আল্লাহর কোনো বান্দাকে খুশি করাও ইবাদত

আল্লাহর কোনো বান্দাকে খুশি করাও ইবাদত

ওমর শাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৪৫ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ২০:৪৭ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

অন্যের অন্তরে আনন্দ দিতে গিয়ে নিজে পাপে জড়াবে না।

অন্যের অন্তরে আনন্দ দিতে গিয়ে নিজে পাপে জড়াবে না।

ইবাদতের অনেক শাখা প্রশাখা রয়েছে। যেসব কাজে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন সব কিছুই ইবাদত ও নেকের কাজ। আল্লাহ তায়ালার পছন্দনীয় কাজগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে এক বান্দা অপর বান্দাকে কোনোভাবে আনন্দিত করা কিংবা খুশি করা। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-

عن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما قال، قال رسول الله صلى الله عليه و سلم :
أحب الأعمال إلى الله سرور يدخله على مسلم

হজরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তায়ালার কাছে পছন্দনীয় আমলের মধ্যে একটি হলো কোনো মুমিনকে আনন্দিত করা’।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একাধিক হাদিসে এবং তার কথা ও কাজের মাধ্যমে এ কথা স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো মুমিনকে আনন্দিত করা আল্লাহ তায়ালার কাছে অধিক পছন্দনীয়।

অন্তর খুশি করাই বড় হজ:

আমাদের সমাজে এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি দু’টোই রয়েছে, ভারসাম্যপূর্ণ কোনো পথ নেই। কিছু লোক তো এমন যারা কোনো মুসলমানকে আনন্দিত করার গুরুত্বই বোঝে না। তাদের জানা নেই এটা কত বড় এবাদত। কোনো মুসলমান বা মানুষকে আনন্দিত করলে আল্লাহ তায়ালা কি পরিমাণ সওয়াব দেন এর অনুভূতি আমাদের নেই। বুযুর্গরা বলেন-

دل   بدست  آور  کہ  حج  اکبر   است

‘কোনো মুসলমানের অন্তর খুশি করাই বড় হজ।’

অন্যকে খুশি করার সওয়াব:

একটু চিন্ত করুন। যদি এ হাদিসের শিক্ষার ওপর আমরা সবাই আমল করতে থাকি এবং প্রতিটি মানুষ এ কথা চিন্তা করে, আমি অন্য কাউকে খুশি করব, তাহলে এ দুনিয়া বেহেশতের নমুনা হয়ে যাবে। কোনো ঝগড়া বাকি থাকবে না। হিংসা বাকি থাকবে না। কেউ কাউকে কষ্ট দেবে না। তাই যত্ন করে অন্যকে খুশি করো। কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে অন্যকে খুশি করো।

যদি তোমরা সামান্য কষ্ট সহ্য কর, ফলে অন্য কেউ খুশি হয়ে যায়; কয়েক মুহূর্ত বা কয়েক মিনিটের যে কষ্ট তুমি পৃথিবীতে করেছ, এর বিনিময়ে পরকালে আল্লাহ তায়ালা যে সওয়াব দেবেন, তা এ মামুলি কষ্টের চেয়ে বহুগুণে উৎকৃষ্ট।

পাপের মাধ্যমে অন্যকে খুশি করবে না:

অপরদিকে কোনো কোনো লোকের মাঝে এ সীমালঙ্ঘন পরিলক্ষিত হয় যে, তারা বলে, যেহেতু অন্যকে খুশি করা বড় এবাদত তাই আমরা এ এবাদত করছি। চাই খুশি করাটা কোনো পাপ বা অবৈধ কাজের মাধ্যমে হোক না কেন। এটি একটি ভ্রষ্টতা। কারণ অন্যদের খুশি করার অর্থ বৈধ পদ্ধতিতে খুশি করা। যদি অবৈধ পদ্ধতিতে অন্যকে খুশি কর, তাহলে এর অর্থ হবে পাপ করে আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে বান্দাকে খুশি করছ, এটা কোনো এবাদত নয়। সুতরাং যদি অন্য কারো প্রতি রেয়ায়েত করে বা তার সম্পর্কের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পাপে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এটা দ্বীন নয়, এটা কোনো এবাদত নয়।

কবি ফায়জির ঘটনা:

বাদশাহ আকবরের জমানায় ফয়জি নামে একজন বড় সাহিত্যিক ও কবি অতিক্রান্ত হয়েছে। একবার সে নাপিত দ্বারা দাড়ি কাটাচ্ছিল। তার পাশ দিয়ে এক ব্যক্তি যাচ্ছিল। সে যখন কবি ফায়জিকে দাড়ি কাটাতে দেখল, তাকে বলল, জনাব! আপনি দাড়ি কাটাচ্ছেন? উত্তরে ফায়জী বলল-

بلی!  ریش  می  ترا  نشم

জী হ্যাঁ, দাড়ি তো কাটাচ্ছি, তবে কারো অন্তরে কষ্ট দিচ্ছি না। অর্থাৎ আমার আমল আমার সঙ্গে থাকবে। আমি কারো অন্তরে কষ্ট দেই না। আর তুমি আমার কাজে অভিযোগ তুলে আমার অন্তরে কষ্ট দিয়েছ। তখন ওই ব্যক্তি বলল-

دلے  کسی   نمی   خراشی   ٭   ولے  دلے  رسول   اللہ   می خراشی

সে বলছে, আমি কারো অন্তরে কষ্ট দেই না। আরে তুমি তো এ কাজের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে কষ্ট দিচ্ছ, হাসি দিয়ে হলেও আনন্দ দাও।

এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকার বহু প্রকার বর্ণনা করেছেন এ আমলটিও সদকা, অমুক আমলটিও সদকা। সদকা হওয়ার অর্থ হলো, এ আমলের ওপর সদকা করার ন্যায় সওয়াব হবে। এ হাদিসের শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

و أن تلقى أخاه بوجه طلق

‘মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে হাস্যমুখে সাক্ষাত করাও একটি সদকা।’

যখন তোমরা কারো সঙ্গে সাক্ষাত করো আর বোঝ এ সাক্ষাত তাকে আনন্দিত করবে, তার হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব হবে, তাহলে এটাও সদকার অন্তর্ভুক্ত হবে।

অতএব, যারা অন্যের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বা লেনদেনের সময় সংযমী থাকে এবং গাম্ভীর্যের চাদরে আবৃত করে নিজেকে রিজার্ভ রাখে, তারা সুন্নত তরিকার ওপর আমল করে না। সুন্নত তরিকা হলো, যখন কোনো মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে মিলবে, উত্তম চরিত্রের সঙ্গে হাস্যমুখে মিলবে এবং তাকে আনন্দিত করে দেবে।

অন্যদের খুশি করার সীমা:

কারো কারো মনে ও মুখে এ কথা থাকে- আমরা তো অন্যদের অন্তর খুশি করি; এতে পাপ করতে হলে তাও করি। ভাই! আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে, তার নাফরমানি করে এবং আল্লাহর বিধানকে লংঘন করে কোনো মানুষের অন্তর খুশি করা বৈধ হতে পারে না। কারণ সে আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করেছে। এটা কোনো এবাদত নয়। এ হাদিসের উদ্দেশ্য হলো, বৈধ কাজে মুসলমানদের খুশি করার চিন্তা করো। হজরত থানবি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘এটি সুফী সাধকদের প্রকৃতিগত আমল।’ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার বন্ধু ও ওলী-সুফী সাধকরা সর্বদা প্রত্যেক মুসলমানকে খুশি করার চিন্তা করেন। তাদের কাছে এসে সব সময় মানুষ খুশি হয়ে ফিরে-বিরক্ত হয়ে নয়। এই জন্য আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে তাদের এ সুন্নতের ওপর আমলের তওফিক হয়। তারা আল্লাহর বান্দাদেরকে খুশি করে থাকেন।

নিজে পাপে জড়াবে না:

অন্যের অন্তরে আনন্দ দিতে গিয়ে নিজে পাপে জড়াবে না। যেমন: একটি দল, তাদের মতাদর্শের উপাধী-‘সুলহে কুল’ বা ‘সকলের সংশোধনকারী’ রেখে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য হলো, আমরা তো ‘সুলহে কুল’- ‘সকলের সংশোধনকারী’, তাই যে যাই করুক আমরা কারো ভুল ধরব না। কোনো মন্দকে মন্দ বলব না, কোনো মন্দ কাজের প্রতিবাদ করব না। ‘সুলহে কুল’-এ পদ্ধতি যথার্থ নয়। হজরত থানবি (রহ.) আরো বলেন, সৎ কাজের নির্দেশ বর্জন করবে না।

কেউ কেউ তো সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে না। কারণ কাউকে নামাজ পড়ার জন্য বললে তার মন খারাপ হয়ে যাবে। যদি অমুকের কোনো পাপের ভুল ধরে, তার মন খারাপ হবে। আমার সঙ্গে কারো মন খারাপ না হোক। তিনি আরো বলেছেন, কোরআনের এ নির্দেশ কি তাদের সামনে আসেনি যে-

و لا تأخذكم بهما رأفة في دين الله

আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়। অর্থাৎ এক ব্যক্তি দ্বীনের বিরোধিতা করছে, পাপে জড়াচ্ছে, তার ব্যাপারে তোমার অন্তরে যেন দয়ার উদ্রেক না হয় যে, যদি আমি তাকে পাপ থেকে বাধা দান করি, তার অন্তর ব্যথিত হবে।

নম্রতার সঙ্গে পাপ থেকে বাধা দান করো:

মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য কষ্ট কম পায় এমন পদ্ধতি অবলম্বন করবে। কষ্টদায়ক পদ্ধতি অবলম্বন করবে না। বরং নম্রতা, সহমর্মিতা, দয়া, ভালোবাসা, কল্যাণকামিতা ও ইখলাসের সঙ্গে হবে। রাগ ঝাড়া উদ্দেশ্য হবে না। তবে এই চিন্তা করা-যদি আমি তাকে বাধা প্রদান করি সে কষ্ট পাবে-নম্রতার সঙ্গে হলেও ঠিক নয়। কারণ মাখলুককে সন্তুষ্ট করার চেয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করো আগে। অতএব, প্রতিটি মুসলমানকে খুশি করার চেষ্ট করো, তবে যেখানে আল্লাহর সীমা এসে যায়, হারাম ও অবৈধ কাজ এসে যায়, তখন কারো অন্তর ব্যথিত হোক বা খুশি হোক, ওই সময় আল্লাহর হুকুমই মানতে হবে। আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরই আনুগত্য করতে হবে। অন্য কারো পরোয়া করা যাবে না। তবে যথাসম্ভব নম্রতা অবলম্বন করা চাই। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে