ডায়রিয়ায় নাকাল রাজধানীবাসী, এখনো স্বাভাবিক চট্টগ্রাম

ডায়রিয়ায় নাকাল রাজধানীবাসী, এখনো স্বাভাবিক চট্টগ্রাম

মো. রাকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:১৮ ৩১ মার্চ ২০২২   আপডেট: ১৮:১৯ ৩১ মার্চ ২০২২

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়া। যার অন্য নাম উদরাময়। এ রোগে আক্রান্ত রোগীতে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে টইটুম্বর অবস্থা। শয্যা না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটোছুটিও করতে হচ্ছে অনেককে। যদিও সেই পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রামের সরকারি চার হাসপাতালে এক-দুজন করে রোগী ভর্তি হতে শুরু করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত যে হারে রোগী ভর্তি হয়েছেন, তা স্বাভাবিক বিষয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

জানা গেছে, বুধবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ও মেডিসিন বিভাগে মোট রোগী ভর্তি ছিলেন ১৯ জন। এর মধ্যে ১০ জনই শিশু। বাকি ৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক। এছাড়া চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ৪০ জন, ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডিতে চারজন ও জেনারেল হাসপাতালে চারজন ভর্তি ছিলেন।

চিকিৎসকরা জানান, চৈত্রের শুরু থেকেই দাবদাহ চলছে। তীব্র গরমের এ সময়ে ডায়রিয়ার জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ঘটে। ফলে এ সময়টিতে ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা যায় বেশি। এছাড়া গত দুই বছর করোনা পরিস্থিতির কারণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছিল। এখন সংক্রমণ কমে আসায় সেই সচেতনতার প্রবণতাও কমে এসেছে। ধুলোবালিযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলেও ডায়রিয়া রোগ বাড়ছে। তাই এ রোগ থেকে বাঁচতে বিশুদ্ধ পানি খাওয়ার পাশাপাশি বারবার হাত ধোয়া, বাইরের বাসি-খোলা খাবার এড়িয়ে চলার বিকল্প নেই।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুস সাত্তার বলেন, মেডিসিন ওয়ার্ডে ৯ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। দু-একদিন আগেই তারা হাসপাতালে ভর্তি হন। এ সময়ে ডায়রিয়া হওয়াটা স্বাভাবিক। তবু সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

বিআইটিআইডির মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশিদ বলেন, করোনার বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে অসাবধানতা, বাইরের খাবার ও পানীয় গ্রহণে অসতর্কতা বেড়েছে। রাজধানীর ডায়রিয়া পরিস্থিতি যার অন্যতম উদাহরণ। যদিও সেই পরিস্থিতি চট্টগ্রামে এখনো তৈরি হয়নি। বিআইটিআইডিতে চারজন রোগী ভর্তি রয়েছেন। সবসময় দু-চারজন থাকেই। এ নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। তবে এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি উপসর্গ দেখলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

উইকিপিডিয়ার তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রতি বছর এক দশমিক সাত থেকে পাঁচ মিলিয়ন মানুষের ডায়রিয়া হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাধারণত ছোট বাচ্চারা বছরে গড়ে তিনবার ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। শিশু মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ ডায়রিয়া। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই এ রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। এর ফলে যেসব দীর্ঘমেয়াদী সমস্যাগুলো হতে পারে তার মধ্যে শরীর ও মেধার অযথাযথ বিকাশ অন্যতম।

ডায়রিয়া কেন হয়

চিকিৎসকরা বলছেন, পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়ার জন্য মূলত দায়ী কিছু ব্যাকটেরিয়া। গরমের সময় সিগেলা, ই কোলাই, কলেরা (ভিব্রিও কলেরি) ও শীতকালে রোটাভাইরাসের মাধ্যমে ডায়রিয়া ছড়ায়। পানিবাহিত এসব জীবাণু পানি ছাড়াও পচা-বাসি খাবারে জন্মায় ও ছড়ায়। এছাড়া ডায়রিয়ার জীবাণু আছে, এমন পানি দিয়ে তৈরি করা খাবার খেলেও ডায়রিয়া হয়।

ডায়রিয়া হলে করণীয়

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) বলছে, ডায়রিয়া তাৎক্ষণিক ভালো হয় না। নিয়ম মেনে খাবার স্যালাইন ও পথ্য খেলে ডায়রিয়া ধীরে ধীরে ভালো হয়।

কারো ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হলে এক প্যাকেট স্যালাইন আধা লিটার পানিতে গুলিয়ে খেতে হবে। ১০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া হলে প্রতিবার পায়খানার পর এক গ্লাস (২৫০ মি.লি.) খাবার স্যালাইন খেতে হবে।

শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতিবার পায়খানার পর শিশুর যত কেজি ওজন তত চা-চামচ কিংবা যতটুকু পায়খানা হয়েছে আনুমানিক সেই পরিমাণ খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশু বমি করলে তাকে ধীরে ধীরে স্যালাইন খাওয়াতে হবে। যেমন- তিন বা চার মিনিট পর পর এক চা-চামচ করে খাওয়াতে হবে।

তবে শিশুকে কোনো অবস্থাতেই মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা যাবে না। ছয় মাসের বেশি বয়স হলে খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি সব ধরনের স্বাভাবিক খাবার খাওয়ানো যাবে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের দৈনিক একটি করে জিংক ট্যাবলেট পানিতে গুলিয়ে ১০ দিন খাওয়াতে হবে।

খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি বেশি বেশি তরল খাবার যেমন- ডাবের পানি, চিড়ার পানি, স্যুপ ইত্যাদি খাওয়াতে হবে। তবে কোমল পানীয়, আঙ্গুর, বেদানা খাওয়ানো যাবে না। এরপরও অবস্থার উন্নতি না হলে নিকটস্থ হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে আইসিডিডিআরবি।

ডায়রিয়া থেকে বাঁচতে

ডায়রিয়া থেকে বাঁচতে খাবার ও পানি জীবাণুমুক্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইসিডিডিআরবি। পানি ফোটানোর সময় বলক ওঠার পর আরো পাঁচ মিনিট চুলায় রাখতে হবে। পানি ঠাণ্ডা হলে পান করতে হবে। পানি ফোটানোর ব্যবস্থা না থাকলে প্রতি তিন লিটার পানিতে একটি পানি-বিশুদ্ধকরণ ক্লোরিন ট্যাবলেট দিয়ে পানি নিরাপদ করা যেতে পারে।

রাস্তার পাশের অস্বাস্থ্যকর ও উন্মুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না। খাওয়ার আগে ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। পায়খানা করার পর অথবা শিশুর পায়খানা পরিষ্কার করার পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিতে হবে।

শিশুদের ক্ষেত্রে ফিডারে কিছু না খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছে আইসিডিডিআরবি। যদি খাওয়াতেই হয়, সেক্ষেত্রে ফোটানো পানি ও সাবান দিয়ে ভালো করে ফিডারটি ধুয়ে ফিডারের নিপলের ছিদ্রটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়রিয়া এড়াতে সবচেয়ে জরুরি হলো- জীবাণুযুক্ত খাবার না খাওয়া। পানির মাধ্যমে যেন জীবাণু খাবারে না আসে, সেদিকে লক্ষ্য রাখার পাশাপাশি নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর