করোনাভাইরাসে মৃত্যু হলো এক মাতৃভাষার!

করোনাভাইরাসে মৃত্যু হলো এক মাতৃভাষার!

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৫১ ২৯ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:০৫ ২৯ মে ২০২০

ছবি: লিচোই শেষ উত্তরাধিকারী ছিলেন সারে ভাষার

ছবি: লিচোই শেষ উত্তরাধিকারী ছিলেন সারে ভাষার

নানান দেশের নানা ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা? রামনিধি গুপ্তের এই কবিতাংশ কেবল আমাদের নয়, বিশ্বের প্রতিটি মাতৃভাষাভাষী মানুষের কাছেই প্রকৃত সত্য। 

মাতৃভাষায় কথা বলার পাশাপাশি দাফতরিক কাজে ব্যবহৃত হয় ভাষা। দেশ বা অঞ্চল ভেদে রয়েছে বিচিত্রসব মাতৃভাষা। পৃথিবীতে বহু ভাষা রয়েছে যেগুলোর নাম হয়ত খাতা কলমে নেই! যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা এসআইএল (সামার ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুইস্টিক্স) এর গবেষণায় জানা যায়, পুরো দুনিয়ায় ভাষার সংখ্যা ছয় হাজার ৯০৯। 

এই হিসাব অবশ্য ২০০৯ সালের। এছাড়াও অনেক ভাষা লুকিয়ে রয়েছে, অনেক ভাষা বিলুপ্তপ্রায়, আবার অনেক ভাষা বদলাতে বদলাতে অন্য রকম হয়ে গেছে, অনেক ভাষায় হয়তো কথা বলেই গুটিকয়েক মানুষ। যেমন পাপুয়া নিউগিনি ভাষা সেখানে জনসংখ্যা ৪০ লাখেরও কম, অথচ সেখানে ভিন্ন ভাষা রয়েছে ৮৩২টি! 

সন্তান কোলে লিচোএছাড়াও সারে ভাষা, যার কথক মাত্র চার জন। এর মধ্যে লিচো নামের এক নারীই ছিলেন এই ভাষার শেষ উত্তরাধিকারী। তিনি ছিলেন রাজা জিরাকের প্রথম সন্তান। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা ও ভাষার উত্তরাধিকার বহন করছিলেন তিনি। গ্রেট আন্দামানিজ ভাষার ব্যাকরণ ও অভিধান তৈরিতে তার অবদান রয়েছে। 

উপজাতির মধ্যে অন্যতম বুদ্ধিমান নারী ছিলেন তিনি। কাজ করেছেন আন্দামান ও নিকোবর দীপপুঞ্জের শিক্ষা বিভাগের সঙ্গে। সারে ভাষার পাশাপাশি জেরু, পুজুক্কর, আন্দামানিজ হিন্দি ভাষাও জানতেন লিচো। সারে ভাষা মূলত এক জোড়া আন্দামানি ভাষা নিয়ে গঠিত একটি ভাষা। জোড়াটি হচ্ছে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আন্দামানি নেগ্রিট বা আন্দামানি আদিবাসীদের কথিত গ্রেট আন্দামানিজ ভাষা এবং ওগান ভাষা। 

তবে লিচোর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই ভাষার বিলুপ্ত হলো। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। যদিও পরীক্ষা করা হয়নি। বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপের পোর্ট ব্লেয়ারে বসবাস করতেন লিচো। ৪ এপ্রিল যক্ষ্মা ও হৃদরোগে ভুগে মৃত্যু ঘটে তার। মৃত্যুর কারণ কোভিড-১৯ এর লক্ষণের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, লিচো এই ভাইরাসেই মারা গেছেন। 

লিচোর ভাষা সংরক্ষিত রয়েছে১৭৭৭ সালে ইংল্যান্ডের কর্নিশ ভাষার শেষ কথক ডলি পেন্ট্রিথ মারা যান। এর মধ্য দিয়েই ওই ভাষাটির বিলুপ্তি ঘটে। ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আন্দামানের বো ভাষার শেষ কথকের মৃত্যুর সঙ্গেই হারিয়ে গেছে এ ভাষা। এবার লিচো মৃত্যুর কারণে হারিয়ে গেল সারে ভাষার অস্তিত্ব। যদিও পুস্তকে এটি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছিল। 

সাধারণভাবে ভাষার মৃত্যু একটি ধীর ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যেহেতু পৃথিবীর মাত্র চার শতাংশ লোক মোট চার হাজার ভাষা ব্যবহার করে। তাই ক্ষুদ্র বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভাষাগুলো বিপন্ন এবং মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে।করোনাভাইরাস সারাবিশ্বের মতো সুদূর আন্দামান দীপপুঞ্জেও সংক্রমণ ছড়িয়েছে। গত ২১ এপ্রিল পর্যন্ত সেখানে কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৫ জন। তার মধ্যে ১১ জন ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ ও হয়েছেন। 

যদি সেখানে কমিউনিটি সংক্রামণের মতো বিষয় ঘটে তবে দ্বীপের আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্যরা যেমন জীবন ঝুঁকিতে পড়বেন তেমনি হারিয়ে যেতে পারে তাদের মুখের কথিত ভাষাগুলোও। লিচো ছিলেন গ্রেট আন্দামানিজ ভাষা পরিবারের অবশিষ্ট চার বক্তার একজন এবং সারে ভাষার শেষ বক্তা। লিচো মৃত্যুর পর গ্রেট আন্দামানিজ ভাষা পরিবারের মাত্র তিন জন সদস্য জীবিত আছেন। 

তাদের প্রত্যেকেরই বয়স ৫০ এর উপরে, তারাও বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। সব মিলিয়ে কোভিড-১৯ এর বিস্তার নতুন করে এ মানুষগুলোর জীবন যেমন ঝুঁকিতে ফেলেছে, তেমনি তাদের ভাষাকেও বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আদিবাসী এ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যাতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। 

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস