‘মানবিক’ আকবরের অমানবিক নির্যাতন রায়হানের ওপর

‘মানবিক’ আকবরের অমানবিক নির্যাতন রায়হানের ওপর

সিলেট প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:০৩ ১২ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৬:৩৯ ১৩ অক্টোবর ২০২০

বরখাস্ত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া ও নিহত রায়হান ইসলাম (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

বরখাস্ত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া ও নিহত রায়হান ইসলাম (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

করোনা মহামারিতে লকডাউনের সময় একাধিকবার ফেসবুক লাইভে এসে মানুষকে ঘরে থাকার কথা বলেছিলেন আকবর হোসেন ভুইয়া। ঘরে থেকে প্রতিটি প্রাণ বাঁচাতে অনেক লম্বা সময় ফেসবুক লাইভে কথা বলতেন তিনি। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে খাবার নিয়ে বাড়িতেও ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। হয়ে ওঠেছিলেন একজন মানবিক পুলিশ অফিসার।

এই মানবিক পুলিশের অমানবিক নির্যাতনেই প্রাণ হারাতে হয়েছে রায়হানকে। পুলিশি নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত চিহ্ন নিয়ে এখন পরপারে রায়হান। আকবর হোসেন ভুইয়া সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ। পুলিশি নির্যাতনে মারা যাওয়া রায়হান ইসলাম সিলেট নগরীর আখালিয়ার নেহারিপাড়ার রফিকুল ইসলামের ছেলে।

আরো পড়ুন: পুলিশকে ৫ হাজার টাকা ঘুষ কম দেয়ায় লাশ হলেন রায়হান

এদিকে ফাঁড়িতে পুলিশি নির্যাতনে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। একইসঙ্গে তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

বন্দর ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া ছাড়া বরখাস্ত হওয়া অন্য তিনজন হচ্ছেন- এএসআই তৌহিদ মিয়া, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাশ ও হারুনুর রশীদ। আর প্রত্যাহার করা তিনজন হলেন- এএসআই আশীক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী, কনস্টেবল সজীব হোসেন।

এর আগে রোববার ভোরে পুলিশের নির্যাতনে রায়হান উদ্দিন নামে এক যুবক নিহত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তার স্বজনরা। নিহত ওই যুবক সিলেটের আখালিয়ার নেহারিপাড়ার রফিকুল ইসলামের ছেলে।

পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে মারা গেছেন রায়হান। তবে নিহতের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, পুলিশ ধরে নিয়ে নির্যাতন করে রায়হানকে হত্যা করেছে। রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় রোববার রাত আড়াইটার দিকে রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ না করে আসামিদের অজ্ঞাত রাখা হয়েছে।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, কে বা কারা রায়হানকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে হত্যা করেছেন। এজাহারে রায়হান বন্দরবাজার ফাঁড়ি থেকে যে মুঠোফোন নম্বর দিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, সেই নম্বরটিও উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ‘প্রতিদিনের মতো গত শনিবার বিকেল ৩টার দিকে তার স্বামী রায়হান আহমদ নিজ কর্মস্থল নগরীর স্টেডিয়াম মার্কেটস্থ ডা. গোলাম কিবরিয়া ও ডা. শান্তা রাণীর চেম্বারে যান। পরদিন ভোর ৪টা ৩৩ মিনিটে ০১৭৮৩৫৬..... মোবাইল নাম্বার থেকে শাশুড়ি (রায়হানের মা সালমা বেগম)-এর ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার (০১৭৮৭৫৭.....)-এ কল দিলে সেটি রিসিভ করেন রায়হানের চাচা হাবিবুল্লাহ।

ভিডিও লাইভে এসে মানুষকে ঘরে থাকার কথা বলেছিলেন আকবর হোসেন ভুইয়া। এ সময় রায়হান আর্তনাদ করে বলেন, তিনি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আছেন। তাকে বাঁচাতে দ্রুত টাকা নিয়ে বন্দর ফাঁড়িতে যেতে বলেন রায়হান। এ কথা শুনে রায়হানের চাচা ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে রায়হান কোথায় জানতে চাইলে দায়িত্বরত একজন পুলিশ বলেন, সে ঘুমিয়ে গেছে। আর যে পুলিশ রায়হানকে ধরে নিয়ে এসেছেন তিনিও চলে গেছেন। এ সময় হাবিবুল্লাহকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফাঁড়িতে আসার কথা বলেন ওই পুলিশ।

আরো পড়ুন: রাজপথে কেঁদে কেঁদে ছেলে হত্যার বিচার চাইলেন মা

পুলিশের কথামতো হাবিুল্লাহ আবারো সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফাঁড়িতে গেলে দায়িত্বরত পুলিশ জানান, রায়হান অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে রায়হানের চাচা ওসমানী হাসপাতালে গিয়ে জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, রায়হানকে সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তিনি মারা যান। এ সময় হাবিবুল্লাহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনকে খবর দিলে তারা গিয়ে ওসমানীর মর্গে রায়হানের ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ দেখতে পান।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, আমার স্বামীকে কে বা কারা বন্দরবাজার পুলিশ  ফাঁড়িতে নিয়ে গিয়ে পুলিশি হেফাজতে রেখে হাত-পায়ে আঘাত করে এবং হাতের নখ উপড়ে ফেলে। পুলিশ ফাঁড়িতে রাতভর নির্যাতনের ফলে আমার স্বামী মারা যান। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম/এমআর