সন্তানের পরীক্ষার ফল মানবিক দৃষ্টিতে দেখুন

সন্তানের পরীক্ষার ফল মানবিক দৃষ্টিতে দেখুন

প্রকাশিত: ১৭:২৪ ২ জুন ২০২০   আপডেট: ১৭:২৪ ২ জুন ২০২০

আফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিভি`তে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

এমএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। করোনার দিনে ফল প্রকাশকে ঘিরে কিছুটা আনন্দের ঢেউ ওঠে ফেসবুকে। যাদের ছেলে-মেয়ে ভালো রেজাল্ট করেছে, ছেলে বা মেয়েসহ বাবা মায়ের তাদের খুশি উপচে পড়া ছবি আমরা পেয়েছি। কেউ কেউ টেলিফোনে আনন্দ সংবাদ জানিয়েছেন। অন্যবারের চেয়ে এবারের চিত্র আলাদা। অন্যবার ফল প্রকাশ হলে স্কুল ঘিরে ছেলেমেয়েদের উল্লাসের চিত্র আর ভিচিহ্নে ভরে ওঠে খবরের কাগজের প্রথম পাতা। পুরো প্রথম পাতা জুড়েই সেদিন পরীক্ষার ফলাফল। খবরের কাগজগুলো সেদিন ছাত্র-ছাত্রীদের দখলে। 

এখন বেশিরভাগ বাড়িতে পত্রিকা আসে না। কোনো কাগজ বা চিঠিপত্র এলে তিন চারদিন ফেলে রেখে তবে মানুষ ধরে। এমনকি টাকাও। তাই এবারের কাগজের পাতায় পাতায় কী আছে তা আমরা জানি না। তরে ধারণা করি ছাত্র ছাত্রীদের ফলাফলের খবরই আছে। 

এসএসসি ছাত্র- ছাত্রীর জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। এখন জেএসসি, পিএসসি কিসব হয়েছে। আমাদের সময় এসব ছিল না। পরীক্ষা বলতে আমরা এসএসসি এইচএসসি বুঝতাম। আমাদের আগে বুঝত ম্যাট্রিক ইন্টারমিডিয়েট। তা যাহোক এই পরীক্ষা ছাত্র ছাত্রীর জীবনের ভিত রচনার একটা বড় অবলম্বন। কিন্তু একমাত্র অবলম্বন নয়। সেকথায় পরে আসছি। 
যাদের ছেলে মেয়েরা গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে তারা মহাখুশি। বাবা মা খুশি, যে পেয়েছে সে খুশি। কিন্তু যারা তা পায়নি তাদের মুখ ভার। অনেকে হয়ত সন্তানের সাথে ভালো করে কথাই বলছেন না। অনেকে সন্তানকে ধমকাচ্ছেন, ‘একটুও পড়াশুনা করোনি, মোবাইল টিপেছ, আর ফেসবুক আড্ডাবাজি। জানতাম এমন হবে। কতবার বলেছি।’ কেউ হয়ত বলছে, ‘তোমার কোন চাহিদাটা পূরণ করিনি বলো। প্রতিটা সাবজেক্টে টিচার রেখে দিয়েছি। যা চেয়েছ তা পেয়েছ। অমুকের মেয়ে যদি পারে তুমি পারো না কেন!’ অন্য সময় তুই করে বলে এখন রাগে তুমি বলছে। এসব গালাগালি শুনে  ছেলে মেয়ে হয়ত কাঁদছে। পরীক্ষার এই আশানুরূপ ফলাফল না হওয়া খুব কম গার্জিয়ানই সহজভাবে নিতে পেরেছে। খুব অল্প লোকই বলতে পেরেছে, ‘একটু খারাপ হয়েছে তাতে কী। ভবিষ্যতে ভালো হবে। ভালো করে পড়াশুনা করো এবার থেকে।’ 

বাড়িতে যখন এই অবস্থা সমাজেও তাই। পাড়া প্রতিবেশি আত্মীয়-স্বজনও বলছে একই কথা। ‘তোমার রেজাল্টটা তো ভালো হলো না। এখন যা কমপিটিশন। এই রেজাল্ট নিয়ে তুমি বোধহয় কোনো ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারবে না।’ এ কথা যখন বাবা মায়ের কানে যাচ্ছে তখন তাদের রাগ দ্বিগুণ হচ্ছে। আত্মীয় স্বজন কারো সন্তানের রেজাল্ট ভালো আর নিজের সন্তানের রেজাল্ট খারাপ হলে তো রক্ষাই নেই। মা কান্না শুরু করেছে, না খেয়ে ঘরে দরোজা দিয়েছে। ছেলে মেয়ের সাথে কথা বলেনি বেশ কদিন। বার বার বলেছেন এই সন্তানের পেছনে ইনভেস্ট করা তাদের ভুল হয়ে গেছে, সন্তানকে ঠিকমতো মানুষ করতে পারেননি তারা। 

এই পরিস্থিতিতে যাকে নিয়ে এত কিছু সে কি করবে। যদি মনোবল বেশি থাকে তাহলে টিকে থাকবে, নাহলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে। এই আত্মহত্যার ঘটনা আমরা এ বছর দেখেছি, দেখি প্রতি বছর। 

কিন্তু কেন, সব ছেলে মেয়েকেই কেন জিপিএ,  গোল্ডেন জিপিএ পেতে হবে। তাহলে ক্লাসে কি কোনো খারাপ ছাত্র থাকবে না, কেউ কম নাম্বার পাবে না। আর কম নাম্বার পেলেই কি সে খারাপ। সে হয়ত লেখাপড়ায় খারাপ খেলায় অসাধারণ। সে হয়ত ভালো আঁকে , ভালো গায়, ভালো নাচে, ভালো অভিনয় করে। তাহলে সেকি খারাপ। একজন ভালো খেলোয়াড় জিপিএ ফাইভ পায় না হয়ত কিন্তু সে পৃথিবী জয় করে। জিপিএ ফাইভ পেয়ে সচিব হয় আর ব্যাক বেঞ্চার টেনে টুনে পাশ করা ছেলেটা হয় মন্ত্রী। অভিনেতা মন্ত্রী হয় এ তো আমাদের চোখে দেখা। তাহলে কোনটা ভালো, তথাকথিত ভালো ছাত্র হওয়া নাকি যেটা ভালো 

পারে সেটাই ভারো করে শেখা?

বর্তমান সময়ের বাবা মায়েরা একটা সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। তারা সব চায়। তারা চায় ছেলে বা মেয়ে জিপিএ ফাইভ পাবে। সে আঁকবে, গাইবে দৌড়াবে, নাচবে। প্রয়ুক্তিতে সে হবে এ ওয়ান অভিনয়ে সেরা। এরা ভুল যায় মানুষের ব্রেনের একটা ক্যাপাসিটি আছে। চাপ দিয়ে সব করানো যায় না। 

আমাদের এই সন্তানেরা পরীক্ষায় খারাপ করার জন্য কেন আত্মহত্যা করবে। জীবনের দাম কি এত ঠুনকো, এত কম। একটা পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়ে নির্ধারিতে হয়ে যাবে সে জীবনে কি করতে পারবে না পারবে। কক্ষণো না। বহু বিখ্যাত মানুষ বার বার ফেল করেছেন। কিন্তু তারা যা করেছেন সবচেয়ে বড় পাশ দেয়া ছাত্ররাও তা করতে পারেনি। প্রথাগত ব্যবহারিক বিদ্যা দিয়ে কোনো মানুষকে পরিমাপ করা যায় না। একজন ছুতার কাঠের কাজে যে নকশা করেন একজন জিপিএ ফাইভ কি তা পারবে?

আমি বলতে চাইছি, পিতা মাতারা সতর্ক হন। নিজেদের ব্যবহার বদলান। সন্তানকে বুঝতে শিখুন। সে কি চায় জানতে চান বন্ধুর মতো। তার ইচ্ছে অনিচ্ছের মূল্য দিন হাতে রাশ রেখে। শাসন করুন, পথ দেখান, নির্দেশনা দিন কিন্তু প্লিজ চাপিয়ে  দেবেন না। ওদের বুঝিয়ে তবে আপনার মতামতে আনতে চেষ্টা করুন। রেজাল্ট খারাপ হলেই বলবেন না, ‘তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। কি করে খাবি জীবনে। তোর জন্য মুখ দেখাতে পারব না।’ বরং কাছে টেনে বলুন, ‘এবার একটু খারাপ করেছ। তোমার আমাদের সবার মন খারাপ হয়েছে। পরের পরীক্ষায় তুমি আমাদের মন দ্বিগুণ ভালো করে দেবে তো? তখন দেখবেন আপনার এই আদরে আপনার সন্তানের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। সে আপনাকে জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘মামণি আব্বু, আমার আরো ভালো করে পড়া উচিত ছিল। তোমরা আমার জন্য কষ্ট পাচ্ছ আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাকে মাফ করে দাও প্লিজ। দেখো পরের পরীক্ষায় আমি খুব ভালো করব।’ 

একবার করে দেখুন ফল পান কিনা। মনে রাখবেন সন্তান কিন্তু একা আপনার নয়। এ সন্তান দেশের। এরাই আমাদের আগামী, আমাদের ভবিষ্যৎ। এদের হাত ধরে এগিয়ে যাবে সমাজ দেশ। শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, মানবিকবোধে সমৃদ্ধ একটা দেশ গড়ে তুলবে আমার আপনার সন্তানরা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর