পানিতে ডুবে মানুষের জীবন বাঁচানো ও মৃতদেহ উদ্ধার করাই তার কাজ

পানিতে ডুবে মানুষের জীবন বাঁচানো ও মৃতদেহ উদ্ধার করাই তার কাজ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৪২ ১১ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৬:৪৪ ১১ নভেম্বর ২০২০

ছবি: শিভা

ছবি: শিভা

জীবনে অনেক ডুবন্ত লাশ উদ্ধার করেছেন এই ব্যক্তি। সেইসঙ্গে মৃতপ্রায় ব্যক্তিকেও উদ্ধার করে বাঁচিয়েছেন তিনি।  তার নাম শিভা। এ ধরনের দুর্ঘটনায় পুলিশ বাহিনীকে সহায়তা করেন ভারতের এক বাসিন্দা শিভা। এই কাজটি তিনি করছেন বহু বছর ধরে। 

এছাড়াও আত্মহত্যা করার হাত থেকেও তিনি শতাধিক মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। তিনি বলেন, তার বয়স যখন মাত্র ১০ বছর তখন হায়দ্রাবাদ শহরে একবার পুলিশের একটি বাহিনীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। 

পাশের একটি পুকুরে কেউ একজন ডুবে যাওয়ার পর তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছিল তারা। পুলিশের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল যে পুকুর থেকে কেউ ওই লোকটির মৃতদেহ তুলে দিতে পারলে তাকে কিছু অর্থ দেয়া হবে। ভারতীয় পুলিশের অর্থবলের অভাব রয়েছে। 

একই সঙ্গে অভাব রয়েছে উন্নত প্রশিক্ষণেরও। তাদের অনেকেই সাঁতার কাটতে জানে না। আবার পেশাদার একজন ডুবুরি ভাড়া করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থও তাদের নেই। একারণে তারা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মাঝে মধ্যে অপেশাদার ডুবুরিদের ওপর নির্ভর করে থাকে।

শুরুটা যেভাবে

শিভা জানান, প্রাথমিকভাবে পুলিশরা আমাকে দিয়ে এই কাজটি করাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তারা বলে যে আমার বয়স খুব কম। তবে শেষ পর্যন্ত আমি তাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হই।

পরে শিভা ডুবে যাওয়া লোকটির মৃতদেহ পুকুর থেকে উদ্ধার করেন। আর এজন্য তাকে দেয়া হয়েছিল ৪০ রুপি। আজকের দিকে এটা খুব সামান্য অর্থ হলেও তখনকার দিনে তা নেহায়েত কম ছিল না। এই ঘটনাটি ঘটেছিল ২০ বছর আগে। এখন তার বয়স ৩০।

দুই দশক আগে একজনকে পুকুর থেকে উদ্ধার করার ওই ঘটনাটি তার জীবনের শেষ ঘটনা ছিল না। ওই ঘটনাটি ছিল তার জীবনে এরকম একটি কাজে জড়িয়ে পড়ার সূচনা মাত্র। ২০ বছর পর এখনও ডুবে যাওয়া লোকজনকে উদ্ধারে স্থানীয় পুলিশকে সহায়তা করেন শিভা।

কাউকে ডুবতে দেখলেই পানিতে ঝাপ দেনে তিনিতার বাড়ি হায়দ্রাবাদ শহরের হোসেইন সাগর লেকের কাছে। শহরের একেবারে মাঝখানে কৃত্রিম এই লেকটি তৈরি করা হয়েছে। পর্যটকদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি জায়গা। প্রচুর মানুষ এখানে বেড়াতে যায়।

এছাড়াও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গনেশা উৎসবের সময় তাদের দেব দেবীর মূর্তি এই লেকে ভাসিয়ে দেয়। এসব মূর্তি একসময় লেকের পানিতে তলিয়ে যায়। তখন শিভা তলায় পড়ে থাকা এসব মূর্তির গা থেকে লোহা লক্কড় কুড়িয়ে এনে বাজারে বিক্রি করেন।

হায়দ্রাবাদ শহরের অন্যান্য নদী ও পুকুর থেকেও মৃতদেহ তুলে আনতে তিনি কাজ করেন পুলিশের সঙ্গে। লেকের তল থেকে শিভা যে শুধু মৃতদেহ তুলে আনেন তা নয়। অনেক সময় লোকজনকে আত্মহত্যা করার হাত থেকেও রক্ষা করেন শিভা।

কেউ পানিতে লাফ দেয়ার আগে তাকে ধরে ফেলেন। কখনো কখনো কেউ পানিতে লাফ দিয়ে পড়ে গেলে তিনি নিজেও লাফ দিয়ে তাকে উদ্ধার করে আনেন লেকের তল থেকে।

শিভা বলেন, লেক থেকে আমি কত লাশ তুলেছি তার হিসাব আমার কাছে নেই। তবে আমি এখনও পর্যন্ত ১১৪ জনের জীবন রক্ষা করেছি। এখন এই কাজটি করার ব্যাপারে তিনি তার স্ত্রীকেও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। লেক, নদী ও পুকুর থেকে নারীর মৃতদেহ তোলার জন্য একজন নারী ডুবুরির খুব বেশি প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

হোসেইন সাগর লেকের পাশে যে পুলিশ স্টেশন তার ইন্সপেক্টর বি ধানালাক্সমিও স্বীকার করেছেন যে এ ধরনের কাজ করার ব্যাপারে শিভা তাদেরকে অনেক বড় ধরনের সাহায্য করছে।

গত কয়েক বছরে তিনি কতজনের জীবন বাঁচিয়েছেন সেটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। তবে আমার বিশ্বাস এই সংখ্যা শতাধিক। তিনি আরো জানান, শিভা এরকম বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন যারা আত্মহত্যা করার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

শতাধিক মানুষকে বাঁচিয়েছেন তিনিশিভা কেন ডুবুরি হলেন?

শিভার পিতামাতা তাদের জীবনের একটি বড় অংশ রাস্তাতেই কাটিয়েছেন। শিভার শৈশবও কেটেছে সেখানে। কিছুটা সময় তিনি ছিলেন অনাথ আশ্রমে। পরে তিনি আরেকটি পরিবারে বেড়ে ওঠেছেন। তখন তার বয়স কত ছিল সেটা তার এখন আর মনে নেই। 

ওই পরিবারটিরও থাকার জন্য কোন বাড়ি ছিল না। ওই পরিবারে ছিল একজন নারী ও তার কয়েকজন সন্তান। শিভা জানান, ওই পরিবারের একজন সন্তান তাকে সাঁতার কাটতে শিখিয়েছিলেন। সেটাই তার জীবনের গতি বদলে দিয়েছে।

মানুষের জীবন বাঁচিয়ে তিনি বাড়তি কিছু অর্থও পেয়ে যান শিভা। তিনি বলেন, যাদের জীবন রক্ষা করেন পরে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে অর্থ দিয়ে থাকেন। এসব জীবন বাঁচানোর গল্প স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। 

একারণে তিনি সেখানে ছোটখাটো একজন সেলেব্রিটিতে পরিণত হয়েছেন। মোটামুটি সবাই তাকে চেনে। একারণে তেলেগু সিনেমাতেও তিনি ছোট খাটো চরিত্রে অভিনয় করার ডাক পেয়েছেন। তবে শিভা বলেন তিনি মনে করেন না যে মানুষের জীবন বাঁচানো কারো চাকরি হতে পারে।

মানুষের জীবন বাঁচানোর আনন্দ

তবে তিনি যে কাজ করেন তার জন্য এখন শরীরে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। হোসেইন সাগরের পানি মারাত্মকভাবে দূষিত। ডুবুরির পোশাক ও গিয়ার না পরেই তিনি ওই লেকের পানিতে ঝাপ দেন। এর ফলে তার ত্বকে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। 

একই সঙ্গে তিনি টাইফয়েডসহ আরো কিছু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এ বিষয়ে শিভা জানান, গিয়ার পরার সময় পাই না। কেউ যখন পানিতে লাফিয়ে পড়ে আপনাকেও তো তাড়াতাড়ি পানিতে নামতে হবে। 

এছাড়াও গ্রীষ্মকালে লেকের পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। সেখানে প্রচুর সাপও আছে। তারপরেও শিভার এই কাজ বন্ধ করে দেয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। শিভা বলেন, আমি এখানেই থাকতে চাই। কারো জীবন রক্ষা করার যে আনন্দ সেরকম তো আর কিছুতেই নেই।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস