কিলিমানজারো: বরফ না থাকলে কী হবে?

কিলিমানজারো: বরফ না থাকলে কী হবে?

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:০৮ ২৪ জুন ২০২২  

কিলিমানজারো। ছবি: সংগৃহীত

কিলিমানজারো। ছবি: সংগৃহীত

আফ্রিকা মহাদেশের তানজানিয়ার উত্তরে কেনিয়ার সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো একটি আগ্নেয় পর্বত। শিরা, মাওয়েনজি এবং কিবো- এই ৩ আগ্নেয়গিরির ভৌগোলিক অবশেষ হিসেবে বছরের পর বছর ধরে গঠিত হয়েছে এই পর্বত। ভূগোলবিদদের ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ৩০ লাখ বছর পূর্বে এই পর্বত গঠিত হয়েছে। মাউন্ট কিলিমাঞ্জারোর সর্বোচ্চ চূড়ার উচ্চতা ৫হাজার ৮৯৫ মিটার। এটি আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ৭ মহাদেশের ৭ সর্বোচ্চ শৃঙ্গের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে এই পর্বত।

কিলিমাঞ্জারো পর্বতের নামের উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদরা নিশ্চিত নন। প্রচলিত ধারণা মোতাবেক, সোয়াহিলি ভাষার ‘কিলিমা’ এবং চাগা ভাষার ‘এনজারো’- এই দুই শব্দের সন্ধির মাধ্যমে কিলিমাঞ্জারো শব্দের উৎপত্তি। এই দুই শব্দের অর্থ যথাক্রমে ‘পর্বত’ এবং ‘সাদা’। বরফে আচ্ছাদিত কিলিমাঞ্জারোর চূড়ার ‘সাদা’ রং থেকে এমন নামকরণ। কিলিমাঞ্জারোর আরও একটি প্রচলিত অর্থ রয়েছে। চাগা ভাষায় বিদ্যমান একটি শব্দকে ইউরোপীয়রা ‘কিলিমাঞ্জারো’ উচ্চারণ করতো। সেই শব্দের শাব্দিক অর্থ ছিল ‘আরোহণ করতে ব্যর্থ’।

ইতিহাসের পাতায় কিলিমাঞ্জারোর সর্বপ্রাচীন অন্তর্ভূক্তি পাওয়া গেছে টলেমির লেখনীতে। সেখানে আকাশের বুকে তুষার দ্বীপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তানজানিয়ার এই শৃঙ্গকে। তুষারগলা পানির মাধ্যমে উর্বর হওয়া পর্বতের পাদদেশে বহু প্রাচীনকাল থেকে নানা যাযাবর জাতি বসতি গড়েছিল। এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিকরা পেয়েছেন প্রাচীন কৃষিনির্ভর সমাজের নানা নিদর্শন। তবে কালের বিবর্তে এসব নিদর্শন এখন তেমন একটা চোখে পড়বে না। এছাড়া এই অঞ্চল চীনা এবং আরব বণিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ৭ শতক পূর্বের চীনা পণ্ডিতরা এই পর্বতের কথা উল্লেখ করেছেন তাদের পাণ্ডুলিপিতে।

কিলিমানজারো। ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক যুগে কিলিমাঞ্জারো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ রচনা করেছেন জোহান রেবমান নামক একজন যাজক। ১৮৪৯ সালে প্রকাশিত সেই পাণ্ডুলিপি তৎকালীন পণ্ডিত সমাজে খুব একটা সমাদৃত হয়নি। ১৮৮৫ সালে এই পর্বতটি জার্মান উপনিবেশের অন্তর্ভূক্ত করা হয়। জার্মান নথিতে একে ‘জার্মান মুলুকের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে একে জয় করেন হান্স মেয়ার। ১৮৮৯ সালে তিনি এই পর্বতের কিবো অংশের চূড়ায় উঠেন। পরবর্তীতে এটি ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। ১৯৬১ সালে তানজানিয়ার স্বাধীনতা লাভের পূর্ব পর্যন্ত এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। স্বাধীনতার একযুগ পর ১৯৭৩ সালে একে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৬৬৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের কিলিমাঞ্জারো জাতীয় উদ্যান নির্মাণ করা হয়।

পৃথিবীকে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে দুই ভাগ করা বিষুবরেখা থেকে মাত্র ২০৫ মাইল দূরে অবস্থিত এই পর্বত। বিষুবরেখা অঞ্চলে সূর্য লম্বভাবে তাপ দেয় বিধায় তাপমাত্রা বেশি থাকে। এই কারণে প্রাচীন অভিযাত্রিকরা কিলিমাঞ্জারোর চূড়ায় বরফ দেখে বিশ্বাস করতে পারেননি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন পৃথিবীর বরফ যুগের সময় হিমবাহ নিম্নতাপে জমে এর চূড়ায় বরফ সৃষ্টি করেছে। ১৯১২ সালে এর চূড়ায় বরফের আয়তন পরিমাপ করে ১১.৪ বর্গ কিলোমিটার নির্ণয় করা হয়েছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বছরের পর বছর ধরে এই বরফের পরিমাণ কমতে থাকে। ২০১১ সালে এর আয়তন প্রায় ৮৫% কমে দাঁড়ায় ১.৭৬ বর্গ কিলোমিটারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে এর বরফ সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে। তবে এর পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চেয়ে বন ধ্বংস করাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন পরিবেশবিদরা। তাই কিলিমাঞ্জারোর বরফ রক্ষা করতে ২০০৮ সালে পর্বতের পাদদেশে প্রায় ৫০ লাখ বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।

কিলিমানজারো। ছবি: সংগৃহীত

কিলিমাঞ্জারোর আরেকট বিচিত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পর্বতের পাদদেশ থেকে শীর্ষ পর্যন্ত ৫টি ভিন্ন জলবায়ু স্তর দেখা যাবে। পাদদেশের সন্নিকটে আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ এবং বছরজুড়ে স্থিতিশীল থাকে। প্রায় ১৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত চাষাবাদযোগ্য আবহাওয়া বিদ্যমান রয়েছে। এরপর শুরু হয় রেইনফরেস্ট স্তর। এখানের তাপমাত্রা কিছুটা উষ্ণ এবং বায়ু আর্দ্র থাকে। প্রায় ২৮০০ মিটার উচ্চতার পর শুরু হয় জলাভূমি জলবায়ু স্তর। রেইনফরেস্ট থেকে এর বাতাস শুষ্কতর এবং তাপমাত্রা কম। এরপর থেকে প্রতিটি স্তরে তাপমাত্রা কমতে থাকে এবং বাতাস শুষ্ক হতে থাকে। ৪,০০০ মিটার উচ্চতায় শুরু হয় মরু জলবায়ু। এখানে প্রাণের কোনো নামগন্ধ নেই। ৫,০০০ মিটার থেকে পর্বতের চূড়া পর্যন্ত আর্কটিক জলবায়ু স্তর বিদ্যমান। এই স্তরে পাথুরে এবং বরফে আচ্ছাদিত। এমন বিচিত্রভাবে স্তরে স্তরে জলবায়ুর ভিন্নতা একে অনন্য করে তুলেছে।

বরফ না থাকলে যে বিপদ হবে

কিলিমানজারোর ভবিষ্যৎকেও শঙ্কায় ঘিরে ফেলছে উষ্ণায়ন। কিলিমানজারোর তিন আগ্নেয় শঙ্কুর সবচেয়ে বড়টি, অর্থাৎ কিবো নামের শঙ্কুটি সমুদ্রপৃষ্ণ থেকে ৫৮৯৫ মিটার উঁচুতে গিয়ে ঠেকেছে। সেই শিখর থেকে বরফ গলে পড়ছে দ্রুত। গবেষকরা বলছেন, ১৯১২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৮৫ ভাগ বরফই হারিয়েছে কিবোর শুভ্র শিখর।

যদি এসব বরফ গলে যায় তাহলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে প্রায় ২৩০ ফুট। যার ফলে প্রায় সাতটি মহাদেশেরই বিরাট অংশ চলে যাবে পানির নিচে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই বরফ গলে গেলে অনেক অঞ্চলের অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি