কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন রূপ নিল মৃত্যুতে

কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন রূপ নিল মৃত্যুতে

রিফাত আহমেদ রাসেল, দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:১৫ ২ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:২৬ ২ সেপ্টেম্বর ২০২০

বিস্ফোরণ হওয়ার পর মর্টার শেল

বিস্ফোরণ হওয়ার পর মর্টার শেল

অল্প দিনে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন মুহূর্তেই ধুলিস্যাৎ হয়ে রূপ নিল মৃত্যুপুরীতে। লোভের বশবর্তী হয়েই নেত্রকোনার দুর্গাপুরে প্রাণ হারিয়েছেন অটো মেকানিক সবুজ মিয়া।

বড় ভাই কাঞ্চন নিয়ার কথা রাখতে গিয়ে রোববার দুর্গাপুরের শিবগঞ্জে একটি ভাঙারির দোকানে মর্টার শেল বিস্ফোরণে প্রাণ হারান সবুজ মিয়া।

এ ঘটনায় আহত হন দোকানের মালিক কাঞ্চন মিয়ার ছেলে নাহিদ মিয়াও। নাহিদকে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ঢাকার বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

আরো পড়ুন: পানির পরিবর্তে প্রস্রাব খাইয়ে দিয়েছিলো ওসি প্রদীপ

বিস্ফোরণের পর থেকেই পুরো এলাকা জুড়ে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এমনকি বিস্ফোরণের শব্দ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকেও শুনতে পায় স্থানীয়রা। শব্দ সূত্র ধরেই ওই দিন রাতেই যে যার মতো করে ঘটনাস্থলে ভিড় জমান।

শক্তিশালী বিস্ফোরণে ভাঙারি দোকানের স্টিলের শাটার, টিন প্রায়ই ২০-২৫ ফুট দূরে উড়ে গিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। শুধু ভাঙারির দোকানেই না বিস্ফোরণে পাশে থাকা গো-খাদ্যের দোকান ও একটি বসতবাড়ির সীমানা প্রাচীর ভেঙে যায়।

আরো পড়ুন: ক্লাস ফাঁকি দেয়ায় মাদরাসাছাত্রকে শিকলে বেঁধে নির্মম নির্যাতন

এদিকে ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বিস্ফোরণের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে নেত্রকোনার এসপি আকবর আলী মুন্সির নেতৃত্বে পুলিশ, সিআইডি, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, র‌্যাব-১৪ সহ একাধিক সংস্থা যৌথভাবে তদন্ত চালায়।

শুরুতে ভাঙারির দোকানে থাকা ব্যাটারিগুলোকে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে ধারণা করে স্থানীয়রা। কিন্তু বিস্ফোরণের প্রায় দুইদিন পর স্থানীয়দের ধারণাকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করেন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা। তারা বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ মর্টার শেল বলে নিশ্চিত করেন।

বিস্ফোরিত বস্তুটির অংশবিশেষ সংগ্রহের পর তা মর্টার শেল বলে নিশ্চিত হন তারা। আর পুরো দোকানটিতে একটি মাত্র মর্টার শেল ছিল বলে জানান বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা।

আরো পড়ুন: পানিতে ভেসে চিকিৎসাসেবা দেবে হাসপাতাল ‘জীবন খেয়া’

সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ময়মনসিংহ পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ। এর আগে ঘটনাস্থলে যান নেত্রকোনার ডিসি কাজী মো. আব্দুল রহমানসহ স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাঞ্চন মিয়া দীর্ঘদিন ধরেই পুরাতন জিনিসপত্র কেনাবেচার ব্যবসা করছিলেন। তার ভাই সবুজ মিয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মেরামতের কাজ করতেন। কয়েকদিন আগে পাশের একটি গ্রামের ভাঙারির দোকান থেকে প্রায় দুই টন পুরাতন জিনিসপত্র কিনে আনেন কাঞ্চন।

ওই সময় জিনিসপত্রের সঙ্গেই ২৫ টাকা কেজি দরে ১০-১২ কেজি ওজনের মর্টার শেলটি নেন তিনি। মর্টার শেলটি মূলত সীমানা পিলার ভেবে অল্প দিনেই কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন কাঞ্চন মিয়া। বস্তুটির ভেতরে কী আছে এটি দেখতেই রোববার রাতে ছোট ভাই সবুজ মিয়াকে দোকানে ডেকে আনেন তিনি।

আরো পড়ুন: কুড়িগ্রামে সবজি নাগালের বাইরে, ডাল-ডিমই ভরসা

ভাইয়ের কথা মেনে পাশের আরেকটি দোকান থেকে বড় হাতি ও শাবল দিয়ে বস্তুটিকে খোলার চেষ্টা শুরু করেন সবুজ। এ সময় দোকানের বাইরে পাহারা দিচ্ছিলেন কাঞ্চন মিয়া। সবুজ মিয়া মর্টার শেলটির গায়ে আঘাত করা মাত্রই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের পর ভাইয়ের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ ও ছেলেকে আহত অবস্থায় দেখে ভয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান কাঞ্চন মিয়া। পরে স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় তিনি নিজেই থানায় এসে পুলিশের কাছে ধরা দেন।

মর্টার শেলটি দীর্ঘদিনের পুরনো বলে মনে করছেন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের অ্যাডিশনাল এসপি সাখাওয়াত আলম।

আরো পড়ুন: সচেতনতায় করোনামুক্ত নৃতাত্ত্বিক গ্রামগুলো

তিনি জানান, বিস্ফোরিত বস্তুটি একটি পুরনো মর্টার শেল। এটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ কেজির। ২৬ ইঞ্চি লম্বা এবং ১২০ মিলিমিটারের মতো হবে। অবিস্ফোরিত অবস্থায় দীর্ঘদিন এটি মাটির নিচেই ছিল। তবে পরিপূর্ণভাবে এটি কত বছর আগের তা পরীক্ষার পরই জানা যাবে ।

এ ব্যাপারে নেত্রকোনার এসপি মো. আকবর আলী মুন্সি জানান, দোকান মালিক কাঞ্চন মিয়া মর্টার শেলটি কেজি হিসেবে কিনেছেন বলে জানিয়েছেন। কাঞ্চন মিয়ার কাছে যিনি বিক্রি করেছিলেন তাকেও খোঁজা হচ্ছে। তাকে পেলে এর রহস্য জানা যাবে। তবে এটি অনেক পুরনো মর্টার শেল।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর