যেভাবে গৃহপালিত হয়ে উঠল গয়াল

যেভাবে গৃহপালিত হয়ে উঠল গয়াল

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫১ ৫ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৫:৫৬ ৫ ডিসেম্বর ২০২১

পার্বত্য বনাঞ্চলের গহীন অরণ্যের প্রাণী গয়াল। ছবি : সংগৃহীত

পার্বত্য বনাঞ্চলের গহীন অরণ্যের প্রাণী গয়াল। ছবি : সংগৃহীত

পার্বত্য বনাঞ্চলের গহীন অরণ্যের প্রাণী গয়াল বা বন গরু। পাহাড়িদের কাছে এই প্রাণীটির মাংসের বেশ কদর রয়েছে। দেশে এখন সমতলভূমিকেও গয়াল পালন শুরু হয়েছে। অনেকে বাণিজ্যিকভাবে বা খামার করেও বুনো এই গরুটি পালন করতে শুরু করেছেন। কোরবানির সময়ে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, চট্টগ্রামের হাটগুলোয ছাড়াও অনেক অঞ্চলেই এই প্রাণীটি দেখা যাচ্ছে।

গয়াল যেভাবে বন্য থেকে গৃহপালিত হয়ে উঠেছে সে বিষয়ে জেনে নেওয়া যাক।

প্রাণীবিদদের মতে, গয়াল বন্য গরুর একটি প্রজাতি। বাংলাদেশে এটি ‘চিটাগং বাইসন’ নামেও পরিচিত। ভারতে একে ডাকা হয় মিথুন নামে। ইংরেজি গাউর নামে যে বনগরুকে বর্ণনা করা হয়, তা থেকে কিছুটা ভিন্ন প্রজাতির গয়াল। বাংলাদেশের পাহাড়ি বনাঞ্চল ছাড়াও ভারতের উত্তর-পূর্ব এলাকা, মিয়ানমার, চীনের ইয়ুনান প্রদেশে গয়াল দেখা যায়।

১৯৬৪ সালেও এই প্রাণীটি ছিল বন্য প্রাণীর তালিকাভুক্ত। তবে এর আগে থেকেই পাহাড়ি বাসিন্দারা মাংসের জন্য গয়াল শিকার করতেন। অনেক গ্রামের বাসিন্দারা গয়াল ধরে লালনপালনও করতেন। গয়াল লবণাক্ত মাটি খেতে পছন্দ করে। এটি ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে বন থেকে গয়াল ধরা হতো। ১৯৬৪ সাল থেকে গয়ালকে বুনো প্রাণীর তালিকা থেকে সরিয়ে গবাদি পশু হিসেবে গণ্য করা হয়।

সেই সময় পার্বত্য অঞ্চলে গয়ালের ভালো বিচরণ ছিল। কিন্তু তখন ফাঁদ পেতে গয়াল ধরে চোরাই পথে বিক্রি হতো। এরপর পরিবেশ অধিদফতর এটিতে গৃহপালিত পশু হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু বন থেকে ওইভাবে গয়াল নিয়ে এসে লালন-পালন করার খুব বেশি প্রচলন ছিল না। পাহাড়ি জেলাগুলোর কিছু গ্রামের বাসিন্দারা নিজেদের জন্য গয়াল পালন করতেন। তবে সমতলে এই প্রাণীটি খুব একটা আসত না।

পার্বত্য এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাহাড়ি বাসিন্দারা পাঁচ থেকে ১০টা করে গয়াল পালন করেন। এগুলো সেখানে মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়। তবে কে কোনটার মালিক, তার চিহ্ন দেওয়া থাকে। মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়ানোর কারণে এগুলোর বুনো স্বভাব থেকে যায়, পুরোপুরি গৃহপালিত হয় না।

বিক্রির উপযোগী হলে লবণের ফাঁদ দিয়ে গয়াল ধরে বিক্রি করা হয়। ব্যবসায়ীরা কয়েকদিন ধরে নানা পাহাড় ডিঙিয়ে জনপদে নিয়ে এসে গয়াল বিক্রি করেন।  গয়ালের মাংসে গরুর মাংসের মতো চর্বি থাকে না। মাংসও বেশ সুস্বাদু। চট্টগ্রাম এলাকায় মূলত ওরস, মেজবানি বা বড় অনুষ্ঠানে গয়াল খাওয়ানো হয়ে থাকে। এভাবেই দেশজুড়ে গয়াল খাওয়ার প্রচলন সৃষ্টি হয়। সারা দেশেই গয়ালের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ে।

জানা যায়, দুই দশক ধরে কয়েকজন খামারি নিজেদের উদ্যোগে পাহাড়ি গ্রাম থেকে গয়াল নিয়ে এসে পালন করতে শুরু করেন। পাহাড় থেকে আনার পর এসব গয়াল পোষ মানাতে বেশ সময় লাগে। তবে আস্তে আস্তে অন্য পোষা গয়াল ও গরুগুলোর সঙ্গে মিশে সেগুলো শান্ত হয়ে ওঠে। বর্তমানে কুমিল্লা, ফেনী, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামে অনেক খামারি ব্যক্তি উদ্যোগে গয়াল পালন করতে শুরু করেছেন।

অনেকটা গরুর মতো দেখতে হলেও সাধারণ সমতলের গরু বা মহিষের সঙ্গে গয়ালের অনেক পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য এই প্রাণীটি আকারে অনেক বড় হয়, মাংসের পরিমাণ অনেক হয়। তবে গয়াল থেকে দুধ দোয়ানো যায় না।

বাংলাদেশের দেশি গরুর ওজন সাধারণত ২০০ থেকে ৪০০ কেজির মধ্যে থাকে, মহিষের ওজন হয় ৫০০ বা ৬০০ কেজি পর্যন্ত। কিন্তু একেকটি গয়ালের ওজন হতে পারে ৪০০ থেকে ৯০০ কেজি পর্যন্ত। গঠনের দিক থেকে শিং গোড়া থেকে অনেক মোটা, লম্বা হয়। পিওর ব্রিড গয়ালের পুরো শরীর কালো বা বাদামি হলেও পায়ের নীচের অংশে সাদা দাগ থাকে। গয়ালের প্রজননে ১০ থেকে ১১ মাস লাগে। একেকটি গয়াল ১৫ থেকে ১৬ বছর বাঁচে। ঘাস, পাতা, খড় ইত্যাদি খেয়ে থাকে। তবে গয়াল থেকে দুধ পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র মাংসের জন্যই গয়ালের লালনপালন করা হয়ে থাকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি