বিজয়ের রঙ

বিজয়ের রঙ

প্রকাশিত: ১১:১১ ১৬ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ১১:১৪ ১৬ ডিসেম্বর ২০২১

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ। ১৯৬৫ সালে জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশুনা করেছেন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রয়াল রোডস ইউনিভার্সিটি (বিসি), ক্যানাডা এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে। অধ্যয়ন বিভিন্ন বিষয়ে। সামরিক বাহিনীতে চাকরি করে মেজর পদবীতে অবসর গ্রহণ করেন। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘অন্য জীবন’ এবং অনুবাদ গ্রন্থ ‘মুরাকামির ছোটগল্প সংকলন।

‘We don’t need to win military victories, we only need to hit them until they give up and get out.’ - Ho Chi Minh 

শরতকালে আমাদের বাড়ির উঠোন থেকে উত্তরে তাকালে দূরে দিগন্তের পেছনে একটা পাহাড়ের রিজলাইন দেখা যায়। নীলের চেয়েও ঘন নীল রঙের। পাহাড়ের নাম গারো পাহাড়। এই পাহাড় পেরিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। শিশু হিসেবে বাস্তব পৃথিবীতে এটাই ছিল আমার প্রথম দেখা সবচেয়ে বিষ্ময়কর দৃশ্য। ঝাড়কাটা নদী, ঝিনাই নদী এবং ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে তেপান্তরের ওপারে এই পাহাড়কে আমার কাছে মনে হতো অন্য কোনো পৃথিবীর অংশ!

গারো পাহাড়ের কাছে ধানুয়া কামালপুর। জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। ১৯৭১ সালে এখানে পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ও প্রতিরক্ষা অবস্থান ছিল। এর বিপরীত দিকে ভারত সীমান্তের ভেতর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল এই প্রতিরক্ষা অবস্থানের উপরে আক্রমণ করছিল। হিট এন্ড রান পদ্ধতি অনুসরণ করে। এরা ছিল ১১ নং সেক্টরের অধীনে। এই সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল মহেন্দ্রগঞ্জে। 

উল্লেখ্য, এই অঞ্চলে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর ৩ হাজার এবং গণবাহিনীর ১৯ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিল। ১৯৭১ সালের জুলাই মাস থেকে ২৮ নভেম্বর সময়কালে  মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকবাহিনীর ১০ বার সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধগুলোতে সর্বমোট ১৯৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ৪৯৪ জন পাকসেনা নিহত হয়। 

এই লেখার তথ্যমালা আমি সংগ্রহ করেছি বিভিন্ন উৎস থেকে। কনিষ্ঠ অফিসার হিসেবে চাকুরীকালে সামরিক ইতিহাস অধ্যয়নের অংশ হিসেবে। সেনাবাহিনীর সিনিয়রদের কাছ থেকে। এমনকি যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকেও।

১৯৭১ সালের ৩১ জুলাই তারিখে মুক্তিযোদ্ধারা কামালপুরের পাকিস্তানী প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপরে আক্রমণ পরিচালনা করে। এই আক্রমণ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম কনভেনশনাল যুদ্ধ। সাধারণ নিয়ম হিসেবে নিয়মিত বাহিনীর সদস্যেরাই শুধুমাত্র এই ধরণের অপারেশন পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু এই যুদ্ধে মাত্র ৪ সপ্তাহের বেসিক ট্রেনিং সম্পন্ন করা  সিংহ ভাগ (৮০%) তরুণ  মুক্তিযোদ্ধারা অংশ গ্রহণ করেছিল। কয়েকজন অকুতোভয় সামরিক অফিসারের নেতৃত্বে। এই আক্রমণের মাধ্যমে বাঙালী মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণের বিনিময়ে প্রমাণ করেছিল যে, দেশের স্বাধীনতার জন্যে অকাতরে তারা প্রাণ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত।

কামালপুরে পাকসেনাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানের দায়িত্বে ছিলো ৩০ বালুচ রেজিমেন্টের একটা কোম্পানী। অবস্থানটি তৈরি করা হয়েছিলো শক্ত কংক্রিট দিয়ে। চারপাশে কাটা তারের বেড়া, মাইনফিল্ড এবং পাঞ্জি বিছানো হয়েছিল। প্রতিরক্ষা অবস্থানের সামনের সকল গাছপালা কেটে পরিষ্কার করে ফিল্ড অফ ফায়ার (Field of Fire) ক্লিয়ার করা হয়েছিল। এ ছাড়াও ফিল্ড গান ও ৮১ মিঃমিঃ মর্টারের ফায়ার দিয়ে অবস্থানটি সুরক্ষিত করা হয়েছিলো। 

মুক্তিযোদ্ধাদের ১ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের দুইটি কোম্পানীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো এই অবস্থানটি দখল করার। ব্রাভো ও ডেলটা কোম্পানী। ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ক্যাপ্টেন সালাহ উদ্দিন ছিলেন কোম্পানী  অধিনায়ক। আক্রমণের পূর্ব-প্রস্তুতি হিসেবে তারা এক রাতে পাকিস্তানীদের প্রতিরক্ষা অবস্থান রেকি করতে গেলে ক্যাপ্টেন সালাহ উদ্দিনকে পাকিস্তানী প্রতিরক্ষা অবস্থানের প্রহরী চ্যালেঞ্জ করে বসে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে তিনি প্রহরীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুরু হয় দুজনের মধ্যে মল্ল যুদ্ধ। পাক-প্রহরী পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে ডেলটা  কোম্পানীর সুবেদার আব্দুল হাই তাকে গুলি করে নিহত করেন। এই গোলাগুলিতে আরো একজন  পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হয়। রেকি দল তাদের কাছ থেকে দুটো জি-৩ রাইফেল হস্তগত করে।কিন্তু এর ফলে পাকিস্তানী প্রতিরক্ষা অবস্থান সতর্ক হয়ে যায়। প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপরে বড় ধরণের আক্রমণ হতে পারে ভেবে তারা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতা বাড়িয়ে দেয়। প্রতিরক্ষা অবস্থানকে দুর্ভেদ্য করে তোলে। ফলে রেকির মাত্র ৩দিন পর ৩১ জুলাই ১৯৭১ তারিখ রাতে মুক্তিবাহিনী আক্রমণ পরিচালনা করার সময়ে পাকিস্তানী প্রতিরক্ষা অবস্থানের সমন্বিত ফায়ারের মুখে পড়ে। প্রচুর হতাহত হয়। ক্যাপ্টেন সালাহ উদ্দিন সহ ৩০ জন তরুন মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত বরণ করেন।ক্যাপ্টেন হাফিজ ও লেফটেন্যান্ট মান্নান সহ ৬৬ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।   তারপরেও তারা মাইনফিল্ড, পাঞ্জি ও কাঁটা তারের বেড়া অতিক্রম করে প্রতিরক্ষা অবস্থানে পৌঁছে দুটো বাংকার দখল করতে সমর্থ হয়েছিলেন। 

১৯৭১ সনের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। আমাদের বাড়ির ওপর দিয়ে ভারতীয় বোমারু বিমান উড়ে যাচ্ছিল। ঘাস ফড়িঙের মতো দেখতে। জোড়ায় জোড়ায় উড়ছিল। উত্তর থেকে দক্ষিণে। কিছুক্ষণ পর পর মেঘের গর্জনের মতো বোমা বর্ষণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।  আসলে এটি ছিল কামালপুরের উপরে মিত্র বাহিনীর আক্রমন। 

মুক্তিযোদ্ধাদের উপর্যুপরি আক্রমণ-প্রতি-আক্রমণে ভুগতে ভুগতে দুর্বল হয়ে যাওয়া পাকিস্তানী প্রতিরক্ষা অবস্থানের উপরে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় আর্টিলারি এবং সাঁজোয়া সহায়তা নিয়ে ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণ।  ১০ দিনব্যাপী যুদ্ধের পর ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অবরুদ্ধ ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের গ্যারিসন কমান্ডার আহসান মালিক খান ১৬২ জন হানাদার সদস্যসহ প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে সাদা পতাকা উড়িয়ে বেরিয়ে আসে। মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। বাংলার মাটিতে পাকিস্তানী নিয়মিত বাহিনীর এটাই ছিল প্রথম আত্মসমর্পণ।

এরপর থেকেই বাঙালিদের  জয়যাত্রা ছড়িয়ে পড়তে লাগল দিগদিগন্তে। ৬ ডিসেম্বর তারিখে মুক্ত হলো দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও শেরপুর। ১০ ডিসেম্বর মুক্ত হলো জামালপুর। চারপাশ ক্রমশ প্রকম্পিত হয়ে উঠতে  লাগল হাজার হাজার মানুষের 'জয় বাংলা' স্লোগানে।  অপারেশন লাইটনিং ক্যাম্পেইন (The Lightning Campaign) নামের মাত্র ১২ দিনের যুদ্ধে মিত্রবাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত এগিয়ে আসলো ঢাকার দিকে। দেশের চারদিক থেকে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জার্মানদের Blitzkrieg অপারেশনের মতো। 

১১ ডিসেম্বর ১৯৭১। ঢাকার অদূরে শ্রীপুর। কাদের বাহিনীর সহায়তায় মিত্রবাহিনীর বিমান থেকে সাত শতাধিক প্যারাট্রুপার অবতরণ করল টাঙ্গাইলের মাটিতে। উদ্বেলিত জনতা তাদের স্বাগত জানাল। নিজ থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তারা  বয়ে নিয়ে গেল  গোলাবারুদ ও জিনিসপত্র।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। বিকেলে রমনার রেসকোর্স ময়দান লোকে লোকারণ্য। তিন ঘটিকায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। ৯ মাসের যুদ্ধের সমাপ্তি। পশ্চিম আকাশে জ্বলজ্বল করছে সূর্য। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত আর অযুত মা বোনের শ্লীলতাহানির বিনিময়ে আকাশ উজ্জ্বল করে আছে বিজয়ের সূর্য। রক্তের চেয়েও লাল!

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ