সংক্রমণ ব্যাধি থেকে বাঁচতে অতীতেও মানা হত কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা!

সংক্রমণ ব্যাধি থেকে বাঁচতে অতীতেও মানা হত কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা!

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪৩ ২৭ মে ২০২০   আপডেট: ১৪:১৪ ২৮ মে ২০২০

ছবি: কোয়ারেন্টাইন কোয়ার্টার্স

ছবি: কোয়ারেন্টাইন কোয়ার্টার্স

মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে এখন সবাই সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার চেষ্টা করছে। কোয়ারেন্টাইনে থাকছেন নিজের এবং অন্যদের সুরক্ষায়। তবে কোয়ারেন্টাইন বা সামাজিক দূরত্ব নতুন কিছু নয়। মধ্য যুগে যখন ইউরোপ-এশিয়ায় প্লেগ এবং চিকেন পক্সের মারাত্মক প্রাদুর্ভাব হয় তখন থেকেই সামাজিক দরত্বের রীতি শুরু হয়। 

সেসময় চিকিৎসকদের ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া চিকিৎসা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। তবে তারা রোগের বিস্তার ঠেকাতে সংক্রামিত ব্যক্তিকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার পরামর্শ দিতেন। এছাড়াও অন্যদের সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে চলার জন্য সতর্ক করতেন। বিশ্বে সরকারিভাবে নথিভুক্ত প্রথম কোয়ারেন্টাইন প্রবর্তন করে দক্ষিণ ক্রোয়েশিয়ার ডুব্রোভনিক শহর। এটি অ্যাড্রিয়াটিক উপকূলে রাগুসা প্রজাতন্ত্রের একটি সক্রিয় বন্দর ছিল। 

এই বন্দরের মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে মানুষ এবং পণ্যের আদান প্রদান ছিল। ১৪ শতকে যখন ভূমধ্যসাগর ও বালকান জুড়ে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে তখন গ্রেট রিপাবলিক অব গ্রেট কাউন্সিল একটি আইন পাস করে। যার ভিত্তিতে প্লেগ-আক্রান্ত অঞ্চল থেকে আগত সমস্ত ব্যবসায়ী, নাবিক এবং মালামালকে এক মাস আলাদা রাখা হত। 

এক মাস পর যারা সুস্থ প্রমাণিত হত তাদের ক্ষেত্রেই শুধু শহরে প্রবেশের অনুমতি মিলত। ডুব্রোভনিক শহরটি তিনটি আবাসিক দ্বীপ ম্রকান, বোবারা এবং সুপিতারকে ঘিরে অবস্থিত। এই দ্বীপগুলোতে কিছু বাড়ি তৈরি করা হয়। যেখানে সবাই কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলো কাটাতে শুরু করে।

এসব ঘরেই কোয়ারেন্টাইনে থাকতেন রোগীরাএই দ্বীপগুলোতে তখন কোনো মানুষের বাস ছিল না। তাই নির্জন আর ফাঁকা দ্বীপগুলোকেই কোয়ারেন্টাইনের জন্য বেছে নেয়া হয়। মহামারির প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার কার কাঠ দিয়েই অতি দ্রুত এসব বাড়ি তৈরি করা হয়। ১৫ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে কোয়ারেন্টাইন কোয়ার্টারগুলোতে প্রহরী, পুরোহিত, নাপিত এবং ডাক্তার রাখা হয়। যদিও কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিরা সামাজিক দূরত্ব মেনেই সেখানে বসবাস করতেন। 

১৩৯৭ সালে, গ্রেট কাউন্সিল একটি নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিধানাবলী বাস্তবায়ন এবং সম্মতি তদারকি করার জন্য তিনজন স্বাস্থ্যসেবা কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। যারা তখন সামাজিক দূরত্ব এবং সরকারের বিধি লঙ্ঘন না মানত তাদের জেল-জরিমানা করা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তের মধ্যে লোকজনের বাইরে চলচলের উপরও নিষেধাজ্ঞা গ্রহণ করা হয়। 

যেটিকে আমরা এখন লকডাউন বলছি, এমনই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল সেই সময়। যদিও এই বন্দরটিই শত শত মানুষের জীবিকা নির্বাহের কেন্দ্র ছিল। তারপরও মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল তাদের। লকডাউনের ফলে নগরীতে লোকজনের চলাচল ও বন্দরে পণ্য প্রবাহ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এতে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। আর্থিক ঝুঁকির মুখে পরে দেশটি।    

কোয়ারেন্টাইনের সময় তখন ছিল এক মাস। এরপর তা বাড়ানো হয় আরো ১০ দিন, অর্থাৎ ৪০ দিন। তখন ৩০ দিনের সময়কে বলা হত ট্রেন্টাইন, আর ৪০ দিনেরটা কোয়ার্টেনা। কোয়ার্টেনা থেকেই কোয়ারেন্টাইন শব্দটির জন্ম। গবেষকরা মনে করেন, ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতেই ৩০ থেকে ৪০ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকত তারা। এক্ষেত্রে কিছু ধর্মীয় বিশ্বাস মতে ৪০ সংখ্যাটির বিভিন্ন তাৎপর্য বোঝানো হয়। 

পর্যটকদের জন্য দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত ডুব্রোভনিক শহরযেমন ইসলাম ধর্মানুসারীরা বলেন, পৃথিবীতে যে মহাপ্লাবন হয়েছিল তা ৪০ দিন এবং ৪০ রাত স্থায়ী ছিল। আবার খ্রিষ্টানদের মতে, যীশু মরুভূমিতে ৪০ দিন বিনা খাবারে কাটিয়েছেন। যুক্তি যাই হোক না কেন, ৪০ দিনের কোয়ারেন্টাইন সে সময় প্লেগের প্রকোপ কমাতে সাহায়তা করেছিল। বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনুমান অনুসারে, বুবোনিক প্লেগের সংক্রমণ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়কাল ছিল ৩৭ দিন। 

এত কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা সত্ত্বেও ১৫২৬ সালে, ডুব্রোভনিক শহরে সবচেয়ে বেশি প্লেগের প্রকোপ দেখা দেয়। শত শত মানুষ আক্রান্ত হতে থাকে। মাত্র ছয় মাসে শহরটি পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যায়। বলতে গেলে প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে শহরটি। ছয় বছর পরে ডুব্রোভনিক শহরকে বাঁচাতে সরকার এর থেকে ৬০০ মিটার দূরে ল্যাজারেটো কোয়ারেন্টাইনের জন্য বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করে। 

১৫৯০ সালে ডুব্রোভনিক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে আরো একটি ল্যাজারেটো নির্মিত হয়। যার নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৬৪২ সালে। সুন্দর এবং তাদের নিজেদের নকশায় ভিন্ন ১০ টি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। বহু মানুষ এখানে তাদের কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলো কাটিয়েছে। এরপর থেকে এই শহরে প্লেগের প্রভাব কমতে থাকে। আস্তে আস্তে বন্দর খুলে দেয়া হয়। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শহরটির অনেক সময় লেগেছিল। 

বর্তমানে ডুব্রোভনিক শহরের সেই দৃষ্টিনন্দন কোয়ারেন্টাইন কোয়ার্টার্সগুলো বিনোদনের জায়গা। সারা বছরই ছবির মতো সুন্দর শহরটি দেখতে ভিড় করে পর্যটকরা। এই কোয়ার্টার্সগুলো বহু মানুষের মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে আছে দাঁড়িয়ে আছে। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনে আছে শহরটি। 

সূত্র: অ্যামিউজিংপ্লানেট

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস