শুনে শুনেই গান রপ্ত করেন অন্ধ শ্যামল বাউল

শুনে শুনেই গান রপ্ত করেন অন্ধ শ্যামল বাউল

নাদিম হোসাইন, মুন্সিগঞ্জ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:০৮ ৫ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১৮:০২ ৫ আগস্ট ২০২১

স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে শ্যামল বাউল

স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে শ্যামল বাউল

মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার মোল্লারচর গ্রামের বাউল শ্যামল হোসেন জন্ম থেকেই অন্ধ। একতারা, দোতারা কিংবা বাওয়া হাতে পেলেই কণ্ঠে সুর তুলেন তিনি। সবাই তাকে শ্যামল বাউল হিসেবে এক নামে চেনে। গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে লালনের বন্দনা করলেও সব ধরনের গানই শোনা যায় তার কণ্ঠে।

কারো কাছে গান শেখেননি শ্যামল বাউল, শুধু শুনে শুনেই রপ্ত করেছেন এ শিল্প। তার সুরেলা কণ্ঠের বাউল সংগীতের শুনে ভক্ত হয়ে উঠবেন যে কেউ। শুধু গান নয়, আজান দেওয়ার পাশাপাশি গজলও গেয়ে থাকেন শ্যামল বাউল।

নিজের জীবনের গল্প নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশ-এর মুখোমুখি বাউল শ্যামল হোসেন।

গানের জগতে কীভাবে এলেন?
- আমার জীবনে গান গাওয়া শুরু ওস্তাদ ছাড়া। ওস্তাদ ছাড়াই গান শিখেছি। গান আমার মধ্যে কীভাবে আসছে নিজেও জানি না। কারণ আমাকে কেউ পরিশ্রম করে গান শেখায়নি। সবার দোয়ায় আমি গাইতে পারি। হঠাৎ করেই গান ধরেছি। ছোটবেলা থেকে গানের সঙ্গে ছন্দ মিলাতাম। একটা গান একবার দুইবার শুনলেই মুখস্ত করতে পারি। পরে আস্তে আস্তে গানের যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় হয়। এখন একতারা, দোতারা ও বাওয়া বাজাতে পারি।

আপনার পরিবারম স্বজন ও প্রতিবেশীদের কীভাবে শনাক্ত করেন?
- আমি ছোট থেকেই চোখে দেখতে পাই না। অনুভূতি নিয়ে চলি। যেমন আমার কাছের মানুষ যারা আছেন তাদের হাত ধরলেই আমি বলে দিতে পারি এটা অমুক-এটা তমুক। আবার অনেকে সামনে দাঁড়ালেও বলতে পারি কে এটা। এভাবে আমার চলাফেরা। যারা চোখে দেখে- তাদের এ অনুভূতি বোঝানো সম্ভব না।

গান ছাড়া আর কী কী করেন?
- আমি গান ছাড়া মানুষের বাড়িতে মিলাদ মাহফিলে অংশগ্রহণ করি। মাদরাসায় পড়াশোনার সুবাদে আল-কোরআনের বিশেষ বিশেষ আয়াত শুনে শুনে মুখস্ত করেছি। সেসব আয়াত দিয়ে মিলাদ পড়াই। এছাড়া মসজিদে আজান দেই, গজল গেয়ে থাকি। কেউ আমাকে ঠকায় না।

করোনা পরিস্থিতিতে কীভাবে দিন কাটছে আপনার?
- করোনা আশার পর থেকে কোনো গানের প্রোগ্রাম ও মিলাদ মাহফিল হয় না। এতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। কারো কাছে চেয়েও খেতে পারি না। জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট জেলা প্রশাসন থেকে কিছু আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছে। ওটা দিয়ে কয়েকদিন চলেছি। কয়েকজন জনপ্রতিনিধি আমাদের খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছে। কোনোমতে জীবন চলছে। গান আর মিলাদ মাহফিল ছাড়া আমার সংসার চালানোর আর কোনো রাস্তা নেই। চোখে দেখতে পাই না, অন্য কোনো কাজও করতে পারি না।

রাস্তায় চলাফেরা করতে আপনার কী কী সমস্যা হয়?
- সমস্যা অনেক। আমি তো চোখেই দেখতে পাই না। তবে যেসব রাস্তায় এক-দুইবার চলাচল করেছি সেসব রাস্তা কিছুটা মুখস্ত আমার। যদি রাস্তা পারপার করতে হয় তাহলে অন্য কারো সহযোগিতা নিতে হয়। আমি যেখানেই যাই, একাই চলাচল করি। কারো বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।

আপনার পরিবারে কে কে আছে? ঘরবাড়ি?
- আমার পরিবারে স্ত্রী-ছেলেমেয়েসহ ছয়জন সদস্য। ছেলেমেয়েরা অনেক ছোট। নিজের কোনো জমি কিংবা ঘর নেই। আমার বাবারও কোনো জমি ছিল না। মানুষের বাড়িতে থাকি। গান থেকে যে উপার্জন হয় তা দিয়ে কোনোরকম সংসার চলে।

গানের সঙ্গে কী কী বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারেন?
- আগে গানের সঙ্গে আমি একতারা ও দোতারা বাজাতে পারতাম। তারের যন্ত্রে আমার কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এখন আমার বাদ্যযন্ত্র হচ্ছে বাওয়া। আমার কোনো নির্দিষ্ট গানের দলও নেই। যখন প্রোগাম হয়, তখন আমি ছুটে ছুটে দল তৈরি করি। আবার অনেক প্রোগ্রামে আগে থেকেই দল তৈরি থাকে আমি শুধু বাওয়া নিয়ে গান গাইতে চলে যাই।

‘বিদায় বেলায় আর কেঁদো না সাথী’- গানের মাধ্যমে ডেইলি বাংলাদেশ-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বাউল শ্যামল হোসেন। তিনি বলেন, গান নিয়ে এর আগে এত সময় কেউ আমাকে দেয়নি। ডেইলি বাংলাদেশকে ধন্যবাদ আমার প্রতিভা তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়ার জন্য।

জন্মান্ধ শ্যামল বাউলের কণ্ঠে কিছু গান-

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর