তাফসীরকার বলেছেন যে, আল্লাহ ‘রহমান’ হচ্ছেন এই দুনিয়ার ক্ষেত্রে, আর ‘রাহিম’ হচ্ছেন আখেরাতের হিসেবে। (বাগভী)।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সর্বপ্রথম ‘ইকরা বিসমে’ বা সূরা আল-আলাক এর প্রাথমিক কয়েকটি আয়াত নাজিল হয়েছিল। এতে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নাম নিয়ে পাঠ শুরু করতে বলা হয়েছিল। সম্ভবত এজন্যই আল্লাহর এই প্রাথমিক আদেশ অনুযায়ী কোরআনের প্রত্যেক সূরার প্রথমেই তা স্থাপন করে সেটাকে রীতিমত পাঠ করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে।

বস্তুতঃ বিসমিল্লাহ প্রত্যেকটি সূরার উপরিভাগে অর্থ ও বাহ্যিক আঙ্গিকতার দিক দিয়ে একটি স্বর্ণমুকুটের ন্যায় স্থাপিত রয়েছে। বিশেষ করে এর সাহায্যে প্রত্যেক দুটি সূরার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করাও অতীব সহজ হয়েছে। হাদিসেও এসেছে, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরার শেষ তখনই বুঝতে পারতেন যখন বিসমিল্লাহ নাজিল করা হতো।’ (আবু দাউদ: ৭৮৮)।

তবে প্রত্যেক সূরার প্রথমে ও কোরআন পাঠের পূর্বে এ বাক্য পাঠ করার অর্থ শুধু এ নয় যে, এর দ্বারা আল্লাহর নাম নিয়ে কোরআন তেলাওয়াতে শুরু করার সংবাদ দেয়া হচ্ছে। বরং এর দ্বারা স্পষ্ট কণ্ঠে স্বীকার করা হয় যে, দুনিয়া জাহানের সমস্ত নিয়ামত আল্লাহর তরফ হতে প্রাপ্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে এ কথাও মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রতি যে দয়া ও অনুগ্রহ করেছেন বিশেষ করে দ্বীন ও শরীয়াতের যে অপূর্ব ও অতুলনীয় নিয়ামত আমাদের প্রতি নাজিল করেছেন, তা আমাদের জন্মগত কোনো অধিকারের ফল নয়। বরং তা হচ্ছে মহান আল্লাহ তায়ালার নিজস্ব বিশেষ মেহেরবানীর ফল।

তাছাড়া এই বাক্য দ্বারা আল্লাহর নিকট এই প্রার্থনাও করা হয় যে, তিনি যেন অনুগ্রহপূর্বক তার কালামে-পাক বুঝবার ও তদনুযায়ী জীবন যাপন করার তাওফিক দান করেন। এ ছোট্ট বাক্যটির অন্তর্নিহিত ভাবধারা এটাই। 

তাই শুধু কোরআন তেলাওয়াত শুরু করার পূর্বেই নয় প্রত্যেক জায়েয কাজ আরম্ভ করার সময়ই এটি পাঠ করার জন্য ইসলামি শরীয়াতে নির্দেশ করা হয়েছে। কারণ প্রত্যেক কাজের পূর্বে এটি উচ্চারণ না করলে উহার মঙ্গলময় পরিণাম লাভে সমর্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিভিন্ন কথা ও কাজে এই কথাই ঘোষণা করেছেন। যেমন, তিনি প্রতিদিন সকাল বিকেল বলতেন, 

بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ 

‘আমি সে আল্লাহর নামে শুরু করছি যার নামে শুরু করলে জমিন ও আসমানে কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারে না, আর আল্লাহ তো সব কিছু শুনেন ও সবকিছু দেখেন।’ (আবু দাউদ: ৫০৮৮, ইবনে মাজাহ: ৩৮৬৯),

অনুরূপভাবে যখন তিনি রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে চিঠি লিখেন তাতে বিসমিল্লাহ লিখেছিলেন (বুখারি, ৭),

তাছাড়া তিনি যেকোনো ভালো কাজে বিসমিল্লাহ বলার জন্য নির্দেশ দিতেন। যেমন, খাবার খেতে, (বুখারি ৫৩৭৬, মুসলিম: ২০১৭, ২০২২),

দরজা বন্ধ করতে, আলো নিভাতে, পাত্র ঢাকতে, পান-পাত্র বন্ধ করতে (বুখারি ৩২৮০),

কাপড় খুলতে (ইবনে মাজাহ ২৯৭, তিরমিযী: ৬০৬),

স্ত্রী সহবাসের পূর্বে (বুখারি: ৬৩৮৮, মুসলিম: ১৪৩৪),

ঘুমানোর সময় (আবু দাউদ: ৫০৫৪),

ঘর থেকে বের হতে (আবু দাউদ: ৫০৯৫),

চুক্তিপত্র/ বেচা-কেনা লিখার সময় (সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী: ৫/৩২৮),

চলার সময় হোঁচট খেলে (মুসনাদে আহমাদ: ৫/৫৯),

বাহনে উঠতে (আবু দাউদ: ২৬০২)

মসজিদে ঢুকতে (ইবনে মাজাহ: ৭৭১, মুসনাদে আহমাদ: ৬/২৮৩),

বাথরুমে প্রবেশ করতে (ইবনে আবি শাইবাহ: ১/১১),

হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে (সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী: ৫/৭৯),

যুদ্ধ শুরু করার সময় (তিরমিযী: ১৭১৫),

শক্র দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ব্যাথা পেলে বা কেটে গেলে (নাসায়ী: ৩১৪৯)

ব্যথার স্থানে ঝাড়-ফুঁক দিতে (মুসলিম: ২২০২),

মৃতকে কবরে দিতে (তিরমিযী: ১০৪৬)।

এ ব্যাপারে আরো বহু সহিহ হাদিস এসেছে। আবার কোথাও কোথাও ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ওয়াজিবও বটে যেমন, জবাই করতে (বুখারি: ৯৮৫, মুসলিম: ১৯৬০)।

আরো পড়ুন >>> কুকুর সম্পর্কে ইসলাম ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশনা

যেহেতু মানুষের শক্তি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ, সে যে কাজই শুরু করুক না কেন, তা যে সে নিজে আশানুরূপে সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন করতে পারবে, এমন কথা জোর করে বলা যায় না। এমতাবস্থায় সে যদি আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করে এবং আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহের প্রতি হৃদয়-মনে অকুণ্ঠ বিশ্বাস জাগরুক রেখে তার রহমত কামনা করে, তবে এর অর্থ এ-ই হয় যে, সংশ্লিষ্ট কাজ সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন করার ব্যাপারে সে নিজের ক্ষমতা যোগ্যতা ও তদবীর অপেক্ষা আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের ওপরই অধিক নির্ভর ও ভরসা করে এবং তা লাভ করার জন্য তারই নিকট প্রার্থনা করে।

বিসমিল্লাহর মর্মকথা আসলে আলোচনা করে শেষ করা যাবে না। এই বিসমিল্লাহর ফজিলত গুণেও শেষ করা যাবে না। আসুন, সব ভালো কাজ শুরু করার আগে আমরা বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে