রঙিন যুগেও গণ্ডগ্রাম ছিল আভিজাত্যের গুলশান

রঙিন যুগেও গণ্ডগ্রাম ছিল আভিজাত্যের গুলশান

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৫৭ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৮:৪৫ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

রঙিন যুগেও গণ্ডগ্রাম ছিল আভিজাত্যের গুলশান-ছবি: পিয়ার ক্যান্টিন।

রঙিন যুগেও গণ্ডগ্রাম ছিল আভিজাত্যের গুলশান-ছবি: পিয়ার ক্যান্টিন।

গুলশানের নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে আভিজাত্যের ছোঁয়ায় বড় বড় ভবন, দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি ও বিলাসবহুল জীবন। এর চারপাশে উন্নয়ন দেখে কখনোই মনে হবে না যে, এ গুলশানই এক সময় ছিল নিতান্তই গণ্ডগ্রাম। আর সেই নিতান্তই গণ্ডগ্রামের দৃশ্য হয়তো অনেকেই জানেন না। তবে ১৯৭৭ সালে গুলশান থেকে বাড্ডাগামী সড়কের একটি ছবি তার প্রমাণ বহন করছে।

সেই সময়ে ছবিটি তুলেন কানাডিয়ান জুডোকা (জুডো প্রতিযোগী) জিন পিয়ার ক্যান্টিন। তখন ছিল শীতকাল। তার ছবি সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। ওই ছবিতে ১৯৭৭ সালে গুলশান এলাকার চিত্র ফুটে উঠেছে। 

ছবির চিত্র অনুযায়ী, গুলশান থেকে বাড্ডাগামী সড়ক ছিল কাচা। মাটির সড়কের পাশে ছিল কয়েকটি খাম্বা, যেখানে বিদ্যুতের লাইন নেয়া হয়েছে। আর পাশে খাম্বার নিচে বসে আছেন দুই শিশু। সড়কের দুই ধারে রয়েছে নিচু জমি। ঠিক যেন ডোবা। ছবির ডান পাশের একটি শুকনো ডোবায় ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। বাম পাশের ডোবায় রয়েছে পানি। ছবিতে এক শ্রমিককে মাথা দিয়ে ইট বহন করতে দেখা গেছে। আর আরেক ব্যক্তিকে মাথা দিয়ে ঝুড়ি বহন করছেন, যাতে রয়েছে ফুলকপি। আর ওই ব্যক্তি পাশে বাজারের ব্যাগ নিয়ে আরেক ব্যক্তি হাঁটছেন। মনে হচ্ছে, তারা দুইজনই বাজারগামী।

বাড্ডা-গুলশান সড়কের মাঝে কোনো কাল্ভার্ট ছিল না। তাই বাঁশের মাচা বানিয়ে মানুষ যাতায়ত করছেন। এ ছবিতেই গুলশান ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকা হওয়ার ইঙ্গিত মেলে। নিতান্ত গ্রামে ৭৭ সালে শুরু হয় ভবন নির্মাণ; যা শ্রমিকদের ইট বহনই ইঙ্গিত দেয়। এমনকি ওই কাঁচা সড়কের পাশে বিশাল স্তুপের পাথর রাখা হয়েছিল। বড় দালান কোটা নির্মাণেই এতো পাথর প্রয়োজন হয়েছিল । 

গুলশানের আদি কথার সংক্ষিপ্ত বিবরণ

গুলশানের আদি নাম ছিল ভোলা। যদিও বরিশালের একটি জেলার নাম ভোলা। তবে সেই ভোলার সঙ্গে গুলশানের ভোলার মিল থাকার যোগসূত্র ছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে গুলশানের আদি নাম ভোলা সেটির প্রমাণ বহন করছে দক্ষিণ বাড্ডায় স্থানান্তরিত ভোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

এক সময় গুলশান কৃষিপ্রধান এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। ধান, সবজি, আঁখ, মাছসহ অনেক কিছুই চাষ করা হতো এখানে। আর এখানে যারা চাষবাদ করতেন, তাদের বেশিরভাগ লোক এসেছিলেন ভোলা থেকে। এ কারণেই ঢাকা শহরের মানুষদের মুখে মুখে গ্রামটি ‘ভোলা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

যেভাবে রূপ বদলায় ভোলা

সন্ধ্যা নামলেই ভোলা গ্রামে শেয়াল ডাকতো, ঝিঁ-ঝিঁ পোকার আওয়াজ শোনা যেত। এই গ্রামের বনে-জঙ্গলে দেখা মিলতো মেছো বাঘের। হঠাৎ বিত্তবানদের নজরে আসে এলাকাটি। তাই নাম বদল করে সেখানে গড়ে তোলা হয় আধুনিক উপশহর। অবশেষে এলাকাটির নাম রাখা হয় গুলশান; যার বাংলা অর্থ ‘ফুলের বাগান’। পাকিস্তানের করাচিতে থাকা গুলশান নামের অভিজাত এলাকার সঙ্গে মিল রেখে মূলত গুলশান নামকরণ করা হয়। 

১৯৬১ সাল নাগাদ ভোলা গ্রামটিকে অধিগ্রহণ করে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রকল্পটি হাতে নেন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) এর প্রথম চেয়ারম্যান পাকিস্তানি আমলা জি এ মাদানিভ। এরপর মোটা অংকের টাকায় একে একে বহুতল ও বিলাসবহুল অসংখ্য ভবন উঠাতে থাকেন বিত্তবানরা।

গুলশানের নতুন রূপ 

গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, অতঃপর পৌরসভায় পরিণত হয়। ১৯৭২ সালে গুলশানসহ আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত হয় গুলশান থানা। তবে ঢাকা পৌরসভার সঙ্গে যুক্ত হতে গুলশানকে অপেক্ষা করতে হয় ১৯৮২ সাল পর্যন্ত। তবে শুরুর গুলশান আর আজকের গুলশানের আকাশ-পাতাল তফাৎ। নিরিবিলি, ছিমছাম একটি এলাকাটি অভিজাত মানুষদের মন কেড়েছিল। এখন গুলশানের সড়কে হ্যামার, রেঞ্জ রোভার, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, টয়োটা প্রিমিও কিংবা রোলস রয়েসের মতো বিলাসবহুল গাড়িই চোখে পড়ে। আর ঘর-বাড়ির চেহারা এখানকার অধিবাসীদের আর্থিক সামর্থ্যের দিকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ