ভ্রমণ হোক বাংলাদেশের প্যারিস রোডে

ভ্রমণ হোক বাংলাদেশের প্যারিস রোডে

ভ্রমণ প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:১৫ ৮ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৯:১৮ ৮ জানুয়ারি ২০২২

সুন্দর রাস্তা ‘প্যারিস রোড’। ছবি : সংগৃহীত

সুন্দর রাস্তা ‘প্যারিস রোড’। ছবি : সংগৃহীত

পিচঢালা রাস্তার দুই পাশে বেড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল গাছ। একপাশের গাছগুলো যেন আরেক পাশের গাছগুলোকে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে। গাছের পাতার এমন মেলবন্ধনে ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে সূর্যের আলো। সে আলো আবার সবুজ পাতাকে ভেদ করে রাস্তায় ঠিকরে পড়ছে। কখনো আটকে যাচ্ছে পাতায়। সব মিলিয়ে আলোছায়ার সুন্দর চিত্র নিয়মিত ফুটে ওঠে এই রাস্তায়। এই রাস্তাটির নাম ‘প্যারিস রোড’।

প্যারিস রোড ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের কোনো রাস্তা নয়। এটি অবস্থিত বাংলাদেশেই। গগন শিরিষ গাছে আচ্ছাদিত এই রাস্তাটির অবস্থান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৫৩ বছরের পুরোনো এই প্যারিস রোড বহন করে চলেছে অনেক কালের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা ফটক থেকে শেরেবাংলা ফজলুল হক হল পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার ধরে বিস্তৃত রাস্তাটি প্যারিস রোড। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। রাস্তার দুপাশে গাছগুলো যেন রাস্তার  প্রহরী। অনেকটা উপরে গিয়ে ডালপালা মেলেছে চারপাশে। দুই পাশের গাছের ডালপালা রাস্তার মাঝে শূন্যে আলিঙ্গন হওয়ার নেশায় ব্যাকুল। এ যেন প্রকৃতির শরীরী খেলা। গাছের চিরচিরে ঘন পাতা রাস্তায় মেলে ধরেছে এক লম্বা শামিয়ানা।

সুন্দর রাস্তা ‘প্যারিস রোড’। ছবি : সংগৃহীত

নির্মল বাতাসে গাছের ছোট ছোট চেরা পাতাগুলো যখন বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে; তখন মনে হয়, এ যেন পাতার বৃষ্টি—যে বৃষ্টি দুহাতে কুড়ানো যায়। সূর্যের লাল রশ্মি গাছের ডাল ভেদ করে যখন পিচঢালা রাস্তায় পড়ে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন এঁকে দিচ্ছে নানা রঙের চিত্র। কেবল সকালের সূর্য নয়, পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়া, কিংবা সন্ধ্যার পর থেকে সারি সারি ল্যাম্পপোস্টের আলোয় এই রাস্তা সাজে বাহারি রূপে। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন ঋতুতে এই রাস্তার দৃশ্য পাল্টে যায়। বসন্তের ঝরা পাতার বৃষ্টি, বর্ষায় পাতা চুঁইয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা জল কিংবা শীতের সকালে কুয়াশা মোড়ানো রাস্তাটি সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়।

ছাত্রদের বিক্ষোভ-আন্দোলন যেমন প্যারিস রোড ছাড়া প্রাণ পায় না, তেমনি ক্যাম্পাসের ভালোবাসাও প্রাণ পায় না প্যারিস রোড ছাড়া। প্রেমিক-প্রেমিকার প্রথম অনুভূতিও প্যারিস রোডের শীতল ছায়ায় হাঁটার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। আবার বিরহ-বিচ্ছেদের যন্ত্রণাও ভাগাভাগি করতে চায় রাতের নির্জন প্যারিস রোডের শূন্যতার মাঝে।

এত বিশেষত্ব থাকলেও প্যারিস রোডের জন্মের ইতিহাস কিন্তু অনেকটা সাদামাটা। ১৯৬৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণের লক্ষ্যে ক্যাম্পাসের কাজলা রোড থেকে শেরেবাংলা হল পর্যন্ত এই গগন শিরীষ গাছ লাগানো হয়। তৎকালীন উপাচার্য এম শামসুল হক ফিলিপাইন থেকে কিছু গাছ নিয়ে আসেন। তিনি এ গাছগুলো রোপণের দায়িত্ব দেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী মোহাম্মাদ ইউনুসকে। তার হাত ধরেই লাগানো হয় গাছগুলো। তখন এটি ছিল নেহাৎ বৃক্ষরোপণের একটি উদ্যোগ।

রাস্তাটির সঙ্গে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের রাস্তাগুলোর অনেকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একে প্যারিস রোড বলতে থাকেন। সেই থেকে রাস্তাটি প্যারিস রোড নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

আড্ডা ও গানের আসরেরও একটি আদর্শ জায়গা এ রাস্তা। গভীর রাতেও প্যারিস রোড থেকে ভেসে আসে ছাত্রদের সম্মিলিত কণ্ঠে গানের সুর। মন খারাপের সময়ে দুপাশে সারি সারি সোডিয়াম লাইটের নিচে আলো-আঁধারি পরিবেশে হেঁটে প্রশান্তি খুঁজে পান অনেকে।

সুন্দর রাস্তা ‘প্যারিস রোড’। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে এলে প্রথমেই মনে পড়ে মমতায় ঘেরা রাস্তাটিকে এক নজর দেখে আসি। রাতে হঠাৎ যদি কারো ঘুম উধাও হয় চোখ থেকে, কিংবা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গরমে জীবন যায় যায় অবস্থা, সেই মুহূর্তে অনেকের মনে পড়ে প্যারিস রোডের শীতল হাওয়ার আত্মাটাকে একটু জুড়িয়ে নেওয়ার কথা।

যেভাবে যাবেন

প্যারিস রোড দেখতে যেতে চাইলে বাসে বা ট্রেনে যেতে পারেন। ঢাকার কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনযোগে রাজশাহী যেতে পারেন। ঢাকার কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে বিভিন্ন পরিবহনের বাস ছাড়ে। সেখান থেকে বাসেও পৌঁছাতে পারেন রাজশাহী। রাজশাহী নামার পর অটো বা রিকশাযোগে সরাসরি চলে যেতে পারেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা থেকে রাজশাহীতে ট্রেন ও বাসের ভাড়া যথাক্রমে ৩৫০ টাকা ও ৪৮০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

রাজশাহীতে থাকার ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। মহানগরীর জিরো পয়েন্ট, রেলগেট, লক্ষ্মীপুর, সিএন্ডবি মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল। এসব হোটেলে ৭০০-২৫০০ টাকায় রুম ভাড়া পাওয়া যাবে।

কোথায় খাবেন

মহানগরীর জিরো পয়েন্ট, রেলগেট, লক্ষ্মীপুর, সিএন্ডবি মোড়ে উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ সংলগ্ন খাবারের দোকানেও খেতে পারেন। এ ছাড়া চেখে দেখতে পারেন বিখ্যাত কালাই রুটি।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি