২২ এপ্রিল ১৯৭১: ‘পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রাম পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার হতে পারে না’

২২ এপ্রিল ১৯৭১: ‘পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রাম পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার হতে পারে না’

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১০:২৮ ২২ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১০:৩১ ২২ এপ্রিল ২০২১

১৯৭১ সালের পূর্ব বাংলার এই সংগ্রাম ছিল মুক্তির সংগ্রাম

১৯৭১ সালের পূর্ব বাংলার এই সংগ্রাম ছিল মুক্তির সংগ্রাম

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রাম পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার হতে পারে না। অবিভক্ত ভারতের ১০ কোটি মুসলমান যে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তান তাকে অবজ্ঞা করেছে। পাকিস্তান আন্দোলনের এই মৌলিক প্রস্তাবটিকে অবজ্ঞা করে বিগত ২৩ বছর ধরে তারা পূর্ব বাংলাকে তাদের কালোনী করে রাখে। এই সংগ্রাম বীর বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম। শোষণ থেকে মুক্তি ও হৃত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের লড়াই। 

মওলানা ভাসানী নবগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীন সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য বিশ্বের সকল শান্তিকামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকার ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি দলমত, পেশা, বয়স নির্বিশেষে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম ম্যাকমোহন ক্যানবারায় বলেন, জীবনহানির জন্য আমরা নিশ্চয়ই দুঃখিত। আমরা চাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করুন, যত শিগগির সম্ভব তিনি বেসামরিক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করবেন এবং তা প্রতিষ্ঠা করবেন। আমরা আশা করি আর কোনো জীবন হানি হবে না এবং পাকিস্তানের পার্লামেন্টে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃবর্গকে ক্ষমতা দেয়া হবে।

মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রাম পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার হতে পারে না
কুমিল্লার গঙ্গাসাগরে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সৈন্যদের অ্যামবুশ করে। এ অ্যামবুশে ৬ জন পাকসৈন্য নিহত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা প্রচুর পরিমাণে গোলাবারুদ ও অস্ত্র দখল করে। হিলিতে পাকবাহিনী আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সীমান্ত রেখার অভ্যন্তরে আশ্রয় নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর প্রচন্ড আক্রমণ করে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোদাগাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহে পাকবাহিনী হামলা চালায়। এখানে পাকহানাদারদের বিরাট কনভয় আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে। এ সংঘর্ষে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ বরণ করে। পাক হানাদারদের হাতে বগুড়া শহরের পতন ঘটে। পাকবাহিনী বাঘাবাড়িতে এসে শাহজাদপুর লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ শুরু করে। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষের পর বাঘাবাড়ি ও শাহজাদপুর পাকবাহিনীর হাতে পতন হয়।

পাকহানাদার বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে মাদারীপুর শহরের ওপর গোলাবর্ষণ শুরু করে। তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্যস্থল ছিল সংগ্রাম কমিটির কন্ট্রোল রুম মিলন সিনেমা হল। এ হামলায় কেউ নিহত না হলেও অনেক নিরীহ মানুষ আহত হয়। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লা এই তিনদিক থেকে পাকবাহিনী একযোগে ফেনী আক্রমণ করে। এবারের যুদ্ধেও পাকসেনারা ফেনী দখল করতে ব্যর্থ হয়।

পাকবাহিনী সারাদেশেই তাণ্ডব চালাচ্ছে রাজশাহী থেকে সড়কপথে পাকবাহিনীর একটি কনভয় ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অবস্থায় নওগাঁ প্রবেশ করে। রাতে পাকবাহিনীর নির্দেশমত পাকিস্তানকে রক্ষা করার লক্ষ্যে ‘শান্তি কমিটি’ গঠন করা হয়। নওগাঁ শহরের লর্ড লিটন ব্রিজের পূর্ব পাশে চকবাড়িয়া গ্রামের ১৯ বছর বয়সি আকালু পাকিস্তান বাহিনীর সামনে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান উচ্চারণ করতে করতে ঘাতকদের গুলিতে শাহাদাৎ বরণ করেন। অন্য এক ঘটনায় নওগাঁ নাট্যাঙ্গনের বালা সাহা (৮০) তার নিজ বাসভবনে পাকবাহিনীর গুলিতে শহিদ হন।

ময়মনসিংহের মধুপুরে পাকবাহিনী ব্যাপক শেলিং শুরু করে। এ আক্রমণে মুক্তিবাহিনী পিছু হটে হালুয়াঘাটে একত্র হয় ও অবস্থান নেয়।
চট্টগ্রামের দোহাজারীতে মুক্তিবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে দখল প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয়। ময়মনসিংহ জেলা ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি মুহম্মদ আশরাফ হোসাইনের নেতৃত্বে জামালপুর শহরে প্রথম আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। পরবর্তীকালে বদর বাহিনী জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব বাহিনীতে রূপ নেয়। বদর বাহিনীর নিষ্ঠুরতা সীমাহীন। এর চিত্র ফুটে উঠে তাদের এক পত্রিকার লেখায়- ‘আলবদর একটি ন্যায়! একটি বিস্ময়! আলবদর একটি প্রতিজ্ঞা! যেখানে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী, আলবদর সেখানে। যেখানেই দুষ্কৃতকারী (মুক্তিযোদ্ধা) আলবদর সেখানেই। ভারতীয় চর কিংবা দুষ্কৃতকারীদের কাছে আলবদর সাক্ষাৎ আজরাইল।’

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে