কম্বোডিয়ার বাঁশের ট্রেন : প্রতিকূলতায় জন্ম নেয়া এক ইতিহাস

কম্বোডিয়ার বাঁশের ট্রেন : প্রতিকূলতায় জন্ম নেয়া এক ইতিহাস

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:৪৩ ১৩ জানুয়ারি ২০২২  

কম্বোডিয়ার বাঁশের ট্রেন। ছবি : সংগৃহীত

কম্বোডিয়ার বাঁশের ট্রেন। ছবি : সংগৃহীত

আপনি জানেন কী? আজও এমন অনেক জায়গা রয়েছে, যেখানে রেল ব্যবস্থা প্রাগৈতিহাসিক যুগে পড়ে রয়েছে। কম্বোডিয়ার ব্যাটমব্যাং ও পইপেট অঞ্চলে বিস্তৃত রেল লাইন তার অন্যতম উদাহরণ। এই লাইনে এখনও চলে বাঁশের রেল। এমনকি স্টেশনও পুরোটাই বাঁশের।

এর পেছনে রয়েছে এক লম্বা ইতিহাস। একটা সময়ে ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়া ছিল একই সুতায় গাথা। এই দেশ তিনটি ছিল ফরাসী সাম্রাজ্যের উপনিবেশ। ফরাসীরা ওই এলাকা থেকে হাতগুটিয়ে নেয়ার পর আসে আমেরিকা। পৃথিবীকে কমিউনিজম মুক্ত করতে এই সব দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো হয়।

ভিয়েতনামের হো-চি-মিন এবং কম্বোডিয়ার রাজকুমার নরোদম সিহানু বিগত দশকের ষাটের দশকে বারবার আন্তর্জাতিক সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তিনটি দেশ থেকেই হাত গোটাতে হয় আমেরিকাকে। তিন দেশেই কমিউনিস্ট শাসন কায়েম হয়।

কিন্তু কম্বোডিয়ার রাজনীতি দিনে দিনে ভিন্ন বাঁক নেয়। সেই দেশের কমিউনিস্ট পার্টি গোড়ায় রাজতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটায়নি। প্রিন্স নরোদম সিহানুকই ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু সেই দেশের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে মতাদর্শগত মতান্তর এবং ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে দেশটি ক্রমাগত এক অস্থির পরিস্থিতির দিকে আগাতে থাকে।

কম্বোডিয়ার বাঁশের ট্রেন। ছবি : সংগৃহীত

ধীরে ধীরে দেশের সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠেন পল পট। সেনাবাহিনীকে হাতের মুঠোয় রেখে তিনি নিজের দেশের মানুষকেই শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে একের পর এক গণহত্যায় ঘটতে থাকেন। খেমের রুজ বাহিনী দিয়ে।

সেই প্রবণতা দিনে দিনে এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছয় যখন গোটা দেশের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। পল পটের নির্দেশেই ফরাসি আমলে তৈরি রেল ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়। পরিস্থিতি যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে তখন ভিয়েতনামের লাল ফৌজ কম্বোডিয়া আক্রমণ করে। তার পর থেকে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। সেই গৃহযুদ্ধের পল পট নিহত হন। অনেক আগেই প্রিন্স নরদম সিহানুকের পরিবারকে বেজিং নিয়ে যাওয়া হয়।

সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় দেশটি তখন শ্মশানে পরিণত হয়েছে।

বিপর্যস্থ প্রশাসন। ভেঙে পরে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এখন সময় সাধারণ মানুষই এগিয়ে আসে নিজেদের সমস্যা মেটাতে। সিহানুকভিল থেকে রাজধানী সম পেল, নমপেন থেকে পপেট, সিসোফন থেকে থাইল্যান্ড সীমান্ত প্রধানত এই তিনটে ডিভিশানে ট্রেন চলতো। পল পটের জমানা যখন শেষ হল তখন কেবল রেল লাইনগুলোই পড়ে আছে। আশির দশক থেকে যখন দেশে গুলি আর ট্যাঙ্কের লড়াই বন্ধ হল তখন সাধারণ মানুষ সেই পড়ে থাকা রেলপথকেই আবার যানবাহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার কাজে হাত লাগালো।

কম্বোডিয়ার বাঁশের ট্রেন। ছবি : সংগৃহীত

তখনই মাথায় এল বাঁশের ট্রেন। ভাঙা ট্যাঙ্ক, জিপ, রেলগাড়ি থেকে ছোট ছোট হুইল বার করা হল। স্টিল বা লোহার রড দিয়ে সেই চাকা দুই প্রান্তে লাগিয়ে লাইকের ওপর বসানো হল। চারচাকাকে জোড়া হল বাঁশের তৈরি পাটাতন দিয়ে। মোটরসাইকেল বা ছোট ট্রাকটরের ইঞ্জিনের সঙ্গে বেল্ট দিয়ে জোড়া ছিল সেই অ্যাকসেল।

চালু হল বাঁশের ট্রেন। কম্বোডিয়ার মানুষ তার নাম দিল নরি- আমরা যাকে বলে থাকি লরি। সেই রেল দেখতে দেখতে হয়ে উঠল সারা দেশের অন্যতম বাহন। নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, গবাদী পশু, চাল, গম, সবজি, মাছ নিদৃষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেয়া শুরু হলো নিয়মিত। শুধু তাই নয়। যুদ্ধক্লান্ত দেশে যখন আবার পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হল তখনও একমাত্র সহায় এই নরি। দেখতে দেখতে সারা দেশে নরি তৈরি করা একটি জনপ্রিয় কুটির শিল্পে পরিণত হল।

২০০৮ সাল থেকে কম্বোডিয়ায় সরকারী উদ্যোগে আবার রেল ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার গতিবেগ নিয়ে কোনো যান দেশের দ্রুত উন্নয়ন ঘটাতে পারে না।

২০০৬ সাল থেকে একটি একটি করে রুটে ট্রেন চলাচল আবার শুরু হয়েছে। কিন্তু গৃহযুদ্ধে ক্ষত বিক্ষত হাওয়া একটি দেশে বিপন্ন মানুষ প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সামাল দিতে যে উদ্ভাবনী শক্তি দেখিয়েছে নরি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। টানা ৩০ বছর গোটা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যে অবদান রেখেছে বাঁশের রেল তা নিশ্চয়ই বহুকাল মানুষের মনে থাকবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি