প্রেমিকার টানে জুমের ধারণা, বিশ্বের ৮৫ তম শীর্ষ ধনী হলেন ইয়ান

প্রেমিকার টানে জুমের ধারণা, বিশ্বের ৮৫ তম শীর্ষ ধনী হলেন ইয়ান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:৪২ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০  

জুমের প্রতিষ্ঠাতা এরিক ইয়ান।

জুমের প্রতিষ্ঠাতা এরিক ইয়ান।

করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিশ্বের অর্থনীতি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড না চলায় বিশ্বের সব শীর্ষ ধনীদের সম্পর্দে পরিমাণ হু হু করে কমছে। কিন্তু প্রেমিকার টান থেকে ধারণা পেয়ে তৈরি করা জুম অ্যাপের আয়ে বিশ্বের ৫০০ শীর্ষ ধনীদের মধ্যে ৮৫ তম স্থানে উঠে এসেছেন চাইনিজ বংশোদ্ভূত আমেরিকান এরিক ইয়ান। শুধু বিশ্বের ৮৫ তম শীর্ষ ধনীই নয়, করোনাই থাকে আমেরিকার ৪৩ তম ধনকুবের বানিয়েছে।

এরিক ইয়ান হচ্ছেন ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার জুমের প্রতিষ্ঠাতা। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে সফটওয়্যারটি কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক কাজে ব্যবহৃত হতো। দুই বছরের মধ্যেই সফটওয়্যারটির কোম্পানি ত্রি কমা ক্লাবে প্রবেশ করেছে।

ব্লুমবার্গের বিলিনিয়রের সূচি অনুযায়ী, ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মালিক ইয়ান এরইমধ্যে ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্বের ৫০০ শীর্ষ ধনীদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এমনকি আমেরিকার অন্যতম ধনকুবের হিসেবে তিনি তালিকাভুক্ত হয়েছেন। 

গত এপ্রিলে ইয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎকার নিতে যায় একটি সংবাদ মাধ্যম। তখন তিনি তার সম্পদ, ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করতে আগ্রহী নয় বলে জানান। তিনি প্রতিনিধির মাধ্যমে সংবাদ মাধ্যমটিকে বলেন, আমি সাক্ষাৎ করতে পারছি না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই জুমের পেছনে সময় দিতে হচ্ছে। এরিক ইয়ান একমাত্র দক্ষ চাইনিজ- আমেরিকান যিনি সিলিকন ভেলি কোম্পানিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

কে এই এরিক ইয়ান? 

ফোর্বস-দ্য ফিন্যানশিয়াল টাইমসের তথ্যানুযায়ী, খনি প্রকৌশলী মা-বাবার ঘরে চীনের শানডং প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইয়ান।

ব্লুমবার্গ জানায়, ইয়ান অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিক নিয়ে স্নাতক শেষ করেন। পরে প্রকৌশলী বিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। গ্রাজুয়েশন শেষে চার বছর জাপানে ব্যয় করেন ইয়ান। তবে বিল গেটসের ডটকম বাবল সম্পর্কিত একটি বক্তব্য শুনে ক্যালোফর্নিয়ার সিলিকন ভেলিতে ইন্টারনেট স্টার্টআপের কাজ করতে অনুপ্রাণিত হন। 

১৯৯৭ সালের আগে ইয়ান আটবার আমেরিকার ভিসার জন্য আবেদন করেন। আটবারই তাকে ভিসা দেয়নি আমেরিক। তখন তার বয়স ছিল ২৭ বছর। ইয়ান বলেন, আমার ভিসা নিয়ে কাজ করা লোকটির সঙ্গে আমেরিকান অ্যাম্বেসির মতবিরোধ ছিল। ফলে ভিসা দেয়নি অ্যাম্বেসি। 

আমেরিকায় ইয়ানের ক্যারিয়ার

অবশেষে আমেরিকার মাটিতে পা রাখেন ইয়ান। আমেরিকা পৌঁছেই টেলফোন কনফারেন্সিংয়ে কাজ শুরু করেন ইয়ান। তখন সামান্য ইংরেজিতে কথা বলতেন ইয়ান। তবে তিনি তার কাজে মনোযোগী ছিলেন। ইয়ানের ভাষ্য, কয়েক বছর বেশি বেশি কোড লিখতাম। তখন খুবই ব্যস্ত ছিলাম। ওই সময় ফুটবল খেলাকে বেশ পছন্দ করতাম।

জুম প্রতিষ্ঠার আগে ইয়ান টেলিকমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট কোম্পানি সিসকো সিস্টেমের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ইয়ান ওয়েবেক্স নামের একটি ভিডিও কনফারেন্সিং কোম্পানিতে কাজ করেন। তবে কোম্পানিটি ২০০৭ সালে সিসকো কিনে নেয়।

প্রেমিকার টানেই জুমের পরিকল্পনা 

দূরে থাকা প্রেমিকাকে দেখতে না পেয়েই জুমের পরিকল্পনা ভাবেন ইয়ান। সেই ভাবনা আজ তাকে বিলিয়নিয়ার বানিয়ে দিয়েছে। ফরচুনের তথ্যানুযায়ী, চীনে বসবাস করার সময় ইয়ান ও তার প্রেমিকা আলাদা কলেজে ভর্তি হতে বাধ্য হন। তাদের দুই জনের কলেজের দূরত্ব ট্রেন যাত্রায় ১০ কিলোমিটার। পরবর্তীতে তারা বিবাহ বন্ধনেও আবদ্ধ হন।

২০১৯ সালে ফোর্বসকে ইয়ান বলেন, সারাবছরে দুই বার ১০ ঘণ্টা ট্রেন জার্নি করে প্রেমিকাকে দেখতাম। তখন আমার বয়স ১৮ বা ১৯ ছিল। তখন ভবিষ্যতে এক চাপে প্রেমিকাকে দেখে কথা বলার ফ্যান্টাসিতে ভুগি। সেই অভিজ্ঞতেই টেলিফোনের মধ্যে সম্মিলিত ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের ধারণা দেয়।

সিএনবিসির তথ্যানুযায়ী, ইয়ান বন্ধুত্বভাবাপন্ন কনফারেন্সিং পদ্ধতি তৈরি করতে চেয়েছিলেন যাতে সহজে ব্যবহার করা যায়। তাই আজকের জুমের ভার্চুয়াল ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহারকারীরা বিচ বা গোল্ডেন গেইট ব্রিজের সামনের দৃশ্য ব্যবহার করতে পারেন।

জুম নিয়ে ইয়ানের যুদ্ধ যাত্রা

২০১১ সালে সিসকোতে স্মার্টফোন ভিত্তিক একটি ভিডিও কনফারেন্সিং চালু করেন ইয়ান। কিন্তু বস তাকে হঠিয়ে দেন। তিনি জুম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ শুরু করেন। কিন্তু শুরুতেই ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের স্টার্টআপের জন্য যুদ্ধ করেছেন ইয়ান।
ইয়ান বলেন, সিসকো ফেসবুকের মতো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং তৈরির চেষ্টা করছিল। সিসকো ভুলটি করেছিল। সিসকো ছাড়ার পর আমি বুঝতে পারলাম, আমার সিদ্ধান্তটাই সঠিক।

দ্য ফিন্যান্স টাইমসের তথ্যানুযায়ী, নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে বিনিয়োগের জন্য কাউকে রাজি করাতে পারিনি। তাই বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে ধার করে জুম শুরু করেন ইয়ান। ইয়ান বলেন, সবার চিন্তা ছিল, মার্কেটে বেশি পরিমাণ ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের সার্ভিস এসে গেছে। তাই এটি অনর্থক হবে।

২০১৯ সালে জুম বিনিয়োগের মূলধন বৃদ্ধিকারী স্যান্তো সাবোটোবস্কাই সিএনবিসিকে জানায়, অনেক প্রত্যাখান গ্রহণের পর স্ক্রিনসেভারই পরিবর্তন করেন ইয়ান যাতে এটি কাজ চালিয়ে যেতে পারে। 

ফোর্বসকে ইয়ান বলেন, সিসকো ছাড়ার সময় তার স্ত্রীও শুরুতে প্রশ্ন করেছিল, কেন তুমি সিসকো ছাড়ছো? উত্তরে বলেছিলাম, আমি জানি এটি দীর্ঘ যাত্রা ও কঠিন কিন্তু আমি যদি চেষ্টা না করি তবে আমাকে একদিন আফসোস করতে হবে।

জুমের যাত্রা- ইয়ান নিজেই কাস্টমার সার্ভিস দাতা 

জুমের যাত্রার শুরুর দিকে সব অংশে জড়িয়ে পড়েন সাবেক প্রকৌশলী ও অ্যাপটির প্রতিষ্ঠাতা এরিক ইয়ান। এমনকি নিজেই কাস্টমার সার্ভিসও দিয়েছেন। 

ইয়ান বলেন, জুমের শুরুর দিকে আমি নিজেই ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সার্ভিস প্রত্যাখানকারী কাস্টমারদের মেইল করতাম। তখন আমাদের কাস্টমার অটো মেইল করার অভিযোগ তুললেন। জুমের প্রধান নির্বাহীকে ছদ্মবেশীও আখ্যা দিলেন। কাস্টমার বলেছিলেন, জুম একটি অসৎ কোম্পানি। অবশেষে জুম কলকে তিনি সৎ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।  

২০১৯ সালেই বিলিয়নিয়ার ইয়ান 

ফোর্বসের তথ্যানুযায়ী, জুম গত বছর সবচেয়ে সফল আইপিও অর্জনকারী যা লিফট ও পিন্টারেস্টের চেয়ে বেশি। জুমের বর্তমান সম্পদ রয়েছে ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জুমের ৩০ হাজার ক্লায়েন্টস রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- স্যামসাং, উবার, ওয়ালমার্ট, ক্যাপিটাল ওয়ান। 

কর্মক্ষেত্রে জনপ্রিয় ইয়ান

গ্লাসডোর এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে কোম্পানি বা তার মালিকের রিভিও দিতে পারেন কোম্পানিতে কর্মরতরা। গ্ল্যাসডোরের রিভিউতে ইয়ান ৯৯ শতাংশ সম্পতির রেট অর্জন করেছেন। ২০১৮ সালে ইয়ানকে ‘বিগ কোম্পানি সিইও’  হিসেবে আখ্যা দেয় গ্লাসডোর । তবুও ইয়ান কঠোর পরিশ্রম করেন এবং সবসময় ভদ্র থাকেন।  

ছয় মাসে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে মালিক ইয়ান

করোনাভাইরাস বিস্তার রোধ ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বিশ্বজুড়ে বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ও অফিসের কাজ অনলাইনে স্থানান্তরিত হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে জুমের ব্যবহার ১৯০০ শতাংশ বেড়ে যায়। এতে ৩৫৫ শতাংশ বেড়ে যায় জুমের শেয়ার মূল্য। আর ইয়ানের বিশাল সম্পদ ১৭.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জুমের ১৯ শতাংশ শেয়ার থেকেই এসেছে।

২০২০ সাল বা করোনাকালের এ সম্পদ ইয়ানকে বিশ্বের ৮৫ শীর্ষ ধনী বানিয়েছে। এই ইয়ানই আগের বছর ব্লুমবার্গের ইনডেক্স তালিকায় ছিলেন না।

ফোর্বস ম্যাগাজিন প্রতিবছর আমেরিকার ৪০০ ধনকুবেরের নামের তালিকা প্রকাশ করে। এবার ইয়ানের সম্পদ তাকে আমেরিকার ৪৩তম ধনকুবের বানিয়েছে।

সূত্র-বিজনেস ইনসাইডার।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ