যুগল

যুগল

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২৩:২৫ ৭ মে ২০২২   আপডেট: ২৩:২৭ ৭ মে ২০২২

“আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার”। –জীবনানন্দ দাশ

দুজনের ভেতরে বয়সের পার্থক্যটাই প্রধান। একজন ৭০ এর কাছাকাছি। অন্য জন কিশোরী। মাত্র ১৪/১৫। মিল - দুজনেই অসম্পুর্না!

বর্ষীয়সী নারীটি আমার দাদার সৎমা। বিধবা। স্বামী বিগত হয়েছেন প্রায় তিন যুগ পূর্বে। আমরা তাকে ডাকি জেঠিমা। জন্মস্থান যমুনার উজান অঞ্চলের চিলমারী। এই এলাকায় অর্থাৎ যমুনার পূর্বতীরে তার আগমন ছয় যুগ পূর্বে। বিবাহের সূত্রে।

বন্যার তোড়ে ভেসে যাওয়া কচুরিপানার মতন নদী ভাঙ্গন এলাকার মেয়েরাও প্রবাহিত হয়। কখনও কাছের কূল দিয়ে। কখনও বা দূরের তীর দিয়ে। তবে সততই ভাটির দিকে। উজান বা প্রারম্ভের দিকে কখনোই নয়। তবে তার জন্মস্থানের পরিচয়টা কেউই বিস্মৃত হয় না। অন্তত তার জীবৎকালে। আমাদের বাড়ির বউঝিরা সকলেই কৌতুক করে ডাকে ‘উজান গাঙের মাইয়া’। অথচ বিয়ের পর থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি কখনই তার জন্মের স্থানে ফিরে যাননি। এমনকি তার জন্মস্থানের লোকজনের সাথেও তার সামান্যতম যোগাযোগ ছিল না।

তাকে বলা যেতে পারে নদী ভাঙনের পর নবদিগন্তে জেগে ওঠা চরের মৃত্তিকা। অন্য স্থানের পলিমাটি দিয়ে তার শরীর তৈরি হলেও, পূর্বের বা পূর্ব-জন্মের কোন স্মৃতি অবশিষ্ট ছিল না। তার দৃষ্টির গভীরতাও ছিলো সীমিত। চোখ দুটোকে মনে হতো ডিঙি নৌকার পানির ওপরে ভেসে থাকা পৃষ্ঠদেশে সাদা রঙ দিয়ে আঁকা। অনুভূতিহীন। অনির্দেশ্য পানে নিক্ষিপ্ত। ব্যতিক্রম কেবল দুটো মহার্ঘ সময়ে। 

প্রথমতঃ আমরা যখন বাবা মায়ের সাথে যখন নৌকায় অথবা গরুর গাড়িতে করে নানা বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। 

দ্বিতীয়তঃ দুপুরের কড়া রোদের ভেতরে রেডিওতে যখন ফেরদৌসি রহমানের সকরুণ কন্ঠে বাজত “হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারী বন্দরে”। এই দুটো সময়েই তার চোখ দুটো ক্রমশই অশ্রু সজল হয়ে উঠত। নৌকার পৃষ্ঠদেশে বৈঠার আঘাতে ছিটকে পড়া জলের মতো। হয়তো বা অকারণেই। কারণ, আমরা তাকে কখনই কারো সাথে তার মায়ের বাড়ির গল্প করতে শুনিনি।

দ্বিতীয় জন। নাম বেদেনা। জন্ম এই ভাটির দেশে। জন্মলগ্ন থেকেই তিনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। মানসিকভাবেও। সংসারের প্রথম সন্তান তিনি। তার জন্মের অব্যবহিত পরের বছরগুলোতে তার আরও তিন বোন এবং এক ভাইয়ের জন্ম হয়েছে। ছোট ভাই বোনগুলো তার চোখের সামনে তর তর করে বড় হয়ে গেছে। কিন্তু তার শরীরের বৃদ্ধি থেমে গিয়েছিল শৈশবের শেষের দিকে। মানসিক বয়স আটকে ছিল দুই অথবা তিন বছরে। অথবা এমনও হতে পারে যে, তার মানসিক বয়সের বৃদ্ধি ঠিকই ছিল, আমরাই বুঝতে পারিনি। কারণ দ্বিতীয় এই জন কথা বলতে পারেন না। শুধু গোঁ-গোঁ শব্দ করতে পারেন। তাতেই আমরা ধরে নিয়েছিলাম তার মানসিক বয়স ছিল বাক্য স্ফুরন হয়নি এমন শিশুর মতো। 

বিষয়টা কখনই আমাদের দৃষ্টির গোচরে আসতো না, যদি না আমরা শীতের সকালে তাদের দুজনকে একত্রে দেখতাম। প্রতিদিন সকাল বেলায় আমরা বাড়ির সবাই দেখতাম  এই দুজনে সকালের কুয়াশাচ্ছন্ন নরম আলোর ভেতরে বাড়ির মধ্যবর্তী উঠোনে পিঁড়ি পেতে শীতের রোদ পোহাচ্ছেন। পরস্পর নিবিড়-নিঃশব্দ আলাপচারিতায় মগ্ন। আমরা তাদের উঠোনের পাশ দিয়ে স্কুলে যাই। দুজনেই হাত নেড়ে আমাদেরকে বিদায় জানান। এই লৌকিকতা তাদেরকে কেউ শেখায়নি। অন্তর্গত। দুজনের মুখেই অলৌকিক, অনির্বচনীয় স্মিত হাসি। মনে হয় আমাদেরকে হাসি দিয়ে স্কুলে পাঠানোর জন্যেই তারা দুজনে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেছেন। আমাদেরকেকে নিয়েই তারা নিঃশব্দ আলাপচারিতায় মগ্ন ছিলেন এতক্ষণ!

নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এ এক অলৌকিক দৃশ্য। কিন্তু যেহেতু এই দুজনের কেউই আমাদের বা কারো জীবনেই কোন গুরুত্ব বহন করেন না, সেহেতু আমাদের নিকট বিষয়টা কখনই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়নি। আমরা অলৌকিক আলো, বাতাস অথবা সূর্যকিরণের মতো  তাদেরকে সর্বদাই অগ্রাহ্য করতাম। এর পরেও এই দুই অসম্পুর্না নারীর যূথবদ্ধতা দেখতে দেখতেই আমরা ক্রমশ বড় হয়ে উঠছিলাম। আমাদের চোখের সামনেই তারা দু’জনে হয়ে উঠেছিলেন পরস্পরের পরিপূরক নিবিড় একক সত্ত্বা।

আমাদের এই জেঠীমার এক সন্তান। নাম আলতাফুর রহমান ফকির। আমার পিতার প্রায় সমবয়সী। আলতাফুর রহমানকে জন্ম দেবার পরেই তার স্বামী পরলোক গমন করেন। কাজেই বিয়ের পর থেকেই তার নিভৃত-নিঃসঙ্গ জীবন। পুত্র আলতাফুর রহমানকে কেন্দ্র করেই তার জীবন আবর্তিত। ছেলে কৈশোর অতিক্রম করতে না করতেই তাকে বিয়ে করিয়ে এনেছিলেন যমুনা তীরের কয়লাকান্দি গ্রাম থেকে। বছর না ঘুরতেই ছেলের ঘরে জন্ম নিয়েছিল নতুন শিশু। এই শিশুই বেদেনা। আলতাফুর রহমান বা তার স্ত্রীর চেয়ে আমাদের জেঠীমার আনন্দই হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু মোহরমের চাঁদের অপর পৃষ্ঠে যে সাহারার শোকের লু হাওয়া বইছিল তা তাদের দৃষ্টির অলক্ষ্যেই রয়ে গিয়েছিল। বেদেনার জন্মের কয়েকদিন পর সবার মুখ বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল যখন সবাই খেয়াল করেছিল যে, নবাগত মেয়ে শিশুটির একটা পা সম্পূর্ণ উল্টোদিকে ঘুরে আছে। কোন ধরনের তাবিজ কবজেই সেই মেয়ের পা আর সোজা করা সম্ভব হয়নি।

বেদেনা নামটিও রেখেছিলেন আমাদের সেই জেঠিমা। আমাদের এলাকায় ডালিম ফলের আরেক নাম। এই নাম ডালিম ফলের ভেতরের রক্ত লাল কোয়াগুলোর মতো তার ভবিষ্যৎ জীবনের বেদনাকেই প্রতিবিম্বিত করবে। কিছুদিন পর সবাই পুনরায় সবিস্ময়ে খেয়াল করল যে মেয়েটার মুখে সারাক্ষন মৃদু হাসি লেগে থাকলেও সে কোন কথা বলছে না। অদ্ভুত সব গোঁগোঁ শব্দ করে। অর্থাৎ সে বোবা!

একে তো মেয়ে। তার ওপর খোঁড়া আর বোবা । ফলে অনাদর আর অবহেলার মধ্যে শুরু হলো বেদেনার জীবন। নিজের মা’ পর্যন্ত তাকে কোলে নেয় না বা বুকের দুধ দেয় না ঠিকমতো। মেয়েটার ভার নিলেন তার দাদী অর্থাৎ আমাদের সেই জেঠীমা। হয়তোবা সবার অলক্ষ্যেই দুটো জীবন এক সুত্রে গ্রথিত হয়ে গেল।

আমি বড় হতে হতে দেখেছি যে, বেদেনার আমাদের ভাইবোনদের প্রতি খুব টান। আমরা তার পাশে দিয়ে অতিক্রম করার সময়ে তার আলোকিত মুখ উজ্জ্বল হয়ে যায়। যেন কোন দেবশিশুর মুখমণ্ডল হতে স্বর্গীয় আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে! আমরা ভাই বোনরা সম্পর্কে তার চেয়ে এক জেনারেশন নীচের। বেদেনার বয়স আমার চেয়ে দুই তিন বছর কম হবে। সম্পর্কে সে আমার ফুপু হলেও আমি তাকে নাম ধরেই ডাকি। কারণ সে বড় হচ্ছে না। অথচ তার দুই বোন এবং এক ভাই স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠছে। সবাই স্কুলে যায়। বেদেনা এতেই ভীষণ খুশি। যদিও সে কথা বলতে পারে না, তবুও তার সারাক্ষণ হাসি আর মুখ ভঙ্গী থেকেই প্রস্ফুটিত যে সে ভীষণ খুশি।

১৯৭৭ সন। আমি ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ক্যাডেট কলেজে চলে যাচ্ছি। এলাকার সব লোকজনই জানে। জানে না শুধু বেদেনা আর তার দাদী। পুরো সংসারে এই দুইজন এতোটাই অপ্রয়োজনীয় যে তাদেরকে কেউ জানানোর প্রয়োজনই বোধ করেনি। আমিও না। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাত্রা শুরু করার আগে আমি ভাবলাম জেঠীমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি। এসময়েই হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে জেঠীমা আর বেদেনা আমাদের ঘরে ঢুকল। বেদেনার হাতে একটা বাংগি ফল। কেটে গুড় দিয়ে নিয়ে এসেছে। জেঠীমা একটা চীনামাটির পিরিচে করে বাংগিটা আমাকে খেতে দিতেই দেখি বেদেনা মৃদু হাসছে।

আমাদের বাড়ির উঠোনেই বেদেনা আর তার দাদী মিলে একটা ফলের বাগান করেছে। তাতে কামরাঙ্গা, ডালিম, বাংগি সবই ধরে। বাড়ির শিশুরা কেউ ফল বাগানে ঢুকতে গেলেই বেদেনা গোঙানির মতন চিৎকার করে ওঠে। ফলে শিশুরা কেউই সেই বাগানের কাছে ভিড়তে সাহস পায় না।

আমি ক্যাডেট কলেজে ক্লাস নাইনে পড়ি। টার্ম এন্ডের ছুটিতে বাড়িতে এসেছি। আলতাফুর দাদাদের ঘরের পেছনে প্রকাণ্ড আম গাছের নীচে আমাদের বংশের গোরস্থানে দুইটা নতুন কবর। পাশাপাশি। শুনলাম আমাদের জেঠীমা মারা গেছেন। তার মৃত্যুর কয়েকদিন পর মৃত্যুবরণ করেছে বেদেনাও।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম