দাম জানতে ‘ইনবক্স প্লিজ’: কৌশল না প্রতারণা?

দাম জানতে ‘ইনবক্স প্লিজ’: কৌশল না প্রতারণা?

তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:২২ ১৩ জানুয়ারি ২০২২  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

পুরান ঢাকার গৃহিণী কথাকলি। অবসর সময়টা কাটান ফেসবুকেই। একদিন ফেসবুকের একটি গ্রুপে শাড়ির ছবি দেখে ভীষণ পছন্দ হলো। কিন্তু ছবির সঙ্গে দাম উল্লেখ না থাকায়, সেই পোস্টে কমেন্ট করেন কথাকলি। কিছুক্ষণ পরই তিনি দাম জানতে পারলেন ইনবক্সের মাধ্যমে। তার মতে, ফেসবুকের মতো সহজ মাধ্যমে, পণ্যের দাম জানতে কঠিন গ্যাড়াকলে পড়তে হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পূজা একই গয়নার ছবি দেখেছেন বেশ কয়েকটি ইনস্টাগ্রাম আইডিতে। তবে কেউই পণ্যটির দাম উল্লেখ করেননি। ডিরেক্ট মেসেজে দাম জানান পর পার্থক্যও বুঝতে পেরেছেন। ৫০ থেকে ১২০ টাকা কম-বেশি দাম চেয়েছেন সবাই। তার কাছে মনে হলো, এর ফলে অনেকে ক্রেতাই ঠকছেন।

কথাকলি ও পূজা ছদ্মবেশি দুটি উদাহরণ মাত্র—বাস্তবে দেশে অনলাইন ব্যবসা চলছে এভাবেই। সামাজিক মাধ্যমে লাইভ, ছবি কিংবা ভিডিওর মাধ্যমে পণ্যের বিস্তারিত বর্ণনা করলেও, মূল্য প্রকাশ্যে বলেন না বেশিরভাগ উদ্যোক্তা। অভিনব কৌশল হিসেবে তারা হাতে নিয়েছেন ‘বিস্তারিত জানতে ইনবক্স করুন’ পদ্ধতি।

ফেসবুকে পেজ বা গ্রুপ খুলে কেবলমাত্র পণ্যের ছবি ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনার ক্যাপশন দিয়ে আপলোড করা হচ্ছে। মন্তব্যের ঘরে কেউ পণ্যের মূল্য জানতে চাইলেই পণ্যের বিজ্ঞাপনদাতা তাতে উত্তর দেন- ‘ইনবক্স চেক করুন’। এরপর সেখানেই চলে দরকষাকষি!

ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামভিত্তিক উদ্যোক্তারা কেন প্রকাশ্যে পণ্যের দাম বলতে চান না? এই প্রশ্নের বিপরীতে প্রত্যেকেরই প্রায় একই উত্তর—কৌশল। তবে এর বাইরেও বেশ কিছু উত্তর মিলেছে। অনলাইন ব্যবসার এটিই নাকি নিয়ম। এমনকি গ্রুপ-পেজে কোনো ক্রেতা পণ্যের দাম প্রকাশ করলে, তাকে ব্যান করেও দেওয়া হয়।

‘সুপ্তি দ্য ওয়াও’ গ্রুপে ওয়েস্টার্ন ড্রেস ও ভারতীয় শাড়ি বিক্রি করা হয়। এটি পরিচালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আফরোজা সুপ্তি। তিনি বলেন, এটা মূলত বিক্রি বাড়ানোর পলিসি। ক্রেতারা ইনবক্সে তখনই পণ্যের দাম জিজ্ঞেস করেন, যখন তার পছন্দ হয়। আর কমেন্টের বদলে বিক্রেতার সঙ্গে ক্রেতার ইনবক্সে যোগাযোগ হলে, বিক্রির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

তবে ভিন্ন মত দিলেন গয়নার পেজ ‘মালা টালা’-র স্বত্ত্বাধিকারী সুপ্তি মালাকার। তিনি জানান, মূলত পোস্টে কমেন্ট সংখ্যা বৃদ্ধি করে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য। এতে পেজ রিচ বাড়ে। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে বেশ বড় প্রভাব রাখে এই ট্রিকস।

তবে একেকজনের থেকে একই গুণগত মানের পণ্যের ভিন্ন রকম মূল্য আদায়ও থাকে অন্যতম উদ্দেশ্য—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক উদ্যোক্তা এমনটাই জানিয়েছেন। এছাড়া তৃতীয় বা চতুর্থ ব্যক্তির মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করানোও অন্যতম কারণ।

ধরুন, মূল উৎপাদনকারী একটি পণ্যের বিক্রয়মূল্য ধার্য করেছে ১০০ টাকা। তিনি আরেকজনকে বললেন, ১০০ টাকার অধিক মূল্যে বিক্রয় করতে পারলে বাকিটুকু তোমার লাভ। দ্বিতীয় ব্যক্তি আরেকজন ব্যক্তির সঙ্গে একই চুক্তি করল। তিনি হয়তো দাম নির্ধারণ করলো- ১২০ টাকা। আবার এদের প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন নামে ফেসবুক পেজ খুলে অভিন্ন পণ্য বিভিন্ন দামে বিক্রয় করছে। এভাবেই তৈরি হচ্ছে অনলাইনে উদ্যোক্তা। আর অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা।

অথচ বর্তমান সরকারের পাস করা ‘ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯’ এর ৩৮ ধারায় পণ্যের দাম সহজে দৃশ্যমান কোনো স্থানে না রাখলে ১ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে দেশে এখনো অনলাইন ব্যবসার নীতিমালা তৈরি হয়নি। এতে একদিকে যেমন সুক্ষ্ম প্রতারণার মাত্রা বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ। তার মধ্যে ফেসবুক ব্যবহার করেন ৮৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। আর ফেসবুককেন্দ্রিক ব্যবসা করে প্রায় ৩ লাখ উদ্যোক্তা, যার অর্ধেকই নারী। এত বড় ক্যানভাসে বাণিজ্য চলছে এভাবেই।

এ প্রসঙ্গে ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ই-কমার্স খাতের বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে তার যথাযথভাবে সমাধান না করা হলে কিছু অসৎ লোক এর অপব্যবহার করতে পারে। সেটি হলে খাতটির অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ই-কমার্স খাতের ব্যবসা বিস্তৃতির গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যদি যথাযথ নীতিমালা করা না হয়, তাহলে ভোক্তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে