বাংলার প্রথম রাজধানী ‘গৌড় নগর’

বাংলার প্রথম রাজধানী ‘গৌড় নগর’

নিউজ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:২৬ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২০:৫৩ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

গৌড় নগর, ভারতীয় উপমহাদেশে মধ্যযুগীয় অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহাসিক এক নগরী। বাংলার প্রথম রাজধানী বলা হয়ে থাকে এই নগরটিকে। 

আনুমানিক ১৪৫০-১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ পযর্ন্ত এটি বাংলার রাজধানী ছিল। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত জুড়ে এর অবস্থান। এক সময়ের জনপ্রিয় নগরী এখন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর।

প্রায় ৩৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এর ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে। যার কিছু অংশ রয়েছে বাংলাদেশ আর কিছু অংশ রয়েছে ভারতে। তবে গৌড়ের অধিকাংশ ঐতিহাসিক মসজিদগুলো বাংলাদেশের সীমান্তে রয়েছে। 

গৌড় নামটি সুপরিচিত হলেও প্রাচীনকালে গৌড় বলতে ঠিক কোন অঞ্চলকে বোঝানো হতো, এ নিয়ে প্রচুর মতভেদ রয়েছে। 

আবার যে এলাকাকে গৌড় বলে অভিহিত করা হতো, তা কেনই বা করা হতো আজ পর্যন্ত তার সঠিক তথ্য জানা যায়নি। পাণিনির গ্রন্থে সর্বপ্রথম গৌড়ের উল্লেখ দেখা যায়। আধুনিক মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমানের কিছু অংশ গৌড়ের সীমানা বলে ধারণা করা হয়। 

আজ আমরা বাংলার প্রথম রাজধানী গৌড় নগর সর্ম্পকে বিস্তারিত কিছু জানাবো।

গৌড়ের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ছবি: সংগৃহীত

গৌড়ের জনপদ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগলিক সত্তা। গুপ্ত সাম্রাজের সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত ৩৩৫ - ৩৮০ খ্রিস্টাব্দে এক যুদ্ধে বিশাল জয়লাভ করেছিলেন। যার কারণে ঐতিহাসিকরা তাকে “ইন্ডিয়ান নেপোলিয়ন” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ওই যুদ্ধে তিনি ভারতের বেশিরভাগ জায়গায় অধিরাজের পদ বা ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। সে সময় তার বিজয়ের মধ্যে বাংলাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। 

পরবর্তীতে এটি একটি শাখা-প্রশাখা রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। এ কারণে তখন পূর্ববাংলার সামাত্তার রাজ্যকে রক্ষা করা হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটিও ধীরে ধীরে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

পরে উত্তরবঙ্গ সম্রাট কুমারগুপ্তের শাসনামলে প্রথম (৪১৪-৪৫৫ খ্রিস্টাব্দ) গুপ্ত সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু উত্তরবঙ্গ খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দীর শেষের দিকে গুপ্ত সাম্রাজ্যটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে রয়ে যায়। এই ভাবে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন হয়। এ ঘটনার পর সাম্রাজ্যের অনুপস্থিতির ফলে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক বিভাজন হয়। সাম্রাজ্যের বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র শক্তির উত্থানও ঘটে।

৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বাংলায় ভাঙা ও গৌড় নামে দুটি স্বতন্ত্র শক্তিশালী রাজ্য তৈরি হয়েছিল। গৌড় রাজ্যটি উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ অংশ নিয়ে গড়ে উঠে। যেখানে রাজকীয় গুপ্তরা বাংলার সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী বংশ ছিল । গুপ্তরা ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ পযর্ন্ত তাদের পূবসত্তাকে টিকিয়ে রাখলেও সপ্তম শতাব্দীর শুরুতেই তাদের পতন হয়। গৌড় গুপ্ত শাসন থেকে স্বাধীন হয়।

ছবি: সংগৃহীত

গুপ্ত শাসনের পর গৌড় রাজ্যের জন্য পরিচিত একমাত্র শাসক ছিলেন শশাঙ্ক বা শশাঙ্কদেব। গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোনো এলাকার শাসন কর্তাকে বলা হত ‘মহাসামন্ত ‘। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেন গুপ্তর একজন মহাসামন্ত। শশাঙ্ক এর উপাধি ছিল ‘রাজাধিরাজ ’। 

সেই সময় উত্তর এবং পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক একটি প্রথা প্রচলিত ছিল যে, রাজ্যের শাসককে প্রথমে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে হবে। শশাঙ্ক এই বিষয়টি বুঝতে পেরে মহাসেনগুপ্তের পুত্র দেবগুপ্তের (৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে ৭ম শতাব্দীর শুরুর দিকের সময়) জোটে আসেন। যদিও তার পূর্বের অধিপতিদের সঙ্গে তার বৈরিতা ছিল। মৌখারীদের ক্রমবর্ধমান শক্তি পুশ্যভূতীদের সঙ্গে তিনি জোটবদ্ধ হয়েছিল। পরবর্তীতে গুপ্তদের হুমকি দেয়ার কারণে দেবগুপ্ত গৌড়ের সঙ্গে জোট মেনে নিয়েছিল ও শশাঙ্কের সঙ্গে জোট ভেঙে দিয়েছিল।

গৌড় নগরে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর ৬৩৭-৬৪২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে রাজ্য প্রথমে ভাস্করবর্মণ ও পরে হর্ষের হাতে পড়ে। হর্ষের মৃত্যু এবং রাজনৈতিক অরাজকতা এর ফলে গৌড়কে আবারো খারাপ সময়ের মুখোমুখি হতে হয়। গৌড় রাজ্য হিসেবে থাকলেও প্রতিবেশী অনেক রাজা দখলে আনার জন্য এর ওপর আক্রমণ করেছিল ।

পাল রাজবংশ

ছবি: সংগৃহীত
 

পাল বংশ আট শতকের মাঝামাঝি সময় গৌড়ে আসে। সরদারদের একটি সমাবেশের অনুমোদনের সঙ্গে রাজা হিসাবে গোপালার উত্থানের সময় গৌড়ায় পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। পাল সম্রাটগণ গৌড়ের প্রভু উপাধি বহন করেছিলেন। এই সাম্রাজ্যটি চার শতাব্দী (অষ্টম -12 ম শতাব্দী) শাসন করেছিল এবং এর ভূখণ্ডে উত্তর ভারতের বিশাল অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। পালরা যেভাবে চার শতাব্দী শাসন করেছিল তার কিছু সংক্ষিপ্ত ঘটনা-

গোপাল (৭৫৬ – ৭৮১ খ্রিষ্টাব্দ)

৭৫৬ সালে বাংলার অরাজক পরিস্থিতির অবসান ঘটে। উঠে আসে পাল বংশ। এ বংশের প্রথম রাজা গোপাল। বাংলায় প্রথম বংশানুক্রমিক শাসন শুরু হয় এ আমলে।পাল বংশের রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন। পাল বংশ টানা চারশ’ বছর রাজত্ব করে।বাংলায় এত দীর্ঘ শাসন আর কোন রাজবংশ করেনি।

ধর্মপাল (৭৮১ – ৮২১ খ্রিষ্টাব্দ)

পাল রাজাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন গোপালপুত্র ধর্মপাল। তার যুগে উত্তর ভারতে আধিপত্য নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল তিনটি রাজবংশ। একটি বাংলার পাল বংশ, অপরটি রাজপুতানার গুর্জর প্রতীহার বংশ ও তৃতীয়টি দাক্ষিণাত্যর রাষ্ট্রকূট বংশ। ইতিহাসে এটি ‘ ত্রিশক্তির সংঘর্ষ ’ নামে পরিচিত। এর মোটামোটি মসৃণভাবে চলছিল পালবংশের শাসনকাল। এর পরবর্তীতে রাজা দ্বিতীয় মহীপালের শাসনামলে কৈবর্ত বিদ্রোহ নামে একটি বিদ্রোহের কথা জানা যায়।

দ্বিতীয় মহীপাল (১০৭০ – ১০৭৭)

এ আমলে কৈবর্ত বিদ্রোহ দেখাদেয়। এটি মূলত জেলে সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ ছিলো। দ্বিতীয় মহীপালের সময় রাজ্যে কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। শাসনেও দক্ষতার ঘাটতি ছিল। পাল রাজাদের এক কর্মচারী দিব্যর নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে কৈবর্তরা রাজ্যের বরেন্দ্রী অংশ দখল করে নেয়। তারা নৌকা চালনায় দক্ষ বলে নৌ- যুদ্ধকে প্রাধান্য দিয়েছিল। রাজা দ্বিতীয় মহীপাল কৈবর্তবাহিনীকে আক্রমণ করতে গিয়ে নিজে নিহত হন। ফলে বরেন্দ্রীতে কিছুকালের জন্য কৈবর্ত শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। দিব্যর ভাই রুদোক ও তার পুত্র ভীম রাজা হন। ভীম দক্ষ শাসক হিসেবে বরেন্দ্রীর শ্রী অনেকটাই ফিরিয়ে এনেছিলেন।

রামপাল (১০৮২ – ১১২৪)

অবশেষে রামপাল সিংহাসনে বসেন ও বরেন্দ্রী উদ্ধারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তিনি প্রতিবেশী সামন্তরাজাদের সহযোগিতায় ভীমকে পরাজিত করে কৈবর্ত রাজ্যের অবসান ঘটান। এভাবে বিদ্রোহী বাঙালীর প্রথম রাষ্ট্রবিপ্লবের সমাপ্তি ঘটে। সন্ধাকর নন্দীর ‘রামচরিত’ গ্রন্থ থেকে রামপাল এর রাজত্ব সম্পর্কে জানা যায়। বরেন্দ্র এলাকায় পানিকষ্ট দূর করার জন্য রামপাল অনেক দীঘী খনন করেন। দিনাজপুরের ‘ রামসাগর ’ তারই কীর্তি।

সেন রাজবংশ

ছবি: সংগৃহীত

সেন রাজবংশ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলায় রাজত্ব করেছিলেন (১০৯৭-১২২৫)। খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে বাংলায় পালকে অভিজাত করে রাজবংশের উত্থান হয় । এটি প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলায় সেনদের শাসন সাধারণত হিন্দু-বৌদ্ধ সমাজের ওপর ছিল। তারা হিন্দু ধর্মের উত্থানের সাথে সংযুক্ত থাকে। এর ফলে দীর্ঘসময় উভয় ধর্মের মধ্যে শান্তি বিরাজ করেছিল। সবাই একসঙ্গে বসবাসও করেছিল। 

কিস্তু সেন বংশের শাসনামলেই আবার বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে বড় আকারের বৌদ্ধ অভিবাসন হয়েছিল। যা সেন আমলে সংস্কৃত সাহিত্যের বিকাশের সাক্ষী ছিল।

দিল্লির সুলতানি আমল

ছবি: সংগৃহীত

সেন রাজবংশের শেষের দিকে পুরো বাংলা মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে দিল্লী সুলতানি বাহিনীর দ্বারা গৌড় জয় করেছিলেন। কিন্তু চৌদ্দ শতকের গোড়ার দিকে বাংলায় দিল্লির বিদ্রোহী গভর্নররা তাদের নিজস্ব সুলতানি গঠন করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে শামসুদ্দিন ইলিয়াছ শাহ বাংলার অন্য শাসকদের পরাজিত করে অঞ্চলকে এক সুলতানে পরিণত করেছিলেন। পরে ইলিয়াস শাহ নিজেকে বাংলার সুলতান বলে ঘোষণা করেছিলেন।

ইলিয়াস শাহের পূর্বের সামরিক অভিযানে কাঠমন্ডু ও বারানসিকে বরখাস্ত করা করা হয় এবং উড়িশ্যা আক্রমণ করা হয়। ওই যুদ্ধে প্রতিষ্ঠিতি করা হয় বাংলার সুলতানিকে। এর পরেই দিল্লী এবং বাংলা সার্বভৌমত্ব হিসাবে অভিযুক্ত হয়েছিল।

বাংলার সুলতানি আমল

ছবি: সংগৃহীত

বাংলার সুলতানি আমলে ‘গৌড়’ ব্যাপকভাবে গৌড় নামে পরিচিত হয়েছিল। দিল্লি থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রের পরে পান্ডুয়া সুলতানাতের প্রথম রাজধানী হয় গৌড়। ১৪৫০ সালে, বাংলার সুলতান মাহমুদ শাহ পান্ডুয়া গৌড়কে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সেটি ১৪৫৩ সালে সম্পন্ন হয়েছিল। বাংলার সুলতানিয়ানরা একশ বছরের বেশি সময় ধরে গৌড়ের রাজধানীতে অবস্থান করেছিলেন। 

গৌড় ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বাধিক ঘনবসতির্পূণ শহরগুলোর মধ্যে একটি ছিল। অঞ্চলটি ব্যাপকভাবে বঙ্গালাহ এবং বেনগালা নামে পরিচিতি লাভ করে। এই দুটি পদ বাংলা ও বাংলার আধুনিক পদগুলোর পূর্বসূরি ছিল। ইউরোপ ও চীনের তথ্যানুসারে, বাংলা সুলতানিটি মধ্যযুগীয় সময়ের মধ্যে একটি প্রধান ব্যবসায়ী দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।


গৌড়ের পতন

ষোড়শ শতাব্দীতে গৌড় মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের দখলে ছিল। তিনি এর নাম জান্নাতবাদ (স্বর্গীয় শহর) রাখতে চেয়েছিলেন। ১৬ শতকে রাজমহলের মুঘল সম্রাজ্যে একটি যুদ্ধ হয়েছিল যার শাসন করেছিলেন

বাংলার সুলতানি আমল। যুদ্ধের সময় বাংলার শেষ সুলতান দাউদ খান কররানি মুঘলদের কারাগারে বন্দী করা হয়েছিল। পরে মুঘলদের নির্দেশমতে তাকে হত্যা করে বাংলার সুলতানি বংশ শেষ করা হয়।

এছাড়াও মুঘলরা উপরাজ শাহ সুজার রাজত্বকালে নির্মিত লুকোচুরি দরজা (লুকোচুরি ও দরজা সন্ধান) সহ গৌড়ের বেশ কয়েকটি কাঠামো নির্মাণ করেছিলেন। প্লেগের প্রাদুর্ভাব এবং গঙ্গার গতিপথ পরিবর্তনের ফলে শহরটি পরিত্যক্ত হয়েছিল। সেই থেকে এটি মরুভূমির ধ্বংসস্তূপের পরিণত হয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/রোখসানা/মাহাদী