বিষ্ফোরণ নিরোধক গ্যাস সিলিন্ডার আনলো বেক্সিমকো

বিষ্ফোরণ নিরোধক গ্যাস সিলিন্ডার আনলো বেক্সিমকো

মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৪৬ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

অসচেতনতা, অসর্তকতার ও নিম্নমানের সিলিন্ডার বাজারে ছড়িয়ে পড়ায় দেশে দিন দিন বাড়ছে সিলিন্ডার বিষ্ফোণের হার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও গ্রাহকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে দেশে প্রথম অ্যান্টিব্লাস্ট (বিষ্ফোরণ নিরোধক) গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে এসেছে বেক্সিমকো এলপিজি লিমিটেড।

বেসরকারি এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, সারাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন লোক লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বিষ্ফোরণে মারা গেছেন। এসব দুঘর্টনায় আহত হয়েছেন প্রায় ৮০ জন।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছিলেন, লিকুইড পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত দেশে ৩৮ জন নিহত এবং ৭২ জন আহত হয়েছেন।

দেশে ঘটে যাওয়া সিলিন্ডার গ্যাস বিষ্ফোরণের আলোচিত তথ্যগুলোর মধ্যে চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সায়দাবাদ ইউনিয়নের দুখিয়াবাড়িতে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় নারী-শিশুসহ একই পরিবারের ৭ জন দগ্ধ হন।

গত ৮ জানুয়ারি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের লাউতলী গ্রামে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুজন নিহত হন।

শুধু নোয়াখালি-সিরাজগঞ্জেই নয়, সারাদেশে অহরহ এসব গ্যাস সিলিন্ডার বিষ্ফোরণের ঘটনা থেকে উত্তোরণের জন্য বেক্সিমকোর এই সিলিন্ডারটি এরইমধ্যে বাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শুধু বাড়ির ব্যবহারের ক্ষেত্রেই নয়, বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই সিলিন্ডার সাড়া ফেলেছে।

বিষ্ফোরণ নিরোধক গ্যাস সিলিন্ডার

জানতে চাইলে সিলিন্ডার গ্যাস কোম্পানির ডিলার ফরহাদ বলেন, আমরা বাজারে বসুন্ধরা, বেক্সিমকোসহ বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহ করে থাকি। 

তিনি বলেন, গ্রাহকদের কাছে আগে বসুন্ধরা গ্যাস সিলিন্ডারের বেশি চাহিদা থাকলেও দিন দিন বেক্সিমকো গ্যাস সিলিন্ডারের চাহিদা বেড়েছে। বাইরে থেকে গ্যাসের পরিমাণ দেখা যাওয়ার কারণে এবং বিষ্ফোরণ নিরোধক হওয়ায় এ কোম্পানির গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। 

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, স্মার্ট সিলিন্ডারটি কোনো ধরনের দুর্ঘটনায় বিস্ফোরণ হবে না; যার গ্যারান্টি দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এর ওজন স্টিল সিলিন্ডারের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ফলে সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া যায়।

জানতে চাইলে বেক্সিমকো এলপিজি এর ডেপুটি ম্যানেজার আশিক হাসান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বেক্সিমকোর স্মার্ট সিলিন্ডারটি কম্পোজিট ফাইবার গ্লাসের তৈরি যা আন্তর্জাতিক মানের। এ ধরনের কম্পোজিট ফাইবার গ্লাস উড়োজাহাজ ও স্পোর্টস কার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

তিনি বলেন, স্মার্ট সিলিন্ডারে গ্যাসের লেভেল বাইরে থেকে দেখা যায়। এছাড়া সাধারণ সিলিন্ডারের তুলনায় প্রায় অর্ধেক ওজন এবং মরিচা ধরে না। সবচেয়ে বড় যে সুবিধা তা হলো- এটি শতভাগ বিস্ফোরণ নিরোধক।

বিষ্ফোরণ নিরোধক গ্যাস সিলিন্ডার

আমেরিকা, ফ্রান্স, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত সিলিন্ডার কম্পোজিট গ্লাস ফাইবারের তৈরি। তাই নিরাপত্তা নিয়ে এখানে আর কোনো প্রশ্ন থাকার কথা না বলেও জানান তিনি।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, গ্রাহকদের অসচেতনতা ও অসর্তকতার কারণেই মূলত গ্যাস সিলিন্ডারের বিষ্ফোরণ ঘটে। এ ছাড়াও নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার ও সিলিন্ডারগুলো স্টিলের তৈরি হওয়ায় এসব দুঘর্টনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়।

তারা বলেন, সিলিন্ডারে গ্যাস তরল আকারে প্রবল ঊর্ধ্বমুখী চাপ নিয়ে থাকে। যেকোনো কারণে সেই সিলিন্ডারে আগুন ধরলে সেটি আরো বেশি উত্তপ্ত হয়ে চাপ সঞ্চয় করে ৫ মিনিটের মধ্যেই বোমা আকারে বিষ্ফোরিত হয়। সিলিন্ডারগুলো স্টিলের তৈরি হওয়ায় এর তাপ ও চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে।

ছবি: সংগৃহীত

তারা আরো বলেন, উন্নত বিশ্বে এখন অনেক উন্নত সিলিন্ডারের ব্যবহার হয়ে থাকে। তাদের সিলিন্ডারগুলো কম্পোজিট ফাইবার গ্লাসের তৈরি। ফলে এসব সিলিন্ডারে আগুন ধরলেও বিষ্ফোরণ ঘটে না। দেশের বাজারেও এসব সিলিন্ডার এখন পাওয়া যাচ্ছে। তাই সিলিন্ডার ক্রয়ের সময় ক্রেতাদের সচেতন থাকা জরুরি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের কারণে দিন দিন বাসা বাড়িতে প্রাকৃতিক গ্যাস সেবা পাওয়া জটিল ও কঠিন হয়ে পড়ছে। আবার ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকার কথা থাকলেও রয়েছে কেবল ১৩ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে গ্রামগঞ্জে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে পারলে জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার কমবে এবং বনভূমি রক্ষা পাবে।

তারা বলেন, ২০ বছর আগেও দেশে একটি কোম্পানির বেশি ছিল না। কিন্তু বর্তমানে কোম্পানি রয়েছে প্রায় ৪০টিরও বেশি। পাইপলাইনে আছে আরো ১০ কোম্পানি। গত ১০ বছরে অনেক কোম্পানি এসেছে। মার্কেটে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হয়ে গেছে। অনেকেই নীতিমালা মানছে না। যার ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

ছবি: সংগৃহীত

এদিকে, এসব বিষয়ে সজাগ থাকাসহ কঠোর অবস্থানে এসেছে সরকার। জরিমানা করাসহ তদারকি বাড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট অধিদফতর। যারা আইন মানছেন না তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে। এছাড়া ক্রস ফিলিং বিষয়ে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, এলপি গ্যাস আমাদের দেশের জন্য এখন খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এর কারণ আমাদের নিজস্ব যে গ্যাসের রিজার্ভ রয়েছে সেটি দিন দিন কমছে। ফলে বিকল্প হিসেবে এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভর করতে হবে। আবাসিক ও পরিবহন সেক্টরে এলপি গ্যাসের প্রসার হওয়াটা খুবই দরকার। তবে এখানে সর্তক থাকতে হবে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএএম/টিআরএইচ