কিলিমাঞ্জারো ও চাগা জাতি, যেন একে অপরের হাত ধরে চলা ইতিহাস

কিলিমাঞ্জারো ও চাগা জাতি, যেন একে অপরের হাত ধরে চলা ইতিহাস

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:০১ ১৩ মে ২০২২   আপডেট: ১৯:৩৯ ১৩ মে ২০২২

চাগা জাতি। ছবি: সংগৃহীত

চাগা জাতি। ছবি: সংগৃহীত

আফ্রিকা মহাদেশের তানজানিয়ার উত্তরে কেনিয়ার সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো একটি আগ্নেয় পর্বত। শিরা, মাওয়েনজি এবং কিবো- এই ৩ আগ্নেয়গিরির ভৌগোলিক অবশেষ হিসেবে বছরের পর বছর ধরে গঠিত হয়েছে এই পর্বত। ভূগোলবিদদের ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ৩০ লাখ বছর আগে এই পর্বত গঠিত হয়েছে। মাউন্ট কিলিমাঞ্জারোর সর্বোচ্চ চূড়ার উচ্চতা ৫ হাজার ৮৯৫ মিটার। এটি আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ৭ মহাদেশের ৭ সর্বোচ্চ শৃঙ্গের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে এই পর্বত।

স্থানীয়দের নিকট এর চূড়ার একটি সুন্দর নাম রয়েছে- ‘উহুরু’। সোয়াহিলি ভাষার এই শব্দের অর্থ হচ্ছে মুক্তি বা স্বাধীনতা। মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো বাস্তবেও স্বাধীন। পৃথিবীর বেশিরভাগ পর্বত কোনো না কোনো পর্বতমালার অংশ। যেমন ধরা যাক মাউন্ট এভারেস্টের কথা। হিমালয় পর্বতমালার শত শত পর্বতের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট। কিন্তু মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো কোনো পর্বতমালা বা রেঞ্জের অন্তর্ভূক্ত নয়। মুক্তভাবে দণ্ডায়মান পর্বত চূড়ার তালিকায় এটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে কিলিমাঞ্জারোর মতো মুক্ত পর্বতগুলো গঠিত হয় বলে ধারণা করা হয়।

কিলিমাঞ্জারো পর্বত। ছবি: সংগৃহীত

কিলিমাঞ্জারো পর্বতের নামের উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদরা নিশ্চিত নন। প্রচলিত ধারণা মোতাবেক, সোয়াহিলি ভাষার ‘কিলিমা’ এবং চাগা ভাষার ‘এনজারো’- এই দুই শব্দের সন্ধির মাধ্যমে কিলিমাঞ্জারো শব্দের উৎপত্তি। এই দুই শব্দের অর্থ যথাক্রমে ‘পর্বত’ এবং ‘সাদা’। বরফে আচ্ছাদিত কিলিমাঞ্জারোর চূড়ার ‘সাদা’ রং থেকে এমন নামকরণ। 

কিলিমাঞ্জারোর আরো একটি প্রচলিত অর্থ রয়েছে। চাগা ভাষায় বিদ্যমান একটি শব্দকে ইউরোপীয়রা ‘কিলিমাঞ্জারো’ উচ্চারণ করতো। সেই শব্দের শাব্দিক অর্থ ছিল ‘আরোহণ করতে ব্যর্থ’।

ইতিহাসের পাতায় কিলিমাঞ্জারোর সর্বপ্রাচীন অন্তর্ভূক্তি পাওয়া গেছে টলেমির লেখনীতে। সেখানে আকাশের বুকে তুষার দ্বীপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তানজানিয়ার এই শৃঙ্গকে। তুষারগলা পানির মাধ্যমে উর্বর হওয়া পর্বতের পাদদেশে বহু প্রাচীনকাল থেকে নানা যাযাবর জাতি বসতি গড়েছিল।

কিলিমাঞ্জারো পর্বত। ছবি: সংগৃহীত

এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিকরা পেয়েছেন প্রাচীন কৃষিনির্ভর সমাজের নানা নিদর্শন। তবে কালের বিবর্তে এসব নিদর্শন এখন তেমন একটা চোখে পড়বে না। এছাড়া এই অঞ্চল চীনা এবং আরব বণিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ৭ শতক পূর্বের চীনা পণ্ডিতরা এই পর্বতের কথা উল্লেখ করেছেন তাদের পাণ্ডুলিপিতে।

প্রাচীনযুগ থেকে কিলিমাঞ্জারো পর্বত অঞ্চলে বিভিন্ন জাতি বসবাস করে আসছে। ওয়াকোনিঙ্গো, বান্টু পিগমিসহ আরো কয়েকটি ক্ষুদ্র জাতি এখানে বসতি স্থাপন করেছিল। একসময় উম্বু জাতির আক্রমণে ওয়াকোনিঙ্গোরা এখান থেকে পালিয়ে যায়। এখানে ওয়াঙ্গাসা নামক আরেকটি জাতির স্থাপনা পাওয়া যায়। আদিকাল থেকে এরা কিলিমাঞ্জারো অঞ্চলে বসবাস করছে, এমন দাবি করে এই জাতি। 

এরপর ৪০০ বছর আগে এখানে ওয়াচাগা জাতির আগমন ঘটে। বহু বছরের যুদ্ধ, বিবাদের পর একসময় এরা সকলে এক নেতার নেতৃত্বে চাগা জাতি হিসেবে একতাবদ্ধ হয়।

কিলিমাঞ্জারো পর্বত। ছবি: সংগৃহীত

এখন পর্যন্ত তানজানিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতিগোষ্ঠী হিসেবে চাগা জাতির নাম উচ্চারিত হয়। জার্মান উপনিবেশকালে এই জাতির সদস্যরা পশ্চিমা সংস্কৃতির স্পর্শে অনেকটাই নিজস্ব রীতি-ঐতিহ্য থেকে সরে আসে। তবে এখনও এরা নিজেদের চাগা হিসেবে পরিচয় দেয়। চাগা সমাজে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে কলা এবং কফি। বহুকাল ধরে প্রাচীন বিনিময় প্রথা প্রচলিত ছিল এই সমাজে। গত শতক থেকে এরা মুদ্রাভিত্তিক বাণিজ্য করা শুরু করেছে। 

পৃথিবীর সর্বত্রই  একবাক্যে মেনে নেয় যে, কিলিমাঞ্জারো ও চাগা জাতি যেন একে অপরের হাত ধরে চলা এক ইতহাসের নাম।  

১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভূক্ত করা হয় তানজানিয়া তথা আফ্রিকার অন্যতম গৌরব কিলিমাঞ্জারোকে। এছাড়া এই পর্বত অঞ্চল বিরল প্রজাতির বৃক্ষ জন্মায় যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এজন্য ২০০৫ সালে পর্বত পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলকেও ঐতিহ্যের অংশবিশেষ করা হয়েছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি