নারী মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে স্কুটি কন্যার পথচলা

নারী মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে স্কুটি কন্যার পথচলা

রুবেল মিয়া নাহিদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:১৬ ২৬ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৭:৩৩ ২৬ জানুয়ারি ২০২২

‘স্কুটার কন্যা’ হিসেবে পরিচিত চন্দ্রিকা মন্ডলের পথচলা। ছবি : লেখক

‘স্কুটার কন্যা’ হিসেবে পরিচিত চন্দ্রিকা মন্ডলের পথচলা। ছবি : লেখক

উপকূলিয় জেলা পিরোজপুরের মেয়ে চন্দ্রিকা মন্ডল। স্থানীয় লোকজনের কাছে তিনি ‘স্কুটার কন্যা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তারুণ্যের অদম্য সাহসী মেয়ে হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। পারিবারিক-সামাজিক নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগিয়ে গেছেন নিজের স্বপ্নের পথে। এটা পারবে না, ওটা তোমার জন্য না- এসব কথায় অনেকের পথচলা রুদ্ধ হয়ে যায়। সাফল্যের পথে, নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে কাছের মানুষরাই বাধার প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। কারণ সে নারী। তবে সব কিছু ছাপিয়ে বাঁধাহীনভাবে এগিয়ে চলছে চন্দ্রিকা মন্ডল।

চন্দ্রিকা মন্ডল পড়াশোনা করছেন পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে। টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন। করোনাকালে সেই টিউশনি বন্ধ হয়ে যায়। কি করবে, ভেবে পাচ্ছিল না। ওদিকে নারীদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ছিলো বহুদিন আগে থেকেই। চন্দ্রিকা স্কুটি চালাতে পারতেন আগে থেকেই। চিন্তা করলেন, অন্য মেয়েদের তিনি স্কুটি চালানো শেখাবেন। এতে নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।

প্রথমে একাই শুরু করে মেয়েদের স্কুটার চালানো শেখাতে। পরে পিরোজপুর সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী আঁখি আক্তাররে খোঁজ পায়। তাকেও চন্দ্রিকার ট্রেনিং সেন্টারে ট্রেইনার হিসেবে যোগদান করায়। এতে উপকৃত হয় আঁখিও। চন্দ্রিকা প্রথমে ২০ জনকে স্কুটার চালানো শিখিয়েছেন। আজ সে সংখ্যাটি ৫০ জনকে ছাড়িয়েছে।
 
পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের মাঠে তরুণীদের তিনি প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণের ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় চন্দ্রিকা মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি জানান, তার স্কুটার চালানো ও শেখানোর গল্প।

চন্দ্রিকা মন্ডলের পথচলা। ছবি : লেখক

২০২০ সালের শুরুর দিকে জাতীয় মহিলা সংস্থা ও মহিলা পরিষদের সহায়তায় ১২ জন গরিব ও মেধাবী ছাত্রীকে ৩০ শতাংশ টাকায় স্কুটার দেওয়া হয়। মেয়েদের চলাচলে সুবিধার জন্য স্কুটারগুলো দেওয়া হয়েছিল। চন্দ্রিকা মণ্ডলও একটি স্কুটার পান। সেই স্কুটার শুধু পথ পাড়ি দেয়ার সঙ্গী নয়, বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অস্ত্র বানিয়ে নিয়েছেন তিনি।

চন্দ্রিকা মণ্ডল বলেন, ‘আমি টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাতাম। করোনার কারণে টিউশনি বন্ধ হয়ে যায়। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, মেয়েদের স্কুটার চালানো শেখাব। এতে আমার সাথে সাথে নারীরাও আরো এগিয়ে যাবে। পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করার পর দেখলাম অনেকেই আগ্রহী। পেয়ে গেলাম দুজনকে। তাদের স্কুটার শিখিয়ে আয় করলাম ছয় হাজার টাকা।

ফেসবুকের মাধ্যমে স্কুটার শেখানোর প্রচারণা চালান চন্দ্রিকা মণ্ডল। বর্তমানে অনেক নারীরাই এখন তার কাছ থেকে স্কুটার চালানো শিখছেন। তবে নারীদের এই স্কুটার চালানো শুধুই যাতায়াতের পরিচয় নয়। চন্দ্রিকা মণ্ডল দেখিয়ে দিলেন যে নারীরাও সব প্রতিবন্ধকতার উর্ধে সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

চন্দ্রিকা মন্ডলের পথচলা। ছবি : লেখক

চন্দ্রিকা মণ্ডলের এই অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ২০২১ সালের ১২ মার্চ তাকে আমন্ত্রন জানানো হয় ইয়ামাহা রাইডার্স ক্লাব প্রেজেন্টস বরিশাল রাইডিং ফিয়েস্তা আনুষ্ঠানে। সেখানে তার কীর্তির পুরুস্কার স্বরূপ একটি ক্রেস্ট, উপহার ও সম্নাননা দেন বরিশালের মাননীয় মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ও এসিআই মোটর্সের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস। ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর ইয়ামাহা থেকে ৫০ শতাংশ টাকায় কিস্তি প্রেমেন্টের মাধ্যমে পেয়ে যায় আরো একটি স্কুটার।

বর্তমানে চন্দ্রিকার কাছে চারজন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, একজন গৃহিণী ও দুজন ছাত্রী রয়েছেন। তার স্বপ্ন মেয়েদের স্কুটার চালানো শিখিয়ে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলা।

চন্দ্রিকার ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল বাইক চালানো শেখার। এক বন্ধুকে বলছিল মনের ইচ্ছার কথা। এরপর সেই বন্ধুর সহায়তায় বাইক চালানো শেখা। চন্দ্রিকা মন্ডল বলেন, যখন স্কুটার চালাই, কতো লোকে কতো কিছু বলে, মেয়ে হয়ে বাইক চালানোটা কিছু কিছু লোক স্বাভাবিকভাবে দেখত না। অনেকে খারাপ মন্তব্য করতেন, বেশিরভাগ লোক তাকিয়ে থাকত। আজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে সমাজ। আমি একা নই আমার হাত ধরেই ৫০ জনের সৃষ্টি হয়েছে। তারাও এখন স্কুটার চালাচ্ছে এবং নারী প্রতিবন্ধকতার শিকল ছেড়ে তারা বেরিয়ে এসেছে। আমি এটাই চেয়েছিলাম, নারী শক্তির জয় হোক।

চন্দ্রিকা মন্ডলের আঁকা ছবি। ছবি : লেখক

চন্দ্রিকা ছবিও আঁকেন। সেই প্রতিভার গল্প করতে গিয়ে চন্দ্রিকা বলেন, ছবি আঁকার ক্ষেত্রে বাবাই আমার অনুপ্রেরণা। আমার বাবা একজন আর্টিস্ট ছিলেন। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। এরপর থেকে নিজের প্রচেষ্টায় শেখা ছবি আঁকা। একজন নারী হয়ে নারীদের স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়ার ইচ্ছা।
 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি/এমএস