লঞ্চে আগুন নিয়ে লামিয়ার বর্ণনায় নদীতে যেন ‘টাইটানিকে’র সেই করুণ দৃশ্য

লঞ্চে আগুন নিয়ে লামিয়ার বর্ণনায় নদীতে যেন ‘টাইটানিকে’র সেই করুণ দৃশ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০১:০০ ২৬ ডিসেম্বর ২০২১  

অগ্নিকাণ্ড কবলিত সেই লঞ্চ

অগ্নিকাণ্ড কবলিত সেই লঞ্চ

বরগুনার রাসেল শুক্রবার স্ত্রী-সন্তান, শাশুড়িসহ ৯ আত্মীয়কে নিয়ে ঢাকা থেকে অভিযান-১০ লঞ্চে ফিরছিলেন গ্রামে। লঞ্চে যখন আগুন লেগে যায় তখন প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন দুই সন্তানকে বাঁচাতে। তাদের বাঁচাতে গিয়ে আগুনে দ্বগ্ধ হয়েছেন মারাত্মকভাবে। 

বর্তমানে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিজে পুড়েও দুই সন্তানকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপে হাসপাতালে বিলাপ করছেন। 

খালাতো বড় বোনের বাসায় তাদের বিয়ের দাওয়াত ছিল। সেখানে অংশ নিতেই তারা বরগুনা যাচ্ছিলেন। কিন্তু সে যাত্রায় যে এত মূল্য দিতে হবে এটা কে জানতো?

শনিবার হাসপাতালে আইসিইউর সামনে কাছে এসব কথা জানান রাসেলের স্বজন রুপা এবং কোহিনুর। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, বরগুনায় লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া রোগীদের চার, পাঁচ ও সপ্তম তলায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনজন রয়েছেন আইসিইউতে। অধিকাংশ রোগীর শরীরের বিভিন্ন অংশে আগুনে ঝলসে গেছে।

ভয়াবহ এই লঞ্চ দুর্ঘটনার সময় চিকিৎসাধীন আহত ও তাদের বরাত দিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে যে বর্ণনা শোনা যাচ্ছে তাতে ট্রাজেডির সেই টাইটানিক ছবির কথা মনে পড়ছে। যেন মিলে গেছে- বাঁচার জন্য যাত্রীদের নদীতে ঝাঁপ, মাঝ সমুদ্রে একটুখানি আশ্রয় খোঁজা, নিজে বাঁচতে অন্যের আশ্রয় কেড়ে নেওয়ার মতো সেই সব করুণ দৃশ্য।

বর্ণনায় রাসেলের স্বজনরা জানান, আমার বাচ্চা দুইটাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন রাসেল। এ কারণে তার সারা শরীর পুড়ে গেছে। বাচ্চাদের বাঁচানোর জন্য তিনি অনেক সাহস দেখিয়েছেন। এজন্য পোড়াটা অনেক বেশি, শরীর দেখার মতো না।

অপরদিকে রাসেলের স্ত্রী পুতুলও দগ্ধ হয়ে বরিশালে আইসিইউতে রয়েছে। রোববার সকালে তাদের সঙ্গে থাকা তিনজনের মরদেহ পাওয়া গেলেও সন্তানদের এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। শাশুড়ি, শ্যালকের স্ত্রী এবং শ্যালকের মেয়ের মরদেহ পাওয়ার পর বরগুনায় নিজ এলাকায় তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

দেড়ঘণ্টা সাঁতরে কলা গাছের সাহায্যে কূলে ওঠেন লামিয়া। দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া লামিয়ার মুখমণ্ডল ও হাত-পা অনেকটাই দ্বগ্ধ হয়েছে। 

ভর্তি আছেন বার্ন ইউনিটের পাঁচ তলায় পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে। সেখানে কথা হয় তার চাচাতো বোন সুরাইয়া ইসলামের সঙ্গে। সেদিনের ঘটনার বর্ণনায় লামিয়ার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ওরা দুই বোন। ওর বাবা-মা আর আমার দাদী ছিল। সিলিন্ডার বিষ্ফোরিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়। ওর গায়ে আগুন লেগে যাওয়ার পরে কেউ একজন ধাক্কা দিয়ে পানির মধ্যে ফেলে দেয়। 

ও (লামিয়া) বলছে যে আমাকে বাঁচান বাঁচান। ওর গায়ে বোরকা ছিল, তা খুলে ফেলে দিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার মত সাঁতার কাটার পর একটা কলাগাছের মতো পায়, কতক্ষণ সাঁতার কাটে। পরে আরেকজন এসে নাকি কলাগাছটা নিয়ে ওকে ফেলে দেয়।

এভাবে আবার কতক্ষণ সাঁতার কাটে। এরপর এক মুরুব্বি সাঁতার কাটতেছে দেখে তাকে বলে আমাকে একটু বাঁচান। পরে ওই মুরব্বি ওকে কোলে তুলে পাড়ে নিয়ে আসে।

তাদের সবার বাড়ি বরগুনার বালিয়াতি ইউনিয়নে জানিয়ে সুরাইয়া বলেন, আমার চাচি আর ছোট বাচ্চা নুসরাত (৯) এখনো নিখোঁজ। বাবা, দাদি আর হাসপাতালে ভর্তি লামিয়া বেঁচে আছে।

লামিয়ার বাবা মা ও দাদিকে বাঁচানোর জন্য নদীতে ঝাপ দিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টার মতো সাঁতার কেটে ট্রলারের সাহায্যে কূলে আসেন।

আইসিউতে কর্মরত চিকিৎসক তানভীর বলেন, বর্তমানে সেখানে তিনজন ভর্তি আছেন। দুই জনের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। তাদের অবস্থা আশাঙ্কাজনক। লাইফ সাপোর্টে আছেন।
 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমএস