পুতিনের সঙ্গে থাকা ব্রিফকেসে ঠিক কী থাকে?

পুতিনের সঙ্গে থাকা ব্রিফকেসে ঠিক কী থাকে?

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:২১ ২৪ জুন ২০২২   আপডেট: ১৪:২৩ ২৪ জুন ২০২২

শেগেট। ছবি: সংগৃহীত

শেগেট। ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর। রাশিয়ার টেলিভিশনে দেখা গিয়েছিল, কালো রঙের একটি ছোট ব্রিফকেস তুলে দেওয়া হচ্ছে দেশের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে।

পুতিনের হাতের ব্রিফকেসটিতে কী রয়েছে? পশ্চিমী দেশগুলোর সংবাদমাধ্যমের ‘কৌতূহলী’ রিপোর্টে দাবি, সেটি আসলে পরমাণু ব্রিফকেস। সেটি কী? ঠিক কী থাকে পরমাণু ব্রিফকেসের ভেতরে?

সংবাদমাধ্যমের দাবি, ওই ব্রিফকেসের ভেতরেই নাকি রয়েছে দেশের পরমাণু অস্ত্রসম্ভার নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি। রাশিয়া, ফ্রান্স, আমেরিকা, এমনকি ভারতের পড়শি পাকিস্তানসহ বিশ্বের বহু দেশেই এ ধরনের পরমাণু ব্রিফকেসের চলন রয়েছে। অথচ সেসব দেশের সরকারি ফাইলে এ ধরনের কোনো ব্রিফকেসের অস্তিত্বই নেই!

পুতিনের প্রায় সর্বক্ষণের ‘ছায়াসঙ্গী’ তথা সে দেশের ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) ভাদিম জিমিন সোমবার মস্কোর কাছে নিজের ফ্ল্যাটে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই আবারো শিরোনামে এই পরমাণু ব্রিফকেস।

জিমিনই নাকি পুতিনের পরমাণু ব্রিফকেস বহনের দায়িত্ব পালন করতেন। পুতিনের পাশে প্রায় সর্বক্ষণ একটি ব্রিফকেস হাতে দেখা গেলেও কেজিবির প্রাক্তন গুপ্তচর জিমিনের দায়িত্ব সম্পর্কে সরকারিভাবে কিছু জানায়নি রুশ সরকার।

দেশবিদেশের বহু রাষ্ট্রপ্রধানের সর্বক্ষণের সঙ্গী নাকি এই ব্রিফকেস। যদিও দেশভেদে পরমাণু ব্রিফকেসের নামও বদলে গিয়েছে। রাশিয়ায় যেমন এটি ‘শেগেট’ নামে পরিচিত। তেমনি আমেরিকায় তার নাম ‘পরমাণু ফুটবল’ নামে ডাকা হয়। ফ্রান্সে আবার একে ‘মোবাইল বেস’ বলে ডাকা হয়।

কখনো পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করার প্রয়োজন হলে নাকি এই ব্রিফকেসের মাধ্যমে তা করা যেতে পারে। বিশেষ ভাবে তৈরি ব্রিফকেসের ভেতরে রয়েছে পরমাণু অস্ত্রসম্ভারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

সংবাদমাধ্যমের দাবি, সাধারণত এই ব্রিফকেসটি সর্বক্ষণ রাষ্ট্রপ্রধানের কাছেই থাকে। কখনো খোদ রাষ্ট্রপ্রধানকেই তা বহন করতে দেখা গিয়েছে। আবার তার হয়ে এটি সবসময় বহনের দায়িত্বে রয়েছেন ব্রিফকেস-বাহক। এবং ওই ব্রিফকেসটি নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের কাছেপিঠে থাকাই কাজ তার।

দেশবিদেশের বহু রাষ্ট্রপ্রধানের সর্বক্ষণের সঙ্গী নাকি এই ব্রিফকেস। ছবি: সংগৃহীত

২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল বিবিসির একটি তথ্যচিত্রে দাবি করা হয়েছিল, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের হাতে যে কালো রঙের ব্রিফকেস রয়েছে, সেটি আসলে পরমাণু ব্রিফকেস। তার ভিতরেই নাকি সে দেশের পরমাণু অস্ত্রসম্ভারের কোড বা সঙ্কেত ছিল। যদিও এই দাবি আদৌ সত্য কি না, তা জানা যায়নি।

ভারতেও কি এমন ব্রিফকেস রয়েছে? সংবাদমাধ্যমের দাবি, এখনো পর্যন্ত এ দেশে তার অস্তিত্ব মেলেনি। আদৌ পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন হলে সে সিদ্ধান্তে নিউক্লিয়ার কম্যান্ড অথরিটি (এনসিএ)-র সর্বসম্মত অনুমোদন প্রয়োজন।

এনসিএর এগ্জিকিউটিভ কাউন্সিল এ বিষয়ে রাজনৈতিক পরিষদকে মতামত দিতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং রাজনৈতিক পরিষদের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পরমাণু অস্ত্রসরিষদের সবুজ সঙ্কেত পেলে তবেই পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করার অনুমোদন মিলবে। প্রসঙ্গত, এগ্জিকিউটিভ কাউন্সিলের মাথায় রয়েছেন জাম্ভার নিয়ে দুর্ঘটনা এড়াতেই নাকি এই বন্দোবস্ত।

রাশিয়ায় পরমাণু ব্রিফকেসের সাঙ্কেতিক নাম শেগেট কেন? মাউন্ট শেগেটের নামেই এ নাম রাখা হয়েছে বলে দাবি সংবাদমাধ্যমের।

রাশিয়া পরমাণু অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করবে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে কাজবেক কমিউনিকেশন সিস্টেম নামে একটি সাঙ্কেতিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও নাকি চালু করা যায় এই ব্রিফকেসের মাধ্যমে। সরকারের শীর্ষনেতা বা সামরিক আধিকারিকদের মধ্যে এ বিষয়ে কথাবার্তার জন্য ওই যোগাযোগ ব্যবস্থার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে বলেও দাবি।

সংবাদমাধ্যমের আরো দাবি, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এবং সেনাবাহিনীর প্রধানকে কারা এই পরমাণু ব্রিফকেসটির ভার দেয়, তা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি।

পরমাণু ব্রিফকেসের অস্তিত্ব সরকারিভাবে স্বীকৃত না হলেও মাত্র দুবার আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি প্রকাশ্যে এনেছিল রাশিয়ার টেলিভিশন। 

সরকারি ফাইলে যার অস্তিত্ব স্বীকারই করা হয় না, সেটি জনসমক্ষে কেন আনা হলো? ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের দাবি, বিশ্বের অন্যতম পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে রাশিয়ার শক্তি প্রদর্শনই ওই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে ছিল।

আশির দশকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান ইউরি আন্দ্রোপভের আমলে শেগেট তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি। ১৯৮৪ সালের মার্চে মিখায়েল গর্বাচভ তৎকালীন সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি কাজে লাগানো শুরু হয় বলে দাবি সংবাদমাধ্যমগুলোর। সে সময় এর যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে একটি সাঙ্কেত ব্যবস্থার সাহায্য নেওয়া হতো।

শেগেটের ভিতরে কী রয়েছে? রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলোতে দাবি, ব্রিফকেসের ভিতরে রয়েছে পুরনো ধাঁচের একটি কম্পিউটারের মতো দেখতে যন্ত্র। ধূসর রঙের ওই বৈদ্যুতিন যন্ত্রটিতে কালো রঙের একটি স্ক্রিন রয়েছে। সঙ্গে বেশ কতগুলো বোতাম। প্রায় সব কটি সাদা। তবে তার মধ্যে একটি লাল রঙের বোতাম সহজেই নজরে পড়ে।

রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমের দাবি, মজার কথা হলো যে ওই লাল বোতামটি চোখে পড়লেও আসল কাজ করে মাঝখানের একটি সাদা বোতাম।

শেগেটের ভিতরে অন্য বোতামগুলোর কী কাজ, তা অবশ্য জানানো হয়নি। সত্যিই কি এই যন্ত্রটির মাধ্যমে পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার ব্যবহার করা যায়? রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমের দাবি, পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনে একটি সাঙ্কেতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে শেগেটকে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মনে করা হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি