আরেকটি মহামারির সময়ে যেভাবে উদ্ভাবন হয় ভেন্টিলেটারের

আরেকটি মহামারির সময়ে যেভাবে উদ্ভাবন হয় ভেন্টিলেটারের

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:১৭ ২২ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ২০:৫১ ৯ এপ্রিল ২০২২

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

করোনা মহামারিতে বিশ্বে গুরুতর আক্রান্তদের চিকিৎসায় ব্যবহার হয় ভেন্টিলেটার। লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে এখন অপরিহার্য এই যন্ত্রটি। কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দিয়ে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার যন্ত্র এটি। তবে, এই জীবন বাঁচানো যন্ত্রের উদ্ভাবন হয়েছিল একটি মহামারির সময়।

১৯৫২ সালের কখা। পশ্চিমে সে বছর পোলিও ছড়িয়ে পড়েছিল মহামারি আকারে। বিশেষ করে আমেরিকা এবং ইউরোপের কিছু কিছু দেশে। এই রোগে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছিল প্রচুর শিশু, এমনকি প্রাপ্ত বয়স্করাও।

বিশ্বের যেসব দেশে ১৯৫২ এর পোলিও মহামারি মারাত্মক আকার নিয়েছিল, তার একটি এপিসেন্টার ছিল ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহর।

কোপেনহেগেনে সে সময় সংক্রামক ব্যাধির একমাত্র হাসপাতাল ছিল ব্লেগডাম। কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটিতে ডাক্তারি পড়তেন অ্যানা হলটন, তার বয়স তখন ২০। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সেই ইতিহাস গড়ার মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি। গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, এখন করোনাভাইরাস নিয়ে যেমন, তখনও ঠিক তেমনই পোলিও মহামারি ছিল একেবারে অপ্রত্যাশিত। চিকিৎসকরা রোগের কথা- রোগের উপসর্গের কথা কিছুই জানতেন না। প্রচুর সংখ্যায় শিশু আর প্রাপ্তবয়স্করা শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছিল।

তখন জুলাই মাসের শেষ। প্রথম দিনে ভর্তি হলো একসাথে প্রায় ৩০ জন রোগী। এদের মধ্যে ২৬ জন রোগীই মারা গেল। মৃত্যুহারের দিক দিয়ে সেটা ৮০ শতাংশের বেশি। প্রতিদিন জরুরি সেবার দশটা গাড়ি প্রায় ৫০ জন করে রোগী নিয়ে আসছে ভর্তি করার জন্য।

প্রথম কয়েক সপ্তাহে ভর্তি হওয়া রোগীদের ৮৭ শতাংশেরই মৃত্যু হয় এবং প্রত্যেকেই মারা যায় পোলিও ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে।

ছোঁয়াচে ভাইরাসে আক্রান্তরা ছিল মূলত শিশু। ভাইরাস তাদের স্নায়ু ও মাংসপেশী এমনভাবে বিকল করে দিচ্ছিল যে তাদের অনেকের শ্বাস ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, অনেকের হাত ও পায়ের পেশী প্যারালাইজড হয়ে যাচ্ছিল। পেশী সচল করার চেষ্টায় ডাক্তাররা মালিশের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন।

কিন্তু গুরুতর আক্রান্ত যাদের শ্বাসযন্ত্রের পেশি বিকল হয়ে যাচ্ছিল, তাদের কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেওয়ার জন্য একটাই পদ্ধতি চালু ছিল। একে বলা হতো আয়রন লাং চিকিৎসা।

রোগীকে একটা বিশাল লোহার নলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হতো। নলের ভেতর রোগীর শরীরের চারপাশে কৃত্রিমভাবে একটা শূণ্যস্থান তৈরি করা হতো, যেখানে বাতাসের নেগেটিভ চাপের কারণে রোগীর পাঁজর আর ফুসফুস ফুলে উঠত বাতাস টানার জন্য। ওই প্রযুক্তিতে রোগীকে বাতাস টানার জন্য ফুসফুসের বায়ুথলিগুলো প্রসারিত করতে হতো।

হাজারো শিশুর জীবনরক্ষায় তখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল ওই আয়রন লাং বা লৌহ ফুসফুস প্রযুক্তি। কিন্তু এই আয়রন লাং-এর গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ছিল। অনেকে ওই লোহার নলের ভেতরেই মারা যাচ্ছিল, নিজেদের লালারস ও পাকস্থলি থেকে উঠে আসা খাবার গলায় আটকে।

এ ছাড়াও এই প্রযুক্তি এতই ব্যয়সাপেক্ষ ছিল যে পুরো ডেনমার্কে এই যন্ত্র ছিল মাত্র একটি।

পরিস্থিতি তখন দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।

এর মধ্যেই হাসপাতালের সিনিয়ার ডাক্তার হেনরিক লারসেন ডাক্তারদের ডেকে বৈঠকে বসলেন কী করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করতে। ওই বৈঠকে তরুণ অ্যানাসথেটিস্ট ডাক্তার বিয়র্ন ইবসেন সম্পূর্ণ নতুন এক চিকিৎসার প্রস্তাব দিলেন।

বিয়র্নের প্রস্তাব ছিল নলের ভেতর ওভাবে নেগেটিভ চাপ তৈরি না করে পোলিও আক্রান্তদের ফুসফুসে বাইরে থেকে সরাসরি অক্সিজেন ঢোকানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে রোগী সহজে যন্ত্রের সাহায্যে কৃত্রিমভাবে নি:শ্বাস নিতে পারে।

বাইরে থেকে বাতাস বা অক্সিজেন ঢোকালে তা সহজে ফুসফুসের বায়ুথলিগুলোকে ভরে তুলবে এবং রোগীর ফুসফুস যখন শিথিল হবে তখন শ্বাস ছাড়ার মতো ব্যবহৃত বাতাস বেরিয়ে আসবে।

ডা. ইবসেন প্রস্তাব করলেন গলার মধ্যে ফুটো করে একটা নল ঢোকানো হবে শ্বাসনালীতে। আর ওই নলের মধ্যে দিয়ে ফুসফুসে বাতাস ঢোকানো আর বের করা হবে রবারের বেলুন পাম্প করে।

অধ্যাপক লারসেনের প্রস্তাবটা পছন্দ না হলেও অবস্থা তখন এমনই সঙ্কটজনক পর্যায় পৌঁছেছিল যে ডা. ইবসেনকে পরেরদিনই তার পদ্ধতি চেষ্টা করে দেখার অনুমতি দেয়া হলো।

তখন মৃত্যুমুখে ১২-বছরের এক কিশোরী ভিভি ইবার্ট। ২৭শে অগাস্ট ১৯৫২, তার ওপরই নতুন পদ্ধতি প্রথম পরীক্ষা করলেন ডা. ইবসেন। তার গায়ের রং তখন নীল। মুখ থেকে প্রচুর ফেনা বেরচ্ছে। সে শ্বাস নিচ্ছে না, অজ্ঞান অবস্থা । বিয়র্ন প্রথমে তাকে অচেতন রাখার জন্য অল্পমাত্রায় ওষুধ দিল। তারপর মেয়েটির গলা ফুটো করে সেখান দিয়ে একটা নল ঢোকালো। বেলুন পাম্প করে তাকে ভেন্টিলেট করলো বিয়র্ন- অক্সিজেন ঢোকানো হলো এবং মেয়েটি বেঁচে গেল।

ডা. ইবসেনের এই সাফল্যের পর অধ্যাপক লারসেন মত পাল্টিয়েছিলেন, বলেছিলেন এই নতুন পদ্ধতিতেই এগুতে হবে।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিল চিকিৎসা দেবার মত যথেষ্ট কর্মী না থাকায়। হাত দিয়ে পাম্প করে এত রোগীকে অক্সিজেন দিতে প্রচুর চিকিৎসা কর্মী প্রয়োজন। অন্তত চারজন করে চিকিৎসা কর্মীকে প্রতি রোগীর বিছানার পাশে হাজির থাকতে হবে ২৪ ঘন্টা, সপ্তাহে সাত দিন।

শেষ পর্যন্ত সমাধান একটা বের করা হলো। তখন গরমের ছুটিতে কলেজ বন্ধ ছিল। ডেকে পাঠানো হলো শত শত মেডিকেল শিক্ষার্থীকে।

কোনোরকম প্রশিক্ষণ দেয়া হলো না। শুধু বলা হলো রোগীর পাশে বসতে আর বেলুন দিয়ে হাত পাম্প করে সমানে অক্সিজেন সরবরাহ চালিয়ে যেতে। যাতে রোগী নি:শ্বাস নিতে পারে। তাদের দেখিয়ে দেয়া হলো কীভাবে বেলুন পাম্প করতে হবে।

চব্বিশ ঘন্টা ধরে হাতে বেলুন পাম্প করে রোগীদের অক্সিজেন দেবার কাজটা তরুণ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই কঠিন ছিল। অনেক রোগীকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কখনও মাসের পর মাস একনাগাড়ে অক্সিজেন দিতে হয়েছে।

মহামারি যতদিন ছিল, প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী যারা ডাক্তারি ও দাঁতের ডাক্তারি পড়ছিল কোপেনহেগেনে, তারা মোট এক লাখ ৬৫ হাজার ঘণ্টা শ্রম দিয়েছিল পোলিও আক্রান্তদের ফুসফুসে অনবরত অক্সিজেন পাম্প করার জন্য।

ডা. বিয়র্ন ইবসেনের পরিকল্পনা কাজ করেছিল। মৃত্যুর হার ৮৭ শতাংশ থেকে নেমে এসেছিল মাত্র ১৫ শতাংশে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তৈরি হয়েছিল ইতিহাস।

সেটা ছিল ইতিহাসের একটা সন্ধিক্ষণ। তখন ডা. ইবসেন শুধু যে যুগান্তকারী জীবন রক্ষার একটা প্রযুক্তি আবিস্কার করেছিলেন তাই নয়, চিকিৎসা জগতে নিবিড় পরিচর্যার শুরুও হয়েছিল তারই হাত ধরে। পরবর্তীকালে গুরুতর অসুস্থদের ২৪ ঘন্টা চিকিৎসকদের নজরে রাখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র।

উনিশশো তেপান্ন সালে সুইডেনের একটি কোম্পানি রোগীর ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ করার জন্য একটা যন্ত্র তৈরি করেছিল, যাতে মানুষকে হাত দিয়ে বেলুন পাম্প করে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে আর ফুসফুসে অক্সিজেন ঢোকাতে না হয়। প্রথম যন্ত্রটির নাম দেয়া হয়েছিল মেকানিকাল স্টুডেন্টস - যান্ত্রিক শিক্ষার্থী। এটাই আধুনিক কালের ভেন্টিলেটার যন্ত্র।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি/আরএইচ