বিস্ময়কর এক ঘোড়া, যে কোনো অংকের সমাধান দিত মুহূর্তেই!

বিস্ময়কর এক ঘোড়া, যে কোনো অংকের সমাধান দিত মুহূর্তেই!

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১০:৪৪ ১ জুন ২০২০   আপডেট: ১০:৫৪ ১ জুন ২০২০

ছবি: অংক জানা ঘোড়া!

ছবি: অংক জানা ঘোড়া!

প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তার কথা অনেকেরই জানা। তবে অংক জানা প্রাণীর কথা শুনলে অবাক হতেই হয়! কথা বলতে কিংবা লিখতে না পারলেও আকার ইঙ্গিতে অংকের সমাধান দিতে জানত একটি ঘোড়া। বিস্ময়কর বুদ্ধিসম্পন্ন এই প্রাণীটি সম্পর্কেই আজকের লেখা। 

জার্মানের একটি ঘোড়ার নাম ছিল ক্লেভার হ্যান্স। প্রশিক্ষক উইলহেলম ভন ওস্টেন এই ঘোড়াটিকে বেশ কয়েকটি জ্ঞানভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। ভন ওস্টেন ঘোড়াটিকে প্রশ্ন করলে সে মাথা নাড়িয়ে সঠিক উত্তর জানিয়ে দিতে পারত। 

ক্লেভার হ্যান্স প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন করেছিল। সে দিক চিনতে পারত। ডান ও বামের মধ্যে পার্থক্য করার সক্ষমতা ছিল ঘোড়াটির। রং শনাক্ত করা, ঘড়ির সময় নির্দেশ করা, কার্ড খেলা এবং অনেকগুলো ভিন্ন বস্তুর পার্থক্য করা শিখেছিল ঘোড়াটি।  

এই সেই ঘোড়াটিক্লেভার হ্যান্সের গণিতের দক্ষতা শুধু সংখ্যা গণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সে মৌলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি পাটিগণিতেরও সমাধান করতে পারত। অবশ্য এগুলোর সব কিছুই তার প্রশিক্ষকের ইঙ্গিতের মাধ্যমে প্রকাশ করত ঘোড়াটি। ক্লেভার হ্যান্স যোগ, বিয়োগ, গুন, ভাগ ছাড়াও বর্গমূল পর্যন্ত নির্ণয়ের ইঙ্গিত করতে পারত। 

পাটিগণিতের পাশাপাশি ঘোড়াটি মানুষের নামসহ মাসের নামগুলোও জানত। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল হ্যান্স পুরো বর্ষপঞ্জী স্মরণ রাখতে পারত। প্রশিক্ষক ভন ওস্টেন জিজ্ঞাসা করলে দিন ও তারিখ নির্দেশ করতে পারত হ্যান্স। ঘোড়াটির বহুমুখী দক্ষতার মধ্যে আরো ছিল সুর চিনতে পারা, ফটোগ্রাফের লোককে চিনতে পারা, সময় নির্ণয় এমনকি সঠিকভাবে রং নির্ণয় করতে পারত। 

মনিবের সব প্রশ্নের জবাব সে আকার ইঙ্গিতে দিতস্বাভাবিকভাবেই ঘোড়াটি সম্পর্কে মনোবিজ্ঞানী, প্রাণীবিদ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের কৌতূহল জাগ্রত হয়। সময়টি ছিল ২০ শতকের শুরুর দিকের। তখন প্রাণীদের জ্ঞানভিত্তিক বিষয় নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি। সে সময় একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত ছিল, প্রাণী নৃতাত্ত্বিক বুদ্ধি প্রদর্শন করতে অক্ষম। 

১৯ শতকের একজন ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী সি লয়েড  মার্গান মতামত প্রকাশ করেছিলেন, কোনো ক্ষেত্রেই প্রাণীদের ক্রিয়াকলাপ উচ্চতর মানসিক প্রক্রিয়াগুলোর সঙ্গে ব্যাখ্যা করার মতো নয়। প্রাণীদের দক্ষতা বিচারের ক্ষেত্রে মর্গানের তত্ত্ব মর্গান ক্যানোন হিসেবে পরিচিত। যা তুলনামূলক প্রাণী মনোবিজ্ঞানের একটি মৌলিক প্রজ্ঞা। 

বিজ্ঞানীরা অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে ঘোড়াটি নিয়েক্লেভার হ্যান্স এবং তার প্রশিক্ষক ভন ওস্টেন সে সময় গণমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছেছিল। ঘোড়াটির বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে ভন ওস্টেনের দাবিগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অনুসন্ধানের জন্য জার্মান শিক্ষা বোর্ড একটি কমিশন গঠন করেছিল। এই কমিশন ঘোড়াটির নামানুসারে হ্যান্স কমিশন নামে পরিচিত। হ্যান্স কমিশনে একজন পশুচিকিৎসক, একজন সার্কাস ম্যানেজার, অশ্বারোহী কর্মকর্তা, বেশ কয়েকজন স্কুল শিক্ষক এবং বার্লিন প্রাণী উদ্যানের পরিচালক ছিলেন। 

পরীক্ষার পর কমিশন ১৯০৪ সালে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত জানায়, ক্লেভার হ্যান্সের দক্ষতা ছিল আসল। তার জ্ঞানমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে কোনো কৌশল জড়িত ছিল না। তবে এই ধারণা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯০৭ সালে একটি আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার পর মনোবিজ্ঞানী ওস্কার ফুংস্ট প্রমাণ করেছিলেন, ঘোড়াটি আসলে এই মানসিক কাজ সম্পাদন করত না, সে মূলত তার প্রশিক্ষকের প্রতিক্রিয়া অনুসরণ করত। 

মনিবের সঙ্গে ঘোড়াটিমনোবিজ্ঞানী ওস্কার ফুংস্টের আবিষ্কার করেছিলেন ঘোড়াটি তার মানব প্রশিক্ষকের শারীরিক ভাষায় অনৈচ্ছিক ইঙ্গিতগুলোতে সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানাত। যার মধ্যে সমস্যা সমাধানের মূল অনুষঙ্গ বিদ্যমান ছিল। প্রশিক্ষক পুরোপুরিই অসচেতন ছিলেন যে, তিনি এই জাতীয় সংকেত সরবরাহ করছিলেন। তার এই গবেষণা ক্লেভার হ্যান্স ইফেক্ট হিসেবে পরিচিত। যা পরবর্তী সময়ে প্রাণীদের জ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

এই গবেষণার পর ঘোড়াটির যথার্থতা কমে গেলেও জনপ্রিয়তা কমেনি। তার মালিক যেখানেই শো প্রদর্শন করতেন সেখানে মানুষের ভিড় জমত। তিনি পুরো জার্মান জুড়ে শো প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছিলেন। ভন ওস্টেন কখনো এই প্রদর্শনীর জন্য কোনো অর্থ নিতেন না। তিনি প্রকৃতপক্ষে ক্লেভার হ্যান্সের অপ্রতিম বুদ্ধিমত্তায় বিশ্বাসী ছিলেন। 

প্রশিক্ষক উইলহেলম ভন ওস্টেন ১৯০৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর কয়েকবার ঘোড়াটির মালিকানা পরিবর্তন হয়েছিল। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ঘোড়াটি সামরিক ঘোড়া হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে তার ভাগ্যে কি ঘটেছিল তা সবারই অজানা। তবে অনেকেই মনে করেন, ১৯১৬ সালে ঘোড়াটি মারা যায়।  

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস