মারহাট্টা ডিচ : বর্গি ঠেকাতে কলকাতার স্মৃতিকথা

মারহাট্টা ডিচ : বর্গি ঠেকাতে কলকাতার স্মৃতিকথা

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:৩২ ১৩ ডিসেম্বর ২০২১  

‘মারহাট্টা ডিচ’ । ছবি : সংগৃহীত

‘মারহাট্টা ডিচ’ । ছবি : সংগৃহীত

কলকাতার গলিতে গলিতে খোঁজ মিলবে লুকায়িত সব গল্পের। যে গল্পগুলো সৃষ্টির পেছনে রয়েছে নানা কারণ। ‘মারহাট্টা ডিচ’ তেমনই একটি গল্পের জন্ম দিয়েছে কলকাতার ইতিহাসে। বর্গি ঠেকাতে কলকাতার মানুষের শ্রমসাধ্য একটি ইতিহাসের সাক্ষ্য এটি।

১৭৪০ সালের কথা। নবাব আলিবর্দি খাঁ বসলেন বাংলার মসনদে। মসনদে বসার আগেই একচোট যুদ্ধ। বসার পরে তো সর্বক্ষণই যুদ্ধ। আজ অমুকের আক্রমণ,তো কাল তমুকের। আলিবর্দির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। সিংহাসন দখলের দুই বছরের মধ্যেই ১৭৪২ এর এপ্রিল মাসে তিন হাজার ঘোড়সওয়ার আর একহাজার পদাতিক সেনা নিয়ে মারাঠা থেকে উজিয়ে এলেন ভাস্কর পণ্ডিত। চৌথসহ অন্যান্য কর আদায় করতে। শুধু আদায় করা কি আর কাজ? মারধোর, লুটতরাজ তো চলতই।

বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে চলেছিল লুট। নারীদের ওপর চলতে থাকে অত্যাচার। আলিবর্দি খাঁ প্রথমে জুত করে উঠতে পারেননি ভাস্কর পণ্ডিতের সঙ্গে। পালিয়ে বেঁচেছিলেন। ১৭৪২-এর ৬ মে সারাদিন বাংলার রাজধানী মকসুদাবাদে লুট চালায় ভাস্কর পণ্ডিত। পরে বেশ কৌশল করে ভাস্করজিকে ঘরে ডেকে হত্যা করেন বাংলার নবাব। মারাঠা দস্যুরা অবশ্য তারপরেও অপ্রতিরোধ্য। ফের আসে রঘুজি ভোঁসলে। কখনো বাংলার গ্রামাঞ্চল, কখনো উড়িষ্যায় তারা ঘাঁটি গড়ে আর লুট চালায়। আর তাদের ধাওয়া করতে করতে ছুটে মরেন আলিবর্দি খাঁ।

এসবের জন্যই ওই ছড়াটার সৃষ্টি:

‘ছেলে ঘুমোলো পাড়া জুড়োল, বর্গি এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কি সে’

চারপাশে যখন এসব হচ্ছে, কলকাতার লোকদেরও মনে ভয় বাসা বাধে। এই বুঝি আসছে বর্গির দল। ইংরেজ সাহেবরা যেটুকু ব্যবস্থা করেছে তা বিপুল মারাঠা শক্তির কাছে কিছুই না।

তাই কলকাতার মানুষ নিজেরা ঠিক করল, শহর জুড়ে খাল কাটা হবে। সাত মাইল লম্বা ৪২ গজ চওড়া খাল। কোম্পানির কাছ থেকে আগাম টাকা নেওয়া হল। ২৫ হাজার টাকা। বৈষ্ণবচরণ শেঠ, রামকৃষ্ণ, রাসবিহারী ও উমিচাঁদরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন যে জনগণ এই টাকা ফেরত দেবে। গোটা কলকাতা উপুড় হয়ে পড়ল খাল কাটতে। ছয় মাসের মধ্যে তিন মাইল খাল কাটা হল। জনগণের ভাবনা ছিল মারাঠারা আক্রমণ করলেও, ব্যাটারা যেন ওই খালে আছাড় খেয়ে মরে।

তবে ইংরেজরা কিছু পারুক বা নাই পারুক, সেই খালের একটা নাম রেখেছিল, ‘মারহাট্টা ডিচ’।  মারাঠা থেকে ‘মারহাট্টা’ আর ‘ডিচ’ হল পরিখা বা খাল।

বাগবাজার স্ট্রিট থেকে শুরু করে যানবাজার হয়ে বেগবাগান পর্যন্ত দৌড়ল খাল। এরপর থেমে গেল। খাল আর সম্পূর্ণ হল না। মারাঠাদের সঙ্গে কী একটা রফা হয়ে গেল নবাবের। ফলে, অনেক কষ্টে তৈরি মারাঠা ডিচ আধাখেঁচড়া হয়ে থেকে গেল।

পরে ১৭৯৯-তে তার ওপরেই তৈরি হল আপার ও লোয়ার সার্কুলার রোড। খানিকটা হ্যারিসন রোডও। আর বাকিটা নাকি শহরের জঞ্জাল জমেই বন্ধ হয়েছে। বাগবাজারে মারাঠা ডিচ রোড নামে আজও সেই স্মৃতি রয়েছে, কলকাতার আত্মরক্ষার স্মৃতি।

তবে, শেষ পর্যন্ত আসেনি বর্গিরা। কিন্তু, এহেন হামলে পড়ে খাল কাটার বহর দেখে চারদিকে কলকাতাবাসীর একটা নতুন নাম হয়ে গেল ‘ডিচার্স’। অর্থাৎ খাল কাটে যারা। মারাঠা দস্যুরা কলকাতাবাসীদের ক্ষতি করেনি ঠিকই, কিন্তু নতুন নাম  দিয়ে গেল।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি