সাঁতার শেখা, বা না শেখা 

সাঁতার শেখা, বা না শেখা 

মহিউদ্দিন কিবরিয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৪২ ২১ জুলাই ২০২২   আপডেট: ১৭:৪৯ ২১ জুলাই ২০২২

মাত্র কয়েকদিন আগে পদ্মানদীতে ডুবে মারা গেল এক সম্ভাবনাময় তরুণ আর্কিটেক্ট ছাত্র। আজ খবর পেলাম  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট সদ্য বিবাহিত তরুণ এক সরকারি কর্মকর্তার পানিতে ডুবে মৃত্যুর মর্মান্তিক খবরটি। গত এক সপ্তাহের মধ্যে এই দুইটি শোক সংবাদের প্রেক্ষিতেই আমার এই সামান্য লেখা। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে  "Center for Injury Prevention and Research Bangladesh" এর এক জরিপ মতে প্রতি বছর দেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার। এই সংখ্যাটি আমরা অনেকেই না জানলেও প্রায় সময়ই দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণ-যুবক একা বা দল বেঁধে যখন পানিতে ডুবে অকালে মৃত্যুবরণ করে, তখন আমরা সবাই কমবেশি সেই শোকে মুহ্যমান হই বৈকি।‌ আমার ধারণা, এই বিপুল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সাঁতার কাটতে না জানা, বিশেষ করে শহরাঞ্চলের তরুণ যুবকদের।  

অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়াতে সাঁতার কাটতে জানাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দক্ষতা (Skill) হিসেবে গণ্য করা হয়। এইজন্য মাত্র দুই মাসের শিশুও এই দেশে সাঁতার শেখার জন্য আইনত উপযুক্ত। গোটা অস্ট্রেলিয়াতে আনুমানিক ২১০০টি এ্যকোয়াটিক সেন্টারে সব বয়সের নারী-পুরুষের সাঁতার শেখা সহ বিভিন্ন ধরনের চিত্ত বিনোদন মূলক সাঁতার কাটা, পানির খেলাধুলা ও শারীরিক ব্যায়ামের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও অনেকের বাড়ির সীমানায় ছোট-বড় সুইমিং পুলের সংখ্যা হচ্ছে ১২ লক্ষেরও বেশি। সিডনির আশেপাশের বিভিন্ন বীচে উন্মুক্ত "ওশেন পুল" আছে ৩৫ টি। সরাসরি সাগরের পানির সাথে সংযুকত এই ওশেন পুলের তাপমাত্রা সীতাতপ নিয়ন্ত্রিত না হলেও সাঁতারের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ। মোটকথা সুইমিং পুল ও এ্যকোয়াটিক সেন্টারগুলি কয়েক লক্ষ লোকের জীবিকার সংস্থান করে থাকে। এই কারণেই অস্ট্রেলিয়াতে প্রতিবছর তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের ওয়াটার অ্যাথলেট। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতার আসরে অস্ট্রেলিয়ার সাঁতারুদের মেডেল পাওয়া এখন একটি নিয়মিত রুটিন বিষয়। 

কিন্তু এত কিছু সত্বেও প্রতিবছর পানিতে ডুবে বেশ কিছু অমূল্য  প্রাণহানি ঘটে । অস্ট্রেলিয়াতে গত ১৫ বছরে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছেন ১০৮৭ জন। এই মৃত্যু সুইমিং পুল ছাড়া শুধু মাত্র নদী, সাগর ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক জলাশয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। Royal Life Saving Society Australia এর হিসাব মতে এই বছরে ইতিমধ্যেই ১১২ জন পানিতে ডুবে মৃত্যু বরণ করেছে। এছাড়াও প্রায় বছরেই বন্যার সময় সরকার ঘন ঘন বিভিন্ন সতর্কতামূলক ঘোষণা দিয়ে থাকে। বিশেষ করে সবাইকে বন্যার পানি থেকে দূরে থাকার জন্য বারংবার নিষেধ করা সত্ত্বেও অনেকেই নতুন পানিতে গা ভেজানোর ইচ্ছাকে দমন করতে না পেরে মৃত্যুর মতো বিপর্যয়কে ডেকে আনে। মোট কথা সাঁতার শেখার বিষয়টা অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় জীবনে শুধুমাত্র ব্যক্তি নিরাপত্তাই না, বরং এর সাথে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 

কিন্তু ২০২০ সালে শুরু হওয়া অতিমারি করোনার কারণে বিগত দুই বছরের বেশি সময় দেশের সমস্ত অ্যাকোয়াটিক সেন্টার ও বাণিজ্যিক সুইমিংপুলগুলি বন্ধ থাকায় সাঁতার শেখার কার্যক্রম দারুন ভাবে ব্যহত হয়েছে। এই অবস্থায় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ জরিপে দেখা গেছে আগামীতে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৫-২০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। মাত্র আড়াই কোটির কম জনসংখ্যার দেশ অস্ট্রেলিয়ার কাছে সাঁতার শেখানোর বিষয়টি অতি জরুরী হলেও আমাদের নদীমাতৃক বাংলাদেশে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আমরা আদৌও বিশেষ ভাবে চিন্তা করি কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।  উদাহরণ স্বরূপ, দেড় কোটির কাছাকাছি জনসংখ্যার রাজধানী ঢাকাতেই সাধারণ মানুষের সাঁতার শেখার জন্য প্রয়োজনীয় সুইমিং পুলের সংখ্যা সম্ভবত ১০ টির বেশি না। এর মধ্যে সামরিক বাহিনীর জন্যই সংরক্ষিত আছে তিন চারটি। 

এই অবস্থায় পানিতে ডুবে অকালে করুন মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে হলে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নুতন সুইমিং পুল তৈরির বিষয়টি আমাদের সবাইকেই অতি জরুরী ভাবে ভেবে দেখতে হবে। 

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট

ডেইলি বাংলাদেশ/এমএস