৩১ বছরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

৩১ বছরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

নিগার সুলতানা, খুবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:৩৯ ২৫ নভেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৭:০৩ ২৮ নভেম্বর ২০২১

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

১৯৯১ সালের ২৫ নভেম্বর যাত্রা শুরু করে দক্ষিণাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি)। তিন দশক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ ৩১ বছরে পা দিয়েছে খুবি। মাত্র ৪টি ডিসিপ্লিন এবং ৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে ২৯ টি ডিসিপ্লিনে পড়ছে সাত হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস

এখন থেকে প্রায় অর্ধশত বছর আগের কথা, খুলনার ময়ূরী নদীর তীরে এক টুকরো জায়গা জুড়ে ছিল এক রেডিও স্টেশন, যা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যা কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। সেই বধ্যভূমিতে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। তৎকালীন রেডিও স্টেশনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে শহীদ নজরুল ইসলাম ভবন নামে পরিচিত হয়। বর্তমানে ভবনটি পুরাতন প্রশাসনিক ভবন হিসেবেও পরিচিত।

নেই ছাত্র রাজনীতি

প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের রাজনৈতিক শক্তি এসে প্রভাব ফলানোর চেষ্টা শুরু করে। এমন সময়ে তৎকালীন শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কাছে গিয়ে আবেদন জানান যেন, কোনোমতেই যেন ছাত্ররাজনৈতিক সংগঠন গঠিত না হয়। সেই থেকে খুবিতে সন্ত্রাস ও ছাত্র রাজনীতিমুক্ত পরিবেশের ধারা এখনো অব্যাহত আছে। এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক সন্ত্রাসের কবলে এই প্রাঙ্গণে কখনো কোনো ছাত্রের শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত ঝরেনি। এছাড়া এ বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে সিট হয় ছাত্রের মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে।

অটল একাডেমিক ক্যালেন্ডার

খুবিতে সব ডিসিপ্লিনে জানুয়ারির ১ তারিখ হতে ৩০শে জুন পর্যন্ত চলে প্রথম সেমিস্টার। এর মাঝে ক্লাস, পরীক্ষা শেষ করে ফলও প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় সেমিস্টার শুরু হয় ১লা জুলাই, শেষ হয় ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যেই। সেশনজটের নাম এখানে অজানাই বটে।

বিদেশী শিক্ষার্থীদের আস্থা বাড়ছে

‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস ও উন্নতমানের পড়াশোনার জন্য খুবি ছিল আমার প্রথম পছন্দ। প্রথম দুই মাসেই খেলার মাঠের উত্তেজনা, পিঠা উৎসব দেখে ক্যাম্পাস কতটা উৎসবমুখর বুঝেছি। এ দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের অনেকটা মিল থাকায় খাপ খাইয়ে নিতেও বেগ পেতে হয়নি। ক্যাম্পাসে কিছু সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছি, পড়াশোনার পাশাপাশি নানান দিকে দক্ষতা বাড়াতে চর্চাও চলছে।’  ভাঙা ভাঙা ইংরেজি ও বাংলা মেশানো গলায় বলছিলেন নেপালি ছাত্রী কেশিকা। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিস্লিপিনে পড়ছেন।

কেশিকার মতো অনেক বিদেশি শিক্ষার্থীদেরই আস্থা বাড়ছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছেন ১৯ বিদেশি শিক্ষার্থী, যা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত স্নাতক পর্যায়ে সর্বোচ্চ। এ ১৯ জনের মধ্যে ৪ জন ছাত্রীও রয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স দফতর প্রতিষ্ঠার প্রথম বর্ষেই এটির অর্জন এই রেকর্ড সংখ্যক শিক্ষার্থী। ভারত, কানাডা ও নেপাল থেকে শিক্ষার্থীরা পড়ছেন জীববিজ্ঞান স্কুল ও বিজ্ঞান, প্রোকৌশল ও প্রযুক্তি স্কুলে।

বারো মাসে তেরো পার্বন ও মানবতায় খুবি

বছরে সারাটা সময়ই কোনো না কোনোভাবে রঙিন থাকে খুবি। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য ২২টির অধিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে এখানে। গান, নাচ, আবৃতি ও ফটোগ্রাফির মত দক্ষতা চর্চার জন্য যেমন সংগঠন রয়েছে; তেমনি পথশিশুদের শিক্ষাদান, দুস্থদের সাহায্য বা রক্তদানের মতো সামাজিক সেবামূলক কাজের সংগঠনেরও অভাব নেই। সবাই মিলে হাতে হাত রেখে কাজ করে যাচ্ছে ছাত্রদের দক্ষতা, মানবিক গুনাবলি এবং নেতৃত্বের বিকাশ ও সমাজের সেবায়।

রোটার‍্যাক্ট ক্লাব অব খুলনা ইউনিভার্সিটি ও বাধঁন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট হতে করোনার এ ক্রান্তিকালে দেওয়া হয়েছে অক্সিজেন সেবা। দুটি সংগঠন হতে মোট ১৫০টির ও বেশি অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে রোগীদের কাছে। বন্যা কবলিতদের সাহায্য, শীতার্তদের মাঝে উষ্ণতা ছড়ানোর মতো আরো হাজারো সমাজসেবামূলক কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনগুলো।

সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ডিসিপ্লিন বা ব্যাচের আয়োজনে পিঠা উৎসব, বাউল উৎসব, ক্যাফে আনপ্লাগড, এক কাপ চা, ফটোগ্রাফি এক্সিবিশন, আর্ট এক্সিবিশন, শিক্ষা মেলা, চাকরি মেলা ছাড়াও অনেক অনুষ্ঠানে বারো মাস মুখরিত হয়ে থাকে ক্যাম্পাস। এছাড়াও দেশের সব থেকে বড় শিক্ষা সমাপনি অনুষ্ঠান ‘র‍্যাগ ডে’ উদযাপিত হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিন দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে পুরো দক্ষিণাঞ্চল।

শিক্ষা ও গবেষণায় খুবি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্কুল থেকে ২০২০ সালে ৩২৭টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যার মধ্যে লাইফ সাইন্স স্কুলের ১৩৬টি; সাইন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি স্কুলের ১০৩টি; সোশ্যাল সাইন্স স্কুলের ৪১টি, আর্টস এন্ড হিউম্যানিটিস স্কুলের ১৯টি; ল স্কুলের ৫টি, ইন্সটিটিউট অব এডুকেশন এন্ড রিসার্চের ৩টি এবং ম্যানেজমেন্ট এন্ড বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন স্কুলের ২টি গবেষণা
প্রবন্ধ রয়েছে। এছাড়াও, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্কুলে ৪৩টি গবেষণা প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দি সুন্দরবনসকে (সিআইএসএস) ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দ্য সুন্দরবনস এন্ড কোস্টাল ইকোসিস্টেম (আইআইএসএসসিই) এ রূপান্তর করা হয়েছে। এছাড়া রিসার্চ সেল, মডার্ণ ল্যাংগুয়েজ সেন্টার ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় স্টাডিজ শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

এদিকে সম্প্রতি এডি সাইন্টিফিক ইনডেক্স নামের আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা সংস্থা সারাবিশ্বের ২০৬ দেশের ১৩,৫৩১ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত লক্ষাধিক বিজ্ঞানীর সাইটেশন এর ভিত্তিতে বিশ্ব বিজ্ঞানীদের তালিকায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন বিজ্ঞানী ও গবেষক স্থান পেয়েছেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মাহমুদ হোসেন স্থান পেয়েছেন। তিনি খুবিতে কৃষি ও ফরেস্ট্রিতে প্রথম, দেশে চতুর্থ, এশিয়ায় ১৫১ ও বিশ্বে ৮২৫ তম স্থান লাভ করেন।

বিজ্ঞান ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত সিমাগো-স্কপাসের ২০২০ সালের ইনস্টিটিউশনস র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের মধ্যে সার্বিক ক্যাটাগরিতে খুবি টানা দুই বছর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। উদ্ভাবনী ক্যাটাগরিতে গত বছরের চেয়ে ২৮ ধাপ এগিয়ে বৈশ্বিক ৪২১ তম স্থানে এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে খুবি।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে পরিচালিত এ অন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় খুবি প্রথমবার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে উদ্ভাবনীতে প্রথম, গবেষণায় দ্বিতীয় এবং সামাজিক গবেষণায় ৬ষ্ঠ স্থান লাভ করে।

এতো পাওয়ার মাঝেও ছোট ছোট কিছু না পাওয়া রয়েই গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায়। অনেক ডিসিপ্লিনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লাসরুম বা ল্যাব নেই। টিএসসি নেই, নেই শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসিক ব্যবস্থা। বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য মোটা অংকের টাকা গুনতে হলেও নেই তেমন সুযোগ সুবিধা। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা তাদের স্বপ্নের ক্যাম্পাস একদিন সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠবে, হয়ে উঠবে দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর/এআর/জেডএম