পৃথিবীতে ফুরিয়ে আসছে মিঠা পানি, বিজ্ঞানীদের ভয়াবহ তথ্য

পৃথিবীতে ফুরিয়ে আসছে মিঠা পানি, বিজ্ঞানীদের ভয়াবহ তথ্য

তানভীর আহম্মেদ সরকার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:১৪ ১৪ জুলাই ২০২০   আপডেট: ২২:০৬ ২১ জুলাই ২০২০

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আমাদের পৃথিবী একটি নীল গ্রহ। এই গ্রহে পানির কোন অভাব নেই। পৃথিবীতে প্রায় ৩২৬ মিলিয়ন ট্রিলিয়ন গ্যালন পানি আছে! এর মানে ৩২৬ এর পরে ১৮টি শূণ্য। এই বিপুল সংখ্যা, লাখ কিংবা কোটিতে প্রকাশ করা সম্ভব না। আর এই পানি পৃথিবী বিভিন্ন সাগরে তরল আকারে আবার কিছু জমে আছে বরফ হয়ে। আর কোথাওবা বাতাসে জলীয় বাস্প হয়ে। 

ফাইল ছবি

আমাদের পৃথিবীতে এত পানি থাকলেও এই পানির প্রধান সমস্যা হলো ৯৭ শতাংশ পানিই লবনাক্ত, যা পান করার যোগ্য নয়। বাকি দুই শতাংশ পানি বরয় হয়ে জমে আছে। আর সমগ্র মানুষ জাতি টিকে আছে মাত্র এক শতাংশ তরল মিঠা পানির উপর। এই পানিও অতি দ্রত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে আমাদের পানির অপচয় তো আছেই। 

আর এই একভাগ মিঠা পানির বেশিরভাগই রয়েছে মাটির নিচে। কিন্তু এই পানি উত্তলন করা সম্ভব নয়। তাই অতীতকাল থেকেই মানুষ সেসব অঞ্চলে বসবাস করছে যেখানে মাটির উপরে পানি পাওয়া যায়। বর্তমানে পৃথিবীর ৯০ শতাংশ লোক এমন জায়গায় বসবাস করে যেখানে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার জায়গায় মধ্যে মিঠা পানির ব্যবস্থা আছে। 

ফাইল ছবি

দিন দিন পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বহুগুণে বাড়ছে পানির চাহিদা। শুধুমাত্র গত ১০০ বছরে পানির ব্যবহার বেড়েছে সাত গুণ। শহরাঞ্চলে পানির চাহিদা মিটাতে আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে পানির উত্তলনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আর এ কারণে মাটির নিচে কমছে পানির স্তর। 

ফাইল ছবি

মাটির নিচে যে পানি থাকে তাকে বলা হয় অ্যাকুইফার বা ভুগর্ভস্ত জলস্থর। মাটির নিচ থেকে ইচ্ছা মতো পানি তোলার অনেকগুলা ক্ষতিকর দিক রয়েছে, এর ফলে সে অঞ্চলের মাটি ডেবে যেতে পারে। প্রচুর পানি উত্তলনের কারণে মেক্সিকো সিটির কোন কোন জায়গা প্রতি বছর ৯ ইঞ্চি করে ডেবে যাচ্ছে। ভারতের উত্তরাঞ্চলের কোন কোন জায়গায় ২৯ ট্রিলিয়ন পানির মজুদ কমে গেছে। পৃথিবীর সকল অঞ্চলেই পানির অধিক ব্যবহারের কারণে আর কিছুদিনের মধ্যেই ভু-গর্ভস্থ পানির মজুদ শেষ হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে তুষারপাত এবং বৃষ্টি কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এরফলে অনেক নদী এবং হ্রদ শুকিয়ে যাচ্ছে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক এলাকাই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে চলছে শুস্ক মৌসুম। বর্তমানে পৃথিবীর প্রতি ১০ জনের মধ্যে সাত জনের বাড়িতেই পানির লাইনের সংযোগ আছে। এত সহজে পানি পাওয়ার ফলে আমরা ভুলেই গেছি টেপ ছেড়ে পানি পাওয়ার জন্য মানব সভ্যতার কষ্ট। অতীতে প্রতিটা মানব সভ্যতাই গড়ে উঠেছিলো পানির উৎকে কেন্দ্র করে। অতীত এবং বর্তমানে আবার বহু সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে শুধুমাত্র পানির অভাবে। 

ফাইল ছবি

শুধু এখানেই শেষ নয়। পানরি জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যেই সৃষ্টি হচ্ছে দন্ধ। সুদানের দারফুরে যুদ্ধ লাগার অন্যতম কারণ ছিলো পানি। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও ২০০৬ সালের ক্ষরার অনেক প্রভাব ছিলো। 

ধারনা করা হচ্ছে ২০৪০ সালের মধ্যে পৃথিবী মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত মিঠা পানি থাকবে না। বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান সেচস এর বিজ্ঞানীদের মতে, একবিংশ শতাব্দিতেই পানি পেট্রোলিয়ামের চেয়েও দামি হয়ে উঠবে। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখন থেকেই পানি মজুদ করতে শুরু করেছে ভবিষ্যতে অধিক দামে বিক্রির আশায়। 

ফাইল ছবি

পৃথিবীর বৃহত্তমে শরহগুলোর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে সবার আগে পানি ফুরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। ২০১৮ সালের ৯ জুলাইয়ের পর শহরটির বাসা বাড়িতে পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার কথা ছিলো। পানি ফুরিয়ে যাওয়ার এই দিনটিকে বলা হচ্ছিলো ‘ডে জিরো’। বিষয়টি আলোচনায় আসে ‘ডে জিরো’ এর মাত্র ৯২দিন আগে। এরপর থেকে কেপ টাউনের প্রত্যেকেই সচেতনভাবে পানি খরচ করেছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কেপ টাউনের বাসিন্দারা তাদের পানির ব্যবহার অর্ধেকের বেশি কমিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। 

ফাইল ছবি

শুধু কেপ টাউনই নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শহরগুলোতে খুব অচিরেই পানির সংকট তীব্র হবে। আর সেই তালিকায় যদি ভেবে থাকেন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বাদ যাবে তাহলে ভুল করবেন! তবে এখন দেখার বিষয় হচ্ছে বিভিন্ন দেশের রাজধানীগুলোর মধ্যে কার পানি আগে ফুরায়।

পানির সংকট যদি এখানেও শেষ হতো তাতেও সমস্যা ছিলো না। আসল সমস্যা হলো আমরা পৃথিবীর একভাব পানি কিভাবে ব্যবহার করছি। মানুষের প্রতিদিন প্রায় চার লিটার পানি পান করা উচিৎ। এছাড়া নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাছে জন প্রতি আরো ৫০ লিটারের বেশি পানির প্রয়োজন হয়। একবার টয়লেট ফ্ল্যাস করলে পাঁচ থেকে আট লিটার পানি চলে যায়। 

পৃথিবীতে ব্যবহারযোগ্য পানির মধ্যে বেশিরভাগ পানিই ব্যবহার হয় কৃষি এবং শিল্প কারখানায়। সেচ কাজে পৃথিবীর ৭০% এবং শিল্প কারখানায় ২২% পানি ব্যবহৃত হয়। বেশিরভাগ দেশই তাদের শুস্ক এলাকায় এমনসব কৃষিপণ্য চাষ করে যেখানে পানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

ফাইল ছবি

বেশিরভাগ কৃষি জমিই সেচ করা করা হয় খুবই অদক্ষ উপায়ে। পানির লাইন চালু করে ক্ষেত পানিতে তলিয়ে দেয়া হয়। পানির যদি আমরা মূল্য দিতে জানতাম তাহলে এভাবে পানির অপচয় করা হতো না। 

ফাইল ছবি

একটা ৬০০ এমএল কোকাকোলা তৈরি করতে বিভিন্ন ধাপে ২৮ লিটার পানি খরচ হয়, আর এর বোতাল তৈরি করতে লাগে সাত লিটার পানি। আর এককাপ কফি বানাতে পানি লাগে ১৩০ লিটার। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন এক কাপ কফি বানাতে এত পানি কিভাবে লাগে? এক কাপ কফি বানাতে তো একাপই পানি লাগে না?

ফাইল ছবি

কিন্তু আসলে তা না। সেই কফি জমিতে চাষ হওয়া থেকে শুরু করে ফ্যাকটরিতে প্রক্রিয়াজাত হওয়া পর্যন্ত হিসাব করলে পরিমানটা এমনই দাঁড়ায়। 

সকল দেশের পানির মজুদ এবং মূল্য সমান নয়। মাথাপিছু পানির পরিমানে কথা চিন্তা করলে পৃথিবীতে সবচেয়ে দরিদ্র দেশ কুয়েত। আর সবচেয়ে ধনী দেশ কানাডা। কানাডা কুয়েতের চেয়ে দ্বিগুণ বা দশগুণ নয় প্রায় দশ হাজারগুণ বেশি পানি আছে। অনেক দেশে মিঠা পানির চাহিদা পূরণ করার জন্য গত দশ বছরে সমুদ্রের পানি লবনমুক্ত করার প্রক্রিয়া দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু আমরা যে পরিমান পানি ব্যবহার করি আর একভাগও এ প্রকিয়ায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। সমুদ্রের পানি লবনমুক্ত করতে প্রচুর পরিমান জ্বালানি এবং অর্থ খরচ হয়।

চিন্তা করুনতো যদি আপনার বাড়িতে একদিন পানি না থাকে তাহলে কী হবে? পানি কতোটা মুল্যবান তা উপলদ্ধি করতে হবে। তাই আসুন সময় শেষ হওয়ার আগেই আমরা পানি ব্যবহারে সচেতন হই। 

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস/