ধর্ষণের সেঞ্চুরি! একটি গুজবের আত্মকাহিনী

ধর্ষণের সেঞ্চুরি! একটি গুজবের আত্মকাহিনী

আশরাফুল আলম খোকন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:১৪ ১০ অক্টোবর ২০২০  

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণের সেঞ্চুরির কল্পকাহিনী নিয়ে ফেসবুকে একটি লেখায় স্পষ্ট করেই বলেছি ছাত্রলীগকে কলংকিত করতে ১৯৯৮/৯৯ সালে যে নাটক মঞ্চস্থ করেছিল তখনকার বামপন্থী শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনগুলো, তা ছিল পরিকল্পিত একটি ঘটনা। আমি আবারো বলছি; ওই ঘটনা ছিল পরিকল্পিত। 

আর এই গুজবের নায়ক তারাই ছিলো, যাদের পূর্ব পুরুষরা বলেছিলো ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে দুই কুকুরের লড়াই।’  যাদের বিরুদ্ধে এই গুজবের স্রষ্টা হিসেবে আমি অভিযোগ করেছি তারা একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, আমি নাকি মিথ্যা বলেছি। কিন্তু কোথায় কোনটা মিথ্যা বলেছি তা উল্লেখ করেননি তারা। যাক সে কথা। ওনারা বলবেনই, কারণ অনেকদিন পরে হলেও তাদের সাজানো নাটক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।

তারা এটাও বলেছেন যে, হয়তো আবার ২০ বছর পর লিখবো যে বেগমগঞ্জ ও এমসি কলেজে কিছু ঘটে নাই। ওনাদের মেধার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে, কারণ ওনারা শিক্ষক কিন্তু ওনাদের মানসিকতার প্রতি ওই শ্রদ্ধাটুকু রাখতে পারি না। তাও বেশি কিছু বললাম না। শুধু এইটুকু বলি - বেগমগঞ্জ, এমসি কলেজে ধর্ষণের শিকার ও ধর্ষণকারীদের সুনির্দিষ্ট নাম পরিচয় এবং অভিযোগ আছে। 

জাহাঙ্গীরনগরে মানিকের বিরুদ্ধে কার অভিযোগ ছিল? একটা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কথা বলেনতো? আপনারা বেগমগঞ্জ ও এমসি কলেজের উদাহরণ দিয়েছেন কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী, যে নাম পরিচয় দিয়ে ধর্ষণের মামলা করেছে সেটার উদাহরণ দিতে লজ্জা পেলেন কেন? ওই ধর্ষক নুরু গং’রা আপনাদের পালিত মানসপুত্র বলে? আর এই জন্যই মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি। 

আপনারা ওই সময়কার পত্রিকার নিউজ দেখার কথা বলেছেন। হ্যা, নিউজ সবই দেখেছি, সবই পড়েছি। সব নিউজই ছিল আপনাদের বক্তৃতাবাজি আর মিছিল মিটিংয়ের নিউজ। কোনো ধর্ষিতার অভিযোগের নিউজ ছিল না। কিছু বেনামি অভিযোগ জমা হয়েছিল যা আপনাদের গং’রা লিখে জমা দিয়েছিল। 

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা করেছি। অনেক কিছুই দেখেছি। ওই ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এনেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও অচল করে দেয়ার জন্য ডাকসু ভবনে তারা মিটিংও করেছে। রাতের বেলা তাদের গোপন মিটিং করতেও দেখেছি। দেশের কোন পত্রিকার কোন সাংবাদিককে এই আন্দোলন জমানোর জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল এর সবই নিজ চোখে দেখা। আমরা অধিকাংশ সাংবাদিকরা আগেই জেনে গিয়েছিলাম বলে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন সফল হতে পারেনি। ২/১ টা বাদে মিডিয়ার সমর্থনও পায়নি। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগরের মিডিয়ার ব্যাক্তিরা শুধু তা সমর্থন করেনি, অনেক ক্ষেত্রে তারা তা তৈরি করেছিল।

জাহাঙ্গীরনগরের সাংবাদিক সমিতির তৎকালীন সভাপতি (এখন বিসিএস ক্যাডার) এবং তার তৎকালীন প্রেমিকা (ওই আন্দোলনের নেত্রী, এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) সাংবাদিক সমিতির অফিসে বসে মনের মাধুরী মিশিয়ে ধর্ষণের আন্দোলনের রিপোর্ট লিখতেন এবং সেই রিপোর্টগুলোই বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠানো হতো।

তখনকার একজন বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানিয়েছেন, তাদেরকে ওই রিপোর্ট পত্রিকায় পাঠাতে বাধ্য করা হতো। নতুবা সাংবাদিক সমিতির সদস্যপদ দেয়া হবে না বলেও হুমকি দিতেন। 

ওই সময়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনের একটি ধর্ষণের ঘটনাকে ছাত্রলীগের উপর টেনে এনে কলংকিত করা হয়েছিল। আর ছাত্রলীগের স্বঘোষিত সাধারণ সম্পাদক হয়ে ছাত্রদল থেকে অনুপ্রবেশকারী মানিক ওই সময়ে একটি জমকালো পার্টি দিয়েছিলো। সে পার্টিকে টাইমিং করে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উৎসব বানিয়েছিলেন আপনারা, ছাত্রলীগকে কলংকিত করতে।

ছাত্র ইউনিয়নে আমার অনেক বড় ভাই বন্ধু এবং ছোট ভাইও আছে। মধুর ক্যান্টিন টিএসসিতে একসঙ্গে আড্ডাও দিতাম। ছাত্রলীগ করলেও তারা যখন একটা চাঁদার রশিদ ধরিয়ে দিতো তাও দিতাম। তা শুধুই সম্পর্ক ও ভালোবাসার কারণে। 
আমার আগের লেখাটি নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর শাখা ছাত্র ইউনিয়নও একটি বিবৃতি দিয়েছে। অনেক বড় বিবৃতি। এক জায়গায় তারা বলেছে, আমি নাকি ওই সময়ের সেই পবিত্র আন্দোলনকে বিতর্কিত করেছি। তাই নাকি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত। 

কিন্তু আপনারা যে ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া একটি ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠনকে বার বার কলংকিত করার চেষ্টা করেন তখন আপনাদের বিবেকে বাধে না? ওই আন্দোলনের নেপথ্যের কাহিনী জনসম্মুখে বলে দেয়ার জন্য আমার যদি ক্ষমা চাইতে হয় তাহলে এই অপরাধে আপনাদের মতো আরো যারা ষড়যন্ত্রকারী আছে তাদের কি করা উচিত? 

যখন আপনাদের সংগঠনের কোন নেত্রী দলের নেতা দ্বারা ধর্ষিত হয়ে বিচার চেয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে অনশন করেছিল তখন আপনাদের বিবেক কোথায় ছিল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী যখন নুরু গংদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করে অসহায়ের মতো ঘুরেছে তখন আপনাদের বিবেক কোথায় বন্ধক রেখেছিলেন?

আপনাদের সংগঠনের নেতা যখন জামাত নেতার মুখে বক্তৃতার সময় মাইক্রোফোনে ধরে রাখে তখনতো মনে হয় আপনারা জামাতের এজেন্ট হয়ে ছাত্র ইউনিয়নের মতো প্রগতিশীল সংগঠনে ঢুকেছেন।

যাই হোক ওই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের একজন পরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীনও হয়েছিল। যারা সবসময় শিক্ষাকে পণ্য করা চলবে না বলে শ্লোগান দিতো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার খরচ কত তা সবাই জানি। এই লেখায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন টেনে এনেছি তা পরের আরেকটি লেখায় হয়তো লিখবো।

লেখক: উপ-প্রেস সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ