ইসলামের প্রথম বন্দি, প্রথম গনীমত এবং প্রথম সীমান্ত সংঘর্ষ

ইসলামের প্রথম বন্দি, প্রথম গনীমত এবং প্রথম সীমান্ত সংঘর্ষ

মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ জহীরুল হক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৩৯ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০  

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনা হিজরতের পর থেকে প্রতিদিন কাফের ও মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েই চলছিলো। মদিনার পর কাফেরদের আক্রমণের শঙ্কাও প্রতি মুহূর্তে লেগেছিল।

এমনি আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রের অস্থিত্ব স্বীকার করানো, রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা বিধান, কাফেরদের ওপর মুসলমানদের প্রভাব বিস্তার এবং আশপাশের গোত্র-সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কোন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দিকে ইসলামি টহলদার বাহিনী পাঠানোর ব্যবস্থা নেন।

এ ব্যবস্থারই আওতায় একদিন তিনি হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষের রজব মাসের হজরত আব্দুল্লাহ (রা.) ইবনে জাহশকে দরবারে ডেকে পাঠান। তার হাতে একটি বন্ধ পত্র তুলে দিয়ে বলেন, ‘তোমার সঙ্গে কিছুসংখ্যক মুহাজেরীনকে নিয়ে নাও এবং এ পাত্রটি তোমার সঙ্গে রাখো। কিন্তু খবরদার এটি পড়বে না। ক্রমাগত দুই দিন সফর করার পর এটি খুলে পড়বে এবং এতে যা কিছু লেখা থাকবে সে মতো কাজ করবে। তবে কাজ করার পূর্বে সঙ্গীদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করে নেবে। যদি কেউ চিঠির মর্ম অনুযায়ী কাজ করতে অস্বীকার করে কিংবা ফিরে আসতে চায়, তবে  তাকে আদৌ বাঁধা দেবে না।’

অতঃপর হজরত আব্দুল্লাহ (রা.) ১১ জন নিবেদিতপ্রাণ মুহাজিরের একটি সশস্ত্র দলকে সঙ্গে নিয়ে তায়েফ অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেলেন। ক্রমাগত দুই দিন সফর করার পর  তিনি পবিত্র পত্রটি খুললেন। তাতে লেখা ছিলো,

‘মহান আল্লাহর নামে।'

নিজের বীরসঙ্গীদের সমভিব্যাহারে ‘বতনে নাখলাহ’ নামক পৌঁছা পর্যন্ত যেতে থাকো। এখানে থেমে একটি কুরাইশ কাফেলার অপেক্ষা করতে থাকো এবং তার খবরাখবর সম্পর্কে আমাকে অবহিত করতে থাকো। যে আপন খুশিতে তোমার সঙ্গে থাকতে চায় তাকেই সঙ্গে রাখো। যে থাকতে চায় না তাকে ফিরে যেতে দাও।’

তখন হজরত আব্দুল্লা (রা.) ইবনে জাহশ মক্কা ও তায়েফের মধবর্তী ইবনে আমেরের বাগানের কাছে অবস্থান করেছিলেন যেখানে সাধারণত: মক্কা যাতায়াতকারী কাফেলা সমূহ বিশ্রাম করতো।

জায়গাটি মক্কা থেকে এক রাতের দূরত্ব ছিলো। তিনি চিঠির বিবরণ সম্পর্কে সঙ্গীদেরকে অবহিত করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এবার বলো, তোমাদের ইচ্ছা কি? তোমরা কি জিহাদে রাজী, নাকি প্রাণ রক্ষায় আগ্রহী, নাকি একে সুবর্ণ সুযোগ বুঝে বেরিয়ে যেতে পছন্দ করো।’

সঙ্গীরা একসঙ্গে থাকার এবং যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করার ব্যক্ত করেন। এসব কথাবার্তা শেষ হলে তিনি কছিুটা এগিয়ে গিয়ে ‘নাখলাহ’ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করলেন। কুরাইশদের সে কাফেলাটিও ইতোমধ্যে সেখানে এস হাজির হলো যার সন্ধানে তারা বেরিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিলো কাফেলাটি থামার পর কুরাইশদের সামরিক প্রস্তুতি সম্পর্কে অনুসন্ধান করবেন। কারণ, তায়েফের নিকটবর্তী জাবাশেই অস্ত্রশস্ত্র তৈরি হয়। তাদের আরো ধারণা ছিলো, নিশ্চয়ই এ কাফেলাটি অস্ত্র সংগ্রহের জন্যই এখানে এসে থাকবে। এ কাফেলার নেতা ছিলো আমর ইবনে হাদরামী।

কুরাইশরা মুসলমানদের এ দলটি দেখেই ভড়কে গেলো। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে হজরত ওক্কাশাহ (রা.) মাথা মুড়িয়ে নিয়েছিলেন যাতে কুরাইশদের লোকেরা মনে করে, এরা লড়াই করার লোক নয়, বরং কাবা জিয়ারতে এসে থাকবে। সুতরাং তারাও তাকে লক্ষ্য করে আশ্বস্ত হলো এবং সবাই তাদের সওয়ারীর পশুগুলোকে চড়তে ছেড়ে দিলো।

এদিকে মুসলমানদের মধ্যে আলাপ-পরামর্শ চলতে লাগলো যে, শক্রদেরকে যদি প্রতিহত করা না হয়, তাহলে পরের দিনই এরা মক্কায় ঢুকে পড়বে। আর যদি বাঁধা দেয়া হয়, তবে যুদ্ধ বেঁধে যাবার আশঙ্কা। অথচ আজ হলো রজব মাসের শেষ রাত। (এম মাসে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ) কি করা যায়? কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর তাদের একজন বলে উঠলো,

‘রজব শেষ হয়ে গেছে, আজ থেকে শাবান মাস শুরু হয়েছে। এখনই শক্রর ওপর আক্রমণ করাতে কোনো দোষ নেই।’

শেষ পর্যন্ত আক্রমণ করা এবং শক্রকে হাত ছাড়া না করারই সিদ্ধান্ত গৃহীত সুতরাংমুসলমানরা অগ্রসর হলে অপর পক্ষে আমর হাদরামী এগিয়ে আসে। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহেদেরে একটি তীরই তাকে চিরদিনের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দেয়। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কুরাইশ কাফেলা পালিয়ে যায়। তবে ওসমান ওহাকাম ইবনে কাইসান মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে যায়। কুরাইশরা যা কিছু ফেলে যায় মুসলমানরা সে সবও অধিকার করে নেয় এবং এই দুই বন্দি ও গনীমতের মালামাল নিয়ে মদিনা ফিরে আসে।

হজরত আব্দুল্লাহ (রা.) গনীমতের মালামাল বন্টন করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছায় এক-পঞ্চমাংশ বের করে রাখেন এবং সবাইকে বলে দেন যে, এসব সামগ্রী হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে পেশ করা হবে। এটা ছিলো হজরত আব্দুল্লাহ (রা.) এর এজতেহাদ।

মদিনা ফেরার পর যখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করলেন এবং বন্দি ও গনীমতসামগ্রী পেশ করলেন, তখন তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে বললেন, ‘আমি তোমাদেরকে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেইনি। তোমরা নিষিদ্ধ মাসে রক্তপাত করে ভালো করোনি।’

তিনি গনীমতসামগ্রী গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন এবং বন্দিদের বিষয়টিও মুলতবী রাখলেন। তখন মুসলমানরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলো যে, কী হবে? কিন্তু সহসাই ওহী নাজিল হলো।

তাতে বলা হলো, ‘লোকেরা পবিত্রতার মাসে লড়াই সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এতে লড়াই করা বড় পাপ। কিন্তু আল্লাহর পথে বাঁধাদান, তাঁকে অস্বীকার করা, মসজিদে হারামে যেতে না দেয়া এবং তার অধিবাসীদেরকে সেখান থেকে বের করে দেয়া আল্লাহর নিকট তার চাইতেও বড় পাপ। আর দাঙ্গা-হাঙ্গামা (অর্থাৎ, দ্বীনের প্রতি বিমুখ হওয়ার জন্য কষ্ট দেয়া) হত্যা অপেক্ষাও বড় পাপ। এসব লোক আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকবে। এমনকি সুযোগ পেলে (এরাই সবাইকে) দ্বীন থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে।’

এ ওহী নাজিলের পর মুসলমানরা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! ‘আমরা তো জিহাদই করেছি। আল্লাহ কি আমাদেরকে এর বদলা দেবেন না?’

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ঈমানে এনেছে, আল্লাহর উদ্দেশে হিজরত করেছে এবং (কাফেরদের বিরুদ্ধে) করতে থেকেছে তারাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল, করুণাময়।’

এ ওহী নাজিলের পর মুসলমানদের মধ্যে আনন্দের ঢেউ খেলতে লাগলো। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও বন্দি ও গনীমতসামগ্রী  নিজের হাতে নিয়ে নিলেন। এর সামান্য কিছুদিন পরেই বদর যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং গনীমত বন্টনের বিধান নাজিল হয়।

সুতরাং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের গনীমতসামগ্রীর সঙ্গে হজরত আব্দুল্লাহ (রা.) ইবনে জাহশের  আনা গনীমতসামগ্রীও মুজাহিদদের মাঝে বন্টন করে দেন।

এ অভিযানেই মুসলমানদের হাতে শক্রপক্ষের লোক নিহত হয়, প্রথম বারের মতো বন্দি হয়ে আসে এবং প্রথম বারের মতো গনীমত হস্তগত হয়।

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে