যে জনগোষ্ঠীর পুরুষদের বিয়ে বল্গা হরিণের সংখ্যার উপর নির্ভর করে 

যে জনগোষ্ঠীর পুরুষদের বিয়ে বল্গা হরিণের সংখ্যার উপর নির্ভর করে 

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০১:২২ ৬ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ০১:৫৪ ৬ ডিসেম্বর ২০২১

যে জনগোষ্ঠীর পুরুষদের বিয়ে বল্গা হরিণের সংখ্যার উপর নির্ভর করে। ছবি: সংগৃহীত

যে জনগোষ্ঠীর পুরুষদের বিয়ে বল্গা হরিণের সংখ্যার উপর নির্ভর করে। ছবি: সংগৃহীত

মঙ্গোলিয়ার খভসগল প্রদেশে বাস করছে এমন এক জনগোষ্ঠী যাদেরকে বলা হয় 'দুখা'। এই মানুষদের নিয়ে বাংলা ভাষায় কোনো নিউজ বা আর্টিকেল কোনো কিছুই লেখা হয়নি আজ পর্যন্ত। দুখারা 'সাটানস' নামেও পরিচিত। এরা মূলত তুর্কি জাতির অন্তর্গত একটি মঙ্গোলিয়ান উপজাতি। যেখানে অনবরত তুষারপাত হয় আর শত শত মাইল জুড়ে বিস্তৃত সমভূমি এবং গহীন অরণ্যে ঘেরা বরফের রাজ্য, সেখানেই দুখারা বসবাস করে আসছে হাজার বছর ধরে।

গহীন অরণ্যে বাস করে দুখারা দুখাদের বেঁচে থাকার বিষয়টি কিছু প্রাণীর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এখানকার মানুষদের জীবনপ্রবাহ যেমন আলাদা, তেমনি এখানে রয়েছে কিছু বিচিত্র প্রাণী। এখানে রয়েছে পৃথিবীর বিখ্যাত এক হরিণ জাত প্রাণী। যাকে বল্গা হরিণ বলা হয়ে থাকে। এই প্রাণীটি দুখাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে বল্গা হরিণ যেন পরম বন্ধুর দায়িত্ব পালন করে থাকে। পরিবারের প্রত্যেকেই এই বল্গা হরিণে আরোহণ করে ছোট বড় সব পথ পাড়ি দিয়ে থাকে। এমনকি শিশু ও বৃদ্ধারাও সওয়ারি হয় এই বল্গা হরিণে। এছাড়াও মালামাল পরিবহনেও বল্গা হরিণই প্রধান বাহন হিসেবে কাজ করে থাকে। 

আবার বল্গা হরিণের দুধ ও মাংস দুখাদের দৈনন্দিন খাবারের প্রধান উৎস। দুধ দিয়ে দই ও পনিরসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরি করে দুখা নারীরা। দুখা পুরুষদের বিয়ে বল্গা হরিণের সংখ্যার উপর নির্ভর করে। যে পুরুষের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বল্গা হরিণ থাকবে, সে সবচেয়ে সুন্দরী ও ধনী পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করতে পারে। তাবুর ভিতরের অংশ গরম রাখতেও বল্গা হরিণের চামড়া জড়িয়ে দেয়া হয় তাবুর উপরে। সুতরাং এই প্রাণীটি তাদের জীবনের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে আছে তা সহজেই বোঝা যায়। 

 তাবুর ভিতরের অংশ গরম রাখতেও বল্গা হরিণের চামড়া জড়িয়ে দেয়া হয় তবে শুধু বল্গা হরিণই নয়, পরিবহনের জন্য এরা ঘোড়া ও গাধাও ব্যবহার করে থাকে কোনো কোনো সময়। জানিয়ে রাখা ভালো, মঙ্গোলিয়ার ঘোড়া পৃথিবীর মধ্যে বিখ্যাত। অন্য জাতিদের কাছে ঘোড়া প্রধান বাহন হলেও দুখারা বেশিরভাগ সময় বল্গা হরিণই ব্যবহার করে। ভারী মালামাল পরিবহনে দুখারা এক ধরনের স্লেজ ব্যবহার করে থাকে। ফলে হরিণদের কষ্ট একটু হলেও লাঘব হয়। 

দুখাদের উৎপত্তি ও আদি নিবাস সাইবেরিয়ার টুভা প্রদেশে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের প্রাণী ও অস্তিত্ব হারানোর ভয়ে তারা মঙ্গোলিয়ার খভসগোল প্রদেশে চলে আসে। শীতকালে এখানকার তাপমাত্রা শূন্য থেকে মাইনাস ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত নিচে নেমে যায়। তাই এসময় চারপাশে ধবধবে সাদা বরফ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না। 

চারপাশে ধবধবে সাদা বরফ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাওয়া যায় নাদুখাদের বাসগৃহ বলতে তাবু ছাড়া কিছুই নেই। চিকন কাঠ জাতীয় গাছ আর প্রাণীর চামড়া দিয়ে বানানো হয় দুখাদের বাসস্থান। তাবু তৈরিতে প্রায় ২৫ থেকে ৩২টি গাছের পাকা শ্বাস ব্যবহার করে তারা। আর এই তাবুর অভ্যন্তরেই রান্না, ঘুমসহ যাবতীয় কাজ করে তারা। বাবা, মা, সন্তানসহ সবাই একত্রে বাস করে এক তাবুতেই। 

দুখাদের পোশাক অন্যান্য সাধারণ মঙ্গোলিয়ানদের মতোই। মঙ্গোলিয়া যেহেতু অত্যন্ত শীতলতম স্থান, তাই এদের গরম পোশাক পরিধান করতে হয় সবসময়। সাধারণ কাপড়ের উপর একটি মোটা কোর্ট পরিধান করে সবাই। মাথায় থাকে পশমি হ্যাট এবং পায়ে থাকে বেশ শক্ত জাতীয় বুট। এই জাতির মানুষেরা তুর্কিয় জাত ভাষা দুখান ও মঙ্গোলিয়ান ভাষায় কথা বলে।

মাথায় থাকে পশমি হ্যাট এবং পায়ে থাকে বেশ শক্ত জাতীয় বুট সাইবেরিয়ায় গভীর অরণ্য আর চীনেও একই ধরনের কিছু হরিণপালক যাযাবর জাতি রয়েছে। তবে তাদের জীবন জীবিকার মান দুখাদের চেয়ে খানিকটা উন্নত। রাশিয়ান হরিণপালক যাযাবররা স্টিলের তৈরি গরম কেবিন বা ক্যারাভ্যানের মধ্যে বসবাস করে। এগুলোকে ইচ্ছামতো স্থানান্তরও করা যায়। আবার চাইনিজ ও রাশিয়ান হরিণপালকদের অনেকেই যাযাবর জীবনের পরিবর্তে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছে। পক্ষান্তরে মঙ্গোলিয়ান দুখারা যেন ভূমিহীন দুঃখীর মতোই জীবনযাপন করছে এখনো। 

দুখাদের মাসিক আয়ের পুরোটাই আসে পর্যটকদের কাছ থেকে। পশু বিক্রি থেকে বড় অংকের আয় হলেও পর্যটকদের সঙ্গে ছবি ওঠা আর ভিডিও ধারণের ফি থেকেও বেশ ভালো আয় রোজগার করে থাকে তারা। দুখাদের সঙ্গে একটি ছবি উঠাতে চাইলে আপনাকে গুণতে হবে পাঁচ হাজার মঙ্গোলিয়ান তুগরিক, যা টাকার হিসেবে দাঁড়ায় প্রায় ২০০ টাকার কাছাকাছি আর ভিডিও ধারণের জন্য গুণতে হয় আরো বেশি। সব মিলিয়ে একেকজন দুখা প্রতিমাসে প্রায় ২০০ মার্কিন ডলার থেকে ৩৩০ মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৮ হাজার টাকা আয় করে থাকে। 

দুখাদের সঙ্গে একটি ছবি উঠাতে চাইলে আপনাকে গুণতে হবে পাঁচ হাজার মঙ্গোলিয়ান তুগরিকসাম্প্রতিককালে মঙ্গোলিয়ান সরকার তাদের উপর কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এছাড়াও খভসগল প্রদেশে সোনার খনি আবিষ্কৃত হওয়ায় সরকার তাদেরকে সরিয়ে দিতে উদগ্রীব হয়ে পড়েছে। এরকম নানা কারণে দুখা জনগোষ্ঠী এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। মাত্র ৪০টি পরিবার মিলে প্রায় এক হাজার দুখা রয়েছে সেখানে। 

বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ও ফিল্মমেকার হামিদ সরদারের লেখা বই 'ডার্ক হ্যাভেন্স' এ উঠে এসেছে বিলুপ্তপ্রায় এই দুখা জাতি ও স্থানীয় প্রাণীদের নানা অজানা ইতিহাস। তার মতে, কিছুকাল আগেও সেখানে কমপক্ষে ২০০ পরিবার ছিল। যারা এই কষ্টের যাযাবর জীবন ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও অবশিষ্ট দুখারা প্রতিবছর পাঁচ থেকে আটবার তাদের শিবির পরিবর্তন করে থাকে। 

বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ও ফিল্মমেকার হামিদ সরদারের লেখা বই `ডার্ক হ্যাভেন্স` এ উঠে এসেছে বিলুপ্তপ্রায় এই দুখা জাতি ও স্থানীয় প্রাণীদের নানা অজানা ইতিহাসবাণিজ্যিক ও প্রাকৃতিক কারণেই এই অত্যন্ত কষ্টের পথ পাড়ি দিতে হয় দুখাদের। যে মৌসুমে যেখানে পর্যটক আসে, দুখারা মূলত সেখানেই তাদের তাবু গেড়ে থাকে। এছাড়াও বল্গা হরিণের প্রজননের সঠিক আবহাওয়া পেতে ও নেকড়ে বাঘের হাত থেকে বাঁচতেও স্থান পরিবর্তন করে তারা। এক স্থান হতে অন্য স্থানে পৌঁছাতে আট থেকে দশ দিনেরও বেশি সময় লাগে। কারণ দুরুত্ব তো আর সামান্য নয়। 

২০০ কিলোমিটার থেকে ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নতুন স্থানে তাবু গাড়তে হয় দুখাদের। মাত্র এক থেকে দেড় মাস পরপর অবস্থান পরিবর্তন করতে হয় তাদের। আর এভাবে স্থানান্তর এবং পশুপালন করেই কেটে যায় দুখা নামের দুঃখী মানুষদের জীবন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ