ধার করা ক্যামেরায় বানানো সিনেমাটি জিতলো কান চলচ্চিত্র পুরস্কার

ধার করা ক্যামেরায় বানানো সিনেমাটি জিতলো কান চলচ্চিত্র পুরস্কার

আশিক ইসলাম, রাবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:১৭ ৯ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ২০:৪৪ ৯ জানুয়ারি ২০২২

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নাট্যকলা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রাহি আবদুল্লাহ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নাট্যকলা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রাহি আবদুল্লাহ

করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিলো দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অনেকে এই সময়টা অলসভাবে কাটালেও একটু ব্যতিক্রম রাহি। এক রাতে লিখেন ছোট্ট একটি গল্প। নিজের ক্যামেরা না থাকায় বন্ধুর থেকে ধার করা ক্যামেরায় গল্পটাকে রূপ দেয় সিনেমায়। এভাবেই ‘টেনর’ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণ করেন তরুণ নির্মাতা রাহি আবদুল্লাহ। সিনেমাটি ইতোমধ্যে জিতেছে ফ্রান্সের কান ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল পুরস্কার। তার নির্মিত ‘টেনর’ তাকে এনে দিয়েছে ‘বেস্ট ইয়াং ফিল্ম মেকার’-এর স্বীকৃতি। রাহি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নাট্যকলা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।

শুরুটা যেভাবে:
করোনা মহামারির কারণে হঠাৎ বন্ধ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাড়িতে চলে আসে রাহি। এক রাতে লিখেন ‘টেনর’ নামক গল্প। ইচ্ছে হলো গল্পটা দিয়ে সিনেমা বানানোর। এর আগেও এমন শর্টফ্লিম বানিয়েছে সে। প্রথমেই সমস্যা বাঁধলো সিনেমা বানানোর খরচ নিয়ে। কোথায় পাবে সিনেমা বানানোর খরচ? শেষ পর্যন্ত দুজন যৌথ্যভাবে এগিয়ে আসেন।

আরো পড়ুন: কানে তরুণ নির্মাতা পুরস্কার পেলো রাবি শিক্ষার্থী রাহি

ধার করা ক্যামেরায় শুটিং: 
সিনেমা শুট কারার জন্য প্রয়োজন ভালো মানের ক্যামেরা। কিন্তু টিমের কারো ক্যামেরা ছিলো না। আর এদিকে সারাদেশ লকডাউন, বাইরে থেকে ক্যামেরা নিয়ে এসে শুট কারার অবস্থাও ছিলো না। তাই এক বন্ধুর ক্যামেরা ধার করে কাজ শুরু করে। অর্ধেক কাজ শেষ হতেই সেই ক্যামেরা ব্যক্তিগতকাজে নিয়ে যায় বন্ধুটি। আরেক বন্ধুর থেকে ধার করেন ক্যামেরা। রাহি বলেন, প্রথমে এক বন্ধুর থেকে ক্যামেরা ধার করি। সেটা বন্ধু ব্যক্তিগত কাজে বগুড়াতে পাঠিয়ে দেয়। তারপর আরো একটি সাধারণ ক্যামেরা ধার করি। যেটা দিয়ে কোনোরকম ভিডিও করা যায়। 

আরো পড়ুন: হাজারো প্রেম-বিচ্ছেদের সাক্ষী প্যারিস রোড

কাজের অভিজ্ঞতা:
‘টেনর’ তৈরির কাজ শুরু হয় লকডাউনে। চোর-পুলিশ খেলার মাধ্যমে শেষ করেন সিনেমার কাজ। রাহি বলেন, বাড়ি থেকে শুটিং স্পট ছিলো প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে। চোর-পুলিশ খেলার মধ্যমে শুটিং করি। খুব সকালে শুটিং স্পটে চলে যেতাম। কাজ শেষ করে বাসায় ফিরতে ৫টা বেজে যেতো। এভাবে টানা ১২দিন শুট করি।

এক পর্যায়ে সিনেমা বানানোর জন্য যে বাজেট ছিলো তা শেষ হয়ে যায়। শঙ্কা ছিলো কাজ শেষ করা নিয়ে। রাহি বলেন, প্রতিদিন শুটিং স্পটে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া, ভাড়া সবমিলিয়ে যে বাজেটটা পেয়েছিলাম তা শেষ হয়ে যায়। টিমের একজনের সহযোগিতায় কাজটা শেষ হয়।

আরো পড়ুন: আবারো সমালোচনায় রাবি প্রক্টর, অধ্যাপক না হয়েও লিখেন ‘অধ্যাপক’! 

ভিডিও সম্পাদনায় বিপত্তি:
ভিডিও সম্পাদনার জন্য ছিলো না ভালো ডিভাইস। যা ছিলো তা দিয়ে ভিডিও সম্পাদন করার মতো অবস্থা নেই। এদিকে আবার ভিডিও সম্পাদনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির সঙ্গে ঝামেলা হয়। রাহি বলেন, টিমের এক বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় সম্পাদনার কাজে আমি নিজেই হাত দেই। শেষ সম্পাদনাটা আমি করি। টানা চাররাত না ঘুমিয়ে কাজটা শেষ করি। এটাকে শেষ বলা যায় না, কোনো রকম ভিডিওটা দাঁড় করিয়ে ফ্যাস্টিভ্যালে জমা দেই। 

আরো পড়ুন: ৬০ পদকের তেইশই স্বর্ণ, অলিম্পিকে খেলতে চান রাবির রতিশ

আঞ্চলিক সিনেমা ‘টেনর’:
‘টেনর’ স্বপ্লদৈর্ঘ্য সিনেমাটি রংপুরের ভাষাকে কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে কুড়িগ্রামের ভাষা। সিনেমাটিতে রয়েছে একটি বাউল গান। যাকে রংপুরের ভাষায় ‘ভাওয়াইয়া’ সংগীত বলা হয়। নির্মাতা রাহি বলেন, আমাদের দেশে বরিশালের ভাষার প্রচুর নাটক হয়। কিন্তু রংপুরের ভাষায় হয় না। আমি চেয়েছি আমার অঞ্চলের ভাষাটা আর্কাইভ হয়ে থাকুক। তাই আঞ্চলিক ভাষায় সিনেমাটি নির্মাণ করা।

আরো পড়ুন: রাবি চিকিৎসা কেন্দ্রের ‘চিকিৎসা’ প্রয়োজন, বিকল কিউএস মেশিন

কান চলচ্চিত্র পুরস্কার:
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ফ্রান্সের কান ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কারে মনোনিত হয় ‘টেনর’। রাহি আবদুল্লাহর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাটি তাকে এনে দিয়েছে ‘বেস্ট ইয়াং ফিল্ম মেকার’-এর স্বীকৃতি। নভেম্বর মাসে রাহির ‘টেনর’ ছাড়াও আরো একটি বাংলাদেশি চলচ্চিত্র এই পুরস্কার লাভ করে। সম্প্রতি কান ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষ তাদের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নভেম্বর মাসে নির্বাচিত সেরা চলচ্চিত্রগুলোর নাম প্রকাশ করেছে। 

আরো পড়ুন: সাপ দেখলেই ডাক পড়ে তাসিবের, ভালোবেসে ধরে ফেলেন নিমিষেই

রাহি বলেন, প্রতিমাসে হাজার হাজার সিনেমা সাবমিট হয় কান ফেস্টিভ্যালে। এর মধ্যে প্রতি বছরে ২০-২৫টি সিনেমাকে তারা অ্যাওয়ার্ড দেয়। সেখানে আমার সিনেমা পুরস্কার পাওয়া সত্যিই আনন্দের। দেশের মানুষের কথা চিন্তা করেই সিনেমাটি বানানো। কখনো ভাবিনি সিনেমাটি আন্তর্জাতিক দর্শন দেখবে। মূলত গল্পের কারণে সিনেমাটা বাইরের দেশেও সাড়া পেয়েছে। ইতোমধ্যে ‘টেনর’ পেয়েছে মোট ৭টি পুরস্কার। এছাড়াও জায়গা করে নিয়েছে দেশ-বিদেশের ৪১টি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম