মাটি বাঁচাতে দেশি গাছ লাগাতে হবে: দ্রাবিড় সৈকত

মাটি বাঁচাতে দেশি গাছ লাগাতে হবে: দ্রাবিড় সৈকত

সাদিকা আক্তার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:০৭ ১ আগস্ট ২০২২   আপডেট: ১৮:৩৬ ১ আগস্ট ২০২২

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

একাশিয়া, মেহগনি, ইউক্যালিপটাস, শিশু, রেইনট্রি এই গাছগুলো বাংলার মাটি, পানি, পরিবেশ, পাখি, পতঙ্গ, অণুজীব, বাস্তুসংস্থান ইত্যাদি ও ফুল-ফসল-পরাগায়নের জন্য ক্ষতিকর। ফলের গাছ রোপণের পাশাপাশি এই পাঁচটি গাছ রোপণ বন্ধের পক্ষে প্রচার ও প্রচারণা চালাচ্ছে সামাজিক সংগঠন ‘ফলদ বাংলাদেশ’। সংগঠনটির পক্ষে বলা হচ্ছে, বাংলার উর্বর মাটিকে রক্ষা করতে হলে দেশি গাছ লাগাতে হবে, যে সকল গাছ এদেশের মাটিতে হাজার বছর ধরে অভিযোজিত হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের পুষ্টি, অর্থনীতি, পরিবেশ। দেশে পাঁচ কোটি ফলের গাছ রোপণের লক্ষ্যে কাজ করছে সংগঠনটি। এই সংগঠনের সভাপতি দ্রাবিড় সৈকতের মুখোমুখি হয়েছিলেন ডেইলি বাংলাদেশের নিজেস্ব প্রতিবেদক সাদিকা আক্তার।

ডেইলি বাংলাদেশ: পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছ হিসেবে কোনগুলোকে চিহ্নিত করছেন?

দ্রাবিড় সৈকত: পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে আমরা যে গাছগুলোকে চিহ্নিত করছি, সেগুলো হলো- ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, একাশিয়া, রেইনট্রি এবং শিশু। আরো অন্যান্য অনেক বিদেশি ক্ষতিকর গাছ আছে। কিন্তু ওগুলো বহুলভাবে রোপিত হয়না বলে আমরা এই পাঁচটি গাছকে চিহ্নিত করে কাজ করছি। কচুরিপানা, রিফুজি লতা এরকম কিছু উদ্ভিদ আছে ব্যাপকভাবে আগ্রাসী, কিন্তু ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, একাশিয়া, রেইনট্রি এবং শিশু  এগুলো যেহেতু আমরা খুব যত্ন করে লাগাচ্ছি এবং আমাদের দেশীয় ভ্যারাইটি রিপ্লেস হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে আমরা এই গাছগুলোকে চিহ্নিত করেছি। এগুলো আমাদের মাটিকে ক্রমশ অনুর্বর করে তুলছে, পানির লেয়ার নিচে নেমে যাচ্ছে, অনুর্বর মাটিতে ফসল ফলাতে প্রচুর সার ও কীটনাশকের ব্যবহার আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
   
ডেইলি বাংলাদেশ: একাশিয়া গাছের তো ঔষধি গুণ আছে, তাহলে এই গাছ তো উপকারেও আসতে পারে, কি মনে করেন?

দ্রাবিড় সৈকত: একাশিয়া গাছ হলো কেবলি কাঠের গাছ। সব গাছেরই তো কিছু না কিছু ঔষধি গুণ থাকে। ব্যাপারটি হলো- একটা, দুইটা বা অল্পস্বল্প একাশিয়া গাছ রোপিত হলে সমস্যা হতো না। আমাদের প্রায় সকল বন এখন একাশিয়ার বন, বনের প্রাচীন বৃক্ষরাজি উচ্ছেদ করে একাশিয়া লাগানাে হচ্ছে। রাস্তার দুই পাশে শুধুই একাশিয়া লাগানাে হচ্ছে, শালবনে প্রচুর শাল গাছ উপড়ে ফেলে সেখানে একাশিয়া গাছ লাগাচ্ছে। আমাদের সরকারি প্রকল্পগুলোতে ব্যাপকহারে একাশিয়া গাছ লাগানো হচ্ছে। আপনি যখন এক কোটি একাশিয়া গাছ লাগাবেন, তাহলে সেই একাশিয়া গাছগুলো এক কোটি দেশীয় গাছের জায়গা দখল করবেই। এটি আমাদের স্থানীয় জনগণ এবং প্রাণ বৈচিত্রের জন্য প্রত্যক্ষভাবেই হুমকিস্বরূপ। এতে পশু, পাখি, কীটপতঙ্গের আবাসস্থল বা খাদ্য নাই। একাশিয়া ফুলের রেণু মানুষের ব্যাপক অ্যাজমার কারণ। গাছের গঠন সাধারণত আকাবাঁকা, কাঠ মাঝারি মানের। একাশিয়া গাছের পাতা মাটি ও পানিকে দূষিত করে। সেটি আমাদের পশুর খাদ্য নয়। যেমন- আম, কাঁঠাল, দেশীয় গাছগুলোতে পশুপাখির খাবার আছে, ঔষধি গুণও আছে, তাদের বাসস্থানের উপযোগী গঠন আছে, সেসব কিন্তু একাশিয়া গাছের নেই। একাশিয়া গাছের পাতা বঙ্গীয় বাস্তুসংস্থনের ব্যাকটেরিয়াগুলোকে চিনে না তাই এটি পচতে অনেক সময় লাগে। এর কারণে ফসল ও মাছের আবাদ নষ্ট হয়। গ্রামের মানুষের ছাই দিয়ে দাঁত মাজার অভ্যাস থাকে। এর পাতা যদি ছাই বানিয়ে ব্যবহার করা হয়, তাহলে মাড়ি ছিলে যেতে পারে। আমাদের দেশীয় কীটপতঙ্গের জন্য এই গাছটি সমস্যাজনক। দেশের মাটিকে বাঁচাতে হলে দেশীয় গাছ লাগাতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনাদের পরিকল্পনা হলো সারাদেশে অন্তত পাঁচ কোটি ফলের গাছ লাগানো। এতো বড় লক্ষ্য কীভাবে অর্জন করবেন বলে কর্মপরিকল্পনা করেছেন?

দ্রাবিড় সৈকত: এর পুরোটা আমরা সরাসরি কোনোভাবেই পারবো না। আমরা দশ বছর ধরে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছি। আমাদের একেবারে নিজস্ব অর্থায়নে, আমরা যারা কাজ করি, তারাই যতটুকু পারি, ততটুকু অর্থ দিয়ে সামর্থ অনুযায়ী কাজ করি। আমরা যেটা করি, ফলের গাছ রোপনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে উৎসাহিত করি এবং ছোটখাটো সমাবেশ, বাজারে যেয়ে মানুষকে বোঝাই। অনেকে উদ্বুদ্ধ হয়, অনেকে আমাদের কথা শোনে- এইভাবে পরোক্ষভাবে আমাদের একটি বড় কাজ হচ্ছে। সরাসরি তো এতো গাছ আমাদের পক্ষে লাগানো সম্ভব নয়, এটি আমাদের সামর্থ্যেরই বাইরে। কিন্তু আমরা যখন মানুষকে বোঝাচ্ছি, যেমন- একটি ক্লাব ৩০ হাজার গাছ লাগাবে। তারপর আমরা তাদের কনভিন্স করলাম করলাম যে, ৩০ হাজার গাছ ফলের লাগান। তারপরে সেটা ফলে কনভার্ট হয়ে গেলো। এই ৩০ হাজার গাছ কিন্তু পরোক্ষভাবে আমরা লাগালাম। আবার ৩০ হাজার ফলের গাছ লাগানোও হলো। এই কাজগুলো আমরা এভাবে করে থাকি। সবাইকে ফলের গাছ লাগানোর বিষয়ে আমরা নানা মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করি, গাছ লাগানোর সাথে সাথে মানুষকে বোঝাই, উৎসাহ দেই।
       
ডেইলি বাংলাদেশ: কাঠের যোগান কোথা থেকে আসবে?

দ্রাবিড় সৈকত: কাঠের যোগানটা তো খুব সহজ। কারণ আপনি যদি আরেকটু পেছনের দিকে যান, তাহলে আমাদের দেশে তখন কাঠ বেশি লাগতো। এখন আমাদের অনেক বেশি বিল্ডিং কিংবা লোহা, স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহারের কারণে আমাদের কাঠের ব্যবহার কমে গেছে। আমাদের দেশীয় প্রজাতির প্রচুর গাছপালা আছে যেগুলো খুব ভালো কাঠ দেয়। মেহগনি, রেইনট্রি, ইউক্যালিপটাস, একাশিয়ার চেয়ে ভালো ভালো দেশীয় প্রজাতি আছে, ফলের গাছ থেকেও ভালো কাঠ পাওয়া যায়। আপনি যদি কাঁঠাল গাছের কথাই বলেন, কাঁঠাল কাঠ দিয়ে আপনি যদি এখন ফার্নিচার বানান, তাহলে আপনার নাতি-নাতনিও সেগুলো ব্যবহার করতে পারবে। আপনি ফলের গাছ থেকেই কাঠের বিকল্প নিতে পারেন, তাছাড়া দেশীয় নিম, তেলসুর, গর্জন, চাপালিশ সব আমরা ভুলে গেছি।

ডেইলি বাংলাদেশ: নতুন কেউ আপনাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কীভাবে কাজ করতে পারবে?

দ্রাবিড় সৈকত: আমাদের ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের ফেসবুক পেজে যুক্ত হতে পারেন। আমাদের পেজে কিংবা আমাদের গ্রুপে মেসেজ দিলেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। ওখানে ফোন নাম্বার দেওয়া আছে। যে কোনো নাম্বারে ফোন দিলেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। এর জন্য আসলে বিশেষ কোনো প্রক্রিয়া নেই। আপনি চাইলেই আমাদের সহযোগী হতে পারেন। আমাদের একার পক্ষে এই বিশাল কাজটি সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। সবাইকে আমরা স্বাগতম জানাই এবং আমাদের সাধ্যমতো তাকে সহযোগিতা করবো বা তার সহযোগিতা নেবো। এদেশের সোনার মাটিকে ইউক্যালিপ্টাস-মেহগনি-একাশিয়া দিয়ে নষ্ট হতে দিলে আমাদের বিপদ থেকে কেউ রক্ষা করেত পারবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস