কলেজ শিক্ষকের মৃত্যু: সামাজিক নিপীড়নের বলি

কলেজ শিক্ষকের মৃত্যু: সামাজিক নিপীড়নের বলি

জান্নাতুল যূথী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৩৭ ১৫ আগস্ট ২০২২   আপডেট: ১৮:৪২ ১৫ আগস্ট ২০২২

সভ্য সমাজের মানুষ হিসেবে কিছু রীতি-নীতির মধ্যে দিয়ে সবাইকে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। কিন্তু এই সভ্য সমাজের যে বাসিন্দারা কি আসলেও সভ্য? নীতির বুলি আওড়ানো সবার একটা সাধারণ স্বভাবে পরিণত হয়েছে। অন্যের বেলায় হলেই দোষ, নিজের বেলায় তা স্বর্গের সমান পবিত্র। কথা হলো মানুষের বিবেক বর্তমানে কি এতটুকুও জাগ্রত আছে? ক’দিন আগেই একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যম থেকে শুরু করে নেট পাড়া সরগরম ছিল। একজন ৪০ বছরের শিক্ষিকার সঙ্গে ২২ বছরের যুবকের বিয়েকে কেন্দ্র করে। সাধারণভাবে মনে হতেই পারে, বিয়েকে কেন্দ্র করে তো কোনো কথা বলার সুযোগ এখানে নেই। কিন্তু অনেকের চোখ আটকে গেছে বয়সের ব্যবধানে। যে বয়স শুধু সংখ্যা ছাড়া কিছুই নয়। দুজন মানুষের সুখে ঘর বাঁধতে যা নিষ্প্রয়োজন। 

সামাজিকভাবে সভ্য মানুষের তকমাধারীদের মুখ বন্ধ করতে তারা বিয়ে করে সামাজিক ও ধর্মীয় বিধানকেই গুরুত্ব দিয়েছিল। কিন্তু তা দিলেই বা কী? অন্যরা যেদিকে হাঁটবে সেটাই দোষ। নিজের বেলায় সাধু-সন্ন্যাস ভাব ধরা কিছু ভণ্ড লোকের স্বভাবে পরিণত হয়েছে, অন্যের দোষ ধরা। এখন কথা হলো, যারা রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কোনো বিধানকেই উপেক্ষা না করে ঘর বাঁধলেন, তারা কেন কিছু কুরুচি-বিকৃত মানসিকতার শিকারে পরিণত হলেন?

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দায় সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রচলিত গণমাধ্যমগুলোর। এর দায় এড়ানো সম্ভব নয়। কারণ বিয়ের মাধ্যমে যে পবিত্রতার স্থান দিয়েছিল, সেখানে বারংবার কটাক্ষ-বিদ্রূপ-তিরস্কারের শিকার হতে হয়েছে তাদের। আর এই কাজে প্রধান সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যম। বাজে মানসিকতার কারণে গণমাধ্যমের কিছু কর্মী বিশেষভাবে উঠে পড়ে লেগেছিলেন। দেখে মনে হচ্ছিল, তারাও সমাজের প্রথার বাইরে গেলে যে মানুষকে মরতে হয়, তা প্রমাণেই ব্যস্ত ছিল।  মানুষের সামনে রঙ্গরসে ভরিয়ে তুলে বেডরুম পর্যন্ত তাদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।

এই দম্পতিকে পুরো দেশের মানুষের কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দেয় গণমাধ্যমগুলো। সেইসঙ্গে সুযোগ খুঁজে নিয়েছে কিছু উগ্র শ্রেণির মানুষ। মন্তব্যের ঘরে নানারকম বাজে-কুরুচি-বিকৃত মন্তব্যে ভরিয়ে তোলে তারা। ফলে শুধু যে নাটোরের গুরুদাসপুরেই মাত্র একটি গ্রামের মধ্যেই তাদের  হেনস্তা হতে হয়েছে এমন নয়, বরং পুরো দেশবাসী মিলে তাদের নিয়ে মুখরোচক গল্প সাজিয়ে তুলেছে। বিষ ছড়িয়ে দিয়েছে সারা শরীরে। 

মানুষের সহ্য-ধৈর্যের সীমা আছে। কিন্তু কিছু অসভ্য-বর্বর মানুষের কারণে সীমাও অতিক্রম করে মানুষ। পাহাড়কে কি ভাঙা যায়? কিন্তু পাহাড়কেও যদি দুদিক থেকে বল প্রয়োগ করা যায়, তবে ভাঙবেই। মনোবল কতটা বেশি থাকলে সামাজিক মন্তব্যের তোয়াক্কা না  করে বিয়ে করেন দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। কিন্তু শেষপর্যন্ত শিক্ষিকা পৃথিবীর বুকে টিকতে পারলেন না বেশিদিন। হত্যা-আত্মহত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যু, যাই ঘটুক সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত।  এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর দায় কী সমাজের এসব বর্বর রুচিসম্পন্ন, নিকৃষ্ট মানুষের নয়? একের পর এক ব্যক্তিগত আক্রমণ, মন্তব্য ছুড়ে অতিষ্ঠ করা, তাদের জীবনকে বিষিয়ে তোলার নেপথ্য কারণ নয়? 

আজকাল ইন্টারনেটের যুগ। কিন্তু এই নেটপাড়া দখল করা অধিকাংশ মানুষের শিক্ষার অভাব, রুচির অভাব। ব্যক্তিগত সব বিষয়ে তাদের নাক গলানো চায়। কথাটায় হয়তো কিছু ব্যক্তির গা জ্বলবে। কিন্তু  চোখ-কান খুলে বিশ্লেষণ করলে হয়তো কথাটা ফেলা দায়। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ।  কিন্তু মানুষের আচার-আচরণ  পশুর চেয়ে শতগুণ নিম্ন নেমে গেছে বর্তমানে। পশুরও পশুর প্রতি দরদ-মমত্ববোধ কাজ করে। কিন্তু মানুষের মাঝে না আছে শ্রদ্ধাবোধ না আছে একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা। সামাজিকভাবে বর্তমান সময় খুবই ভয়ঙ্কর। ওঁতপেতে বসে আছে হিংস্র হায়েনারা। যেন প্রতিটি মানুষের খুঁত ধরা, দুর্বল জায়গায় আঘাত করে তাকে রক্তাক্ত করতে পারলেই একটা পৈশাচিক-বিভৎস ধরনের আনন্দ হয় এসব মানুষদের। অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হওয়া শিক্ষিকার তো প্রস্থান ঘটেছেই। জীবনের কাছে হেরে গিয়ে। কিন্তু সেই হার কী এই সমাজের মানুষের বিবেককে নাড়া দেয় না এখনো?

আর কত সামাজিকতার নামে বলি হবে মানুষের জীবন? আজ শিক্ষকে মৃত্যু, কাল আরেক জনের মৃত্যু, তারপর আর একজনের? এই পালাক্রম আর কতদিন? চোখ কি আমাদের সত্যিই কখনোই খুলবে না! না কি জেগে ঘুমানো মানুষের ঘুম কখনোই ভাঙবে না এমন দশা আমাদের?

সামজিকভাবে কতটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে, যারা ভালোবেসে কাছে এলো, বিয়ে করলেন, তারা এতটা ভয়াবহ আচরণ করে ফেলতে পারেন! সামাজ নামক জাঁতাকলে পড়ে এই মৃত্যুর বিচার কার কাছে চাইবে মানুষ? এর দায় কারো একার নয়।

যেই প্রথার চর্চা করতে গিয়ে অন্যের জীবন বিপন্ন হচ্ছে, সেই প্রথা-নিয়মের চর্চার ধারা ভাঙতে হবে।  কেন একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে সাধুবাদ জানানোর ক্ষমতা নেই আমাদের। যদি আপনার-আমার মতের সঙ্গে না মেলে সেক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করা উচিত। অন্যের জীবনকে নিঃশেষের পথে নিয়ে যেতে বাধ্য করা কোনোভাবেই উচিত নয়। এই খায়রুন নাহার সামাজিক নিপীড়নের শিকার, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই আর কোনো মানুষকে যেন তার মতো সামাজিক নিপীড়নের বলি হতে না হয়, সেই প্রতিজ্ঞা আমাদের এখনই করতে হবে।

লেখক: গবেষক ও শিক্ষক

ডেইলি বাংলাদেশ/এমএস