শ্রীলংকার বিপক্ষে দু-হাত ভরে নিতে পারেনি টাইগাররা

শ্রীলংকার বিপক্ষে দু-হাত ভরে নিতে পারেনি টাইগাররা

জামিলুর রহমান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১০:২৩ ৩১ মে ২০২১  

সিরিজ জয় করার পর প্রতিটি দলের আয়েশী ভাব আসতেই পারে, তবে সেই আয়েশী ভাব পেছনে ঠেলে যখন কোন দল লক্ষ অনুযায়ী সিরিজ শেষ করতে পারবে ঠিক তখনই হয়তো আমরা বলতে পারবো যে, দল অনেক পরিনত! শ্রীলংকা সিরিজ শুরুর আগে শ্রীলংকা দলের দিকে তাকিয়ে আমি অনুমান করেছিলাম ৩-০ তে বাংলাদেশের সিরিজ জেতা উচিত, তার কারণ হলো অভিজ্ঞতা, সিনিয়রিটি ও হোম কন্ডিশনের সুবিধা বাংলাদেশের পক্ষে।

প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটিংটা আশানুরুপ না হলেও অভিজ্ঞতার কাছেই পরাজিত হয়েছে শ্রীলংকার তরুণ দলটি। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে আমরা কি দেখলাম, আমাাদের ব্যাটিংটা যে আশানুরুপ হচ্ছেনা তা আবারও প্রমাণ হলো। শুধু মুশফিকের উপর ভর করেই দুটি ম্যাচ জিতলো বাংলাদেশ। ৩য় ম্যাচে মুশফিক ব্যর্থ তো দল পরাজিত। তৃতীয় ওয়ানডেতে নাইম শেখ অনুমিতই ছিল লিটনের অধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে। কারণ তরুন এই ওপেনারের সুযোগ প্রাপ্যই ছিল কিন্তু এক ম্যাচ যে নিজেকে চেনাতে যথেষ্ঠ নয় তা নাঈম শেখ প্রমানও করলেন। 

যার কারণে নড়বড়ে ওপেনিং নিয়েও মিডল অর্ডারে মুশফিকের দৃঢ়তায় সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ, যার প্রতিদান তিনি পেয়েছেন আইসিসির ৭৩৯ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে ব্যাটিং তালিকার ১৪ নম্বরে উঠে এসে। ওপেনিং এ প্রথম ম্যাচে তামিমের ৫২ ছাড়া তিন ম্যাচে বলার মত কোন স্কোর নেই। 

অন্যদিকে ব্যাটিং এর গুরুত্বপূর্ণ তিন নম্বর পজিশনে ১৫, ০ এবং ৪ স্কোরই বলে দিচ্ছে সাকিবের দৈন্যদশা, তিনি যে ভাবে আউট হয়েছেন তাতে করে বিশ্বকাপের সাকিব আর বর্তমান সাকিবের ফিটনেসের মধ্যে অনেক পার্থক্য, তাই সাকিবের উচিত ৩ নম্বর জায়গা ছেড়ে ৫ বা ৬ নম্বরে ব্যাট করা এবং ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে যখন ফিটনেস ফিরে পাবে তখন আবার আগের জায়গায় ফিরে আসা, তাছাড়া এটাও মনে রাখা দরকার যে, সাকিবের বয়স বেড়েছে, তিনি যদি ফর্ম ফিরেও পান সেক্ষেত্রে আগের মত শতভাগ নাও পেতে পারেন, তাই সিনিয়র সেরা ৪ খেলায়াড়ের রিপ্লেসমেন্ট কতটুকু হয়েছে তা আবারো ভাবাচ্ছে। 

তবে আনসাং হিরো মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বরাবরই লাইম লাইটের আড়ালে চলে যান ভাল পারফর্ম করেও এই সিরিজেই দেখুন মুশফিকের সঙ্গে বড় জুটি গড়তে সহায়তা করেছেন প্রথম দুই ম্যাচে ৫৪ ও ৪১ রান করে আর শেষ ম্যাচে তো লড়াকু ৫৩ রান তাঁর ব্যার্টিং অর্ডারটার ৫ নম্বরে হওয়া উচিত বলে ভাবাচ্ছে ক্রিকেট মহলকে।

মোসাদ্দেককে আমি পাস মার্কই দেবো কারণ দুটি ম্যাচে সুযোগ পেয়ে ১০ ও ৫১ রান করে প্রমান করেছেন তার জায়গায় তিনি ঠিকই আছেন। আবার মিঠুন তার জায়গায় ফ্লপ তবে একটা ম্যাচে ব্যার্থ হলে সরিয়ে দেয়াও ঠিক নয় নিউজিল্যান্ড সফরে মিঠুনই তুলনামুলক ভালো ব্যাট করেছিলেন কিন্তু সেই রিদম প্রথম ম্যাচে দেখাতে পারেননি। 

তবে মেহেদী হাসানের সঙ্গে লড়াই করে ৩ ম্যাচেই সুযোগ পাওয়া আফিফের স্কোর ২৭, ১০, ১৬ ভালো না হলেও একেবারে মন্দ নয় তাই এখন তার বোলিং টা আমাদের পরখ করার পালা। সিমিং অলরাউন্ডার সাইফুউদ্দিন প্রথম ম্যাচে ১৩ রানে অপরাজিত ও ১০ ওভারে ৪৯ রানে ২ উইকেট পাস মার্ক সহজেই উতরে গেছেন। 

গত শ্রীলংকা সফরে তাসকিন অসাধারন বোলিং করেছিলেন তাই প্রথম ম্যাচে অটোমেটিক্যালি চয়েস, কিন্তু ভাল না করতে পারায় দ্বিতীয় ম্যাচে বাদ দেয়াটা মোটেও ভাল ছিলনা না তা তিনি সাইফুদ্দিনের ‘কনকাশন সাব’ হয়ে প্রমান করেছেন। আর শেষ ম্যচে তো ৪ উইকেট নিয়ে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন নির্বাচকরাও ভূল করতে পারেন, অথচ তাসকিনকে শেষ ম্যাচে পুরো ১০ ওভার ব্যবহারই করলো না তামিম, করলে হয়তো ৫ উইকেট ও পেয়ে যেতে পারতেন। তাই অধিনায়ক হিসেবে তামিমকে আরো সজাগ থাকতে হবে পার্টটাইম ও ফুল টাইম বোলারদের ব্যবহারে। 

আর মেহেদী হাসান মিরাজকে আমরা অলরাউন্ডার হিসেবে ধরলেও আমার মনে হয় বিশেষজ্ঞ স্পিনার হিসেবেই তাকে দেখা উচিত কারণ বোলিং অল-রাউন্ডার হিসেব দলে জায়গা পেলেও ব্যাটিংটা যেন তিনি ভুলেই গেছেন। তবে সিরিজ জয়েয় ক্ষেত্রে তিনি প্রথম ম্যাচে ৪ এবং ২য় ম্যাচে ৩ টি উইকেট নিয়ে প্রথম বারের মত ৭২৫ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে আইসিসির বোলিং তালিকার ২য় স্থানে উঠে এসেছেন। 

শরিফুলকে নিয়ে এখনই বেশী কিছু বলতে চাইনা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী দলের এই সদস্যকে নিয়ে তবে এটুকু বলবো অভিষেক ও পরের ম্যাচে একটি করে ২টি উইকেট নিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে অনেক খানি মানিয়ে নিয়েছেন সামনে ভালো করার অফুরন্ত সময়। 

সত্যি বলতে এই সিরিজে সবারই যেন একটু বাড়তি নজর ছিল শ্রীলংকা সফরে না খেলে আইপিএল খেলা সাকিব ও মুস্তাফিজের দিকে, এক্ষেত্রে সাকিব পুরোপুরি ব্যর্থ হলেও মুস্তাফিজকে আমি ১০-এ ৮ দেব, কারণ তিনি পারফর্ম্যান্স দিয়েই তা প্রমান করেছেন প্রথম ও দ্বিতীয় ম্যাচে ৩টি করে মোট ৬টি উইকেট নিয়েছেন তবে শেষ ম্যাচে উইকেট না পেলেও ১০ ওভারে ৪৭ রান দিয়ে ইকোনোমি টা ধরে রেখেছেন। 

তাই প্রাপ্তির জায়গা থেকে বললে এই সিরিজ আমাদের জন্য দু-হাত ভরে নেয়ার একটা সুযোগ থাকলেও আমরা তার পুরোটা নিতে পারিনি। তার পর ও অনেক প্রাপ্তির মধ্যে একটা হল ২০ পয়েন্ট অর্জন যা বাংলাদেশকে সরাসরি বিশ্বকাপ খেলার পথে এগিয়ে রাখবে, কারণ বাছাই পর্ব এড়িয়ে বিশ্বকাপ খেলতে হলে বাংলাদেশের ১০০ পয়েন্ট অর্জন করা জরুরী। বাংলাদেশের যেহেতু আগের ৩০ পয়েন্ট ছিল সিরিজ শুরুর আগে তাই এই সিরিজ থেকে পুর্ণ ৩০ পয়েন্ট অর্জন হলে ৬০ পয়েন্ট নিয়ে এগিয়ে থাকতো। এখন ১০ পয়েন্ট কম হয়ে যেটা হয়েছে ৫০ পেয়েন্ট, কারণ একদিকে যেমন ঘরের মাঠে খেলা তেমনী অন্যদিকে প্রতিপক্ষ তারুন্য নির্ভর শ্রীলংকা আবার বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার ক্ষেত্রে এই শ্রীলংকা ও উইন্ডিজ-ই আমাদের মূল প্রতিপক্ষ হবে কারণ আইসিসির র‌্যাংকিং-এ এই দুটি দেশ-ই আমাদের আশে পাশে থাকে তাই তাদের কে ঘরের মাঠে পেয়ে পুর্ণ পয়েন্ট না পাওয়াটা আমাদের জন্য ব্যর্থতা। 

২০২৩ বিশ্বকাপে মোট ৮টি দল সরাসরি খেলবে যার মধ্যে ৭টি দল সুপার লিগ থেকে আর ভারত স্বাগতিক দেশ হিসেবে সরাসরি। তাহলে অংক টা হলো এমন; ৭টি দল আইসিসি সুপার লিগ থেকে প্রাপ্ত পয়েন্টের ভিত্তিতে আর ভারত স্বাগতিক হিসেবে সরাসরি খেলবে, বাকি দলগুলোকে বাছাই পর্ব খেলে আসতে হবে। 

এখন বাংলাদেশ যদি সুপার লিগের পয়েন্ট নিয়ে ৭ দলের মধ্যে থাকতে না পারে তাহলে বাছাই পর্ব খেলেই বিশ্বকাপে খেলতে হবে। এই সমীকরণ নিয়েই মূলতঃ বাংলাদেশ ঘরের মাঠে শ্রীলংকার মুখোমুখি হয়েছিল। তারপরও শ্রীলংকার বিপক্ষে প্রথম দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ জয় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য অনেক পজিটিভ। সামনে বাংলাদশেকে অষ্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান, ভারত পাকিস্তান ও জিম্বাবুয়ের মত দলকে মোকাবেলা করতে হবে হোম এন্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতিতে। 

তাই এই সিরিজে পুর্ণ পয়েন্ট পেলে রএ্যাডভান্টেজ নিয়ে আমরা পরের সিরিজে খেলতে পারতাম তুলনামুলক মানসিক প্রশান্তি নিয়ে। তারপরও শুভ কামনা বাংলাদেশ দলের জন্য অন্তত্ব দ্বীপ রাষ্ট্রের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের গেরোটা খোলা গেছে!

 

লেখক: জামিলুর রহমান

ক্রীড়াভাষ্যকার, বাংলাদেশ বেতার।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএস