গৃহিণী থেকে সফল উদ্যোক্তা বন্ধন, মাসে আয় ২০ হাজার টাকা

গৃহিণী থেকে সফল উদ্যোক্তা বন্ধন, মাসে আয় ২০ হাজার টাকা

আশিক ইসলাম, রাবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৪৭ ৭ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৬:৪৮ ৭ এপ্রিল ২০২১

একজন সফল উদ্যোক্তা শারমিন আক্তার বন্ধন

একজন সফল উদ্যোক্তা শারমিন আক্তার বন্ধন

মাত্র দশ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন অনলাইনে ব্যবসা। এরপর তাড়াহুড়ো না করে এগিয়েছেন ধাপে ধাপে। চারশো-র বেশি অর্ডার ডেলিভারি দিয়েছেন আট মাসে। দেশের বাইরে দিয়েছেন ছয়টি ডেলিভারি। দেশের ৪৬টি জেলায় পৌঁছে দিয়েছেন তার পণ্য। প্রতি মাসে অর্ডার পান ৪০-৫০ হাজার টাকার। খরচ বাদে মাসে আনুমানিক আয় থাকে ২০হাজার টাকা। বলছিলাম গৃহিণী থেকে একজন সফল উদ্যোক্তা শারমিন আক্তার বন্ধনের কথা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থী বন্ধন। দেশের অন্য আট-দশ জন শিক্ষার্থীর মতো তারও ইচ্ছে ছিলো পড়াশুনা শেষে সরকারি চাকরি করবেন। বিসিএস কোচিংয়ে ভর্তিও হয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের কারণে সেটা আর সম্ভব হয়নি। এরপর কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে কন্যা সন্তান। নিজের সন্তানের কথা চিন্তা করে চাকরির দিকে না ঝুঁকে গড়ে তোলেন অনলাইন বিজনেস প্লাটফর্ম ‘ঘরোয়া’। এর মাধ্যমে নিজের তৈরি করা নিত্যপ্রয়োজনীয় অর্গানিক পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। 

শুরুর গল্প সম্পর্কে বন্ধন বলেন, ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম নিজে কিছু করার। স্টুডেন্ট থাকা অবস্থায় বিজনেস নিয়ে পরিকল্পনা করতাম। যথেষ্ট সুযোগ ও পুঁজির অভাবে সেটা আর করতে পারিনি। মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করার পর বিয়ে হয়। বিয়ের পর ঢাকায় এসে বিসিএস কোচিং এ ভর্তি হই। এক মাস ক্লাস করি কিন্তু অসুস্থতার কারণে সেটা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার মেয়ের জন্ম হয়। মেয়ে পৃথিবীতে আসার আগের সময়গুলোতে খুব চিন্তা হতো কি করবো? কিভাবে নিজের পরিচয় গড়বো? সবচেয়ে বেশি চিন্তা হতো মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে। যদি চাকরি করি তাহলে মেয়ের দেখাশোনা করবে কে? এসব ভাবনা থেকেই ব্যবসার চিন্তা মাথায় আসে। সব সময় ভাবতাম এমন কিছু করতে হবে যেটার মাধ্যমে নিজের পরিচয় গড়তে পারবো আবার মেয়েকেও সময় দিতে পারবো। সেই ভাবনা থেকেই মূলত অনলাইন বিজনেস শুরু করা।

বন্ধন জানান, ২০২০ সালের জুন মাসে নারীদের অনলাইন বিজনেস প্লাটফর্ম ‘উই’ (উইমেন্স অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম) তে যোগ দেই। সেখানে অনেকেই পেলাম যারা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। গ্রুপে সবাইকে দেখে অনেক সাহস পেলাম। শুরু করলাম আমার উদ্যোগ। প্রথমে অনেক বাজে কথা শুনতে হয়েছে মানুষের। কিন্তু সেদিকে কান দেইনি।

শারমিন বলেন, বিজনেস এর ক্ষেত্রে পুঁজি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাই এবিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। মাত্র দশ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে উদ্যোগ শুরু করেছিলাম। তারপর ধাপেধাপে এগিয়েছি কোন রকম তাড়াহুড়ো না করে। একটু চিন্তাভাবনা করে ইনভেস্ট করেছি যাতে মানসিকভাবে চাপ মুক্ত থাকা যায়। এখন প্রতিমাসে অর্ডার পাই ৪০-৫০ হাজার টাকার। সব খরচ বাদে মাসে আয় থাকে আনুমানিক ২০হাজার টাকার মতো।

বন্ধন আরো বলেন, প্রথমে পণ্য ছিল গুঁড়া মশলা, মধু, মেহেদী আমলকী মেথি গুড়া, পেঁয়াজ তেল। আর মশলার মধ্যে সিগনেচার পণ্য ছিল আদা, রসুন গুড়া। একটু আনকমন প্রোডাক্ট রাখতে চেয়েছি সেজন্য এই সংযোজন। পরবর্তীতে মেয়েদের শাড়ি, কুর্তি, থ্রি পিসেও কাজ করছি। মূলত গুড়া মসলার জন্য পাইকারি দামে আড়ৎ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে নিজেই মসলার জন্য প্রস্তুত করি। যাতে কাস্টমারদের কম দামে কোয়ালিটি সম্পন্ন পণ্য দিতে পারি। অর্গানিক পণ্যগুলো নিজে হাতে তৈরি করায় শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারি। 

বন্ধন বলেন, আমার ব্যবসার ফেইসবুক পেইজ ‘Ghorowa-ঘরোয়া’ খোলার প্রথম দিনেই ৩টা অর্ডার পেয়েছিলাম। প্রথম দিনের অর্ডারগুলোই আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর থেকে বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। চারশোর বেশি অর্ডার ডেলিভারি করেছি গত আট মাসে। এরইমধ্যে ৪৬ জেলায় ‘ঘরোয়া’র পণ্য পৌঁছে দিয়েছি। এমনকি দেশের বাইরেও ৬টি অর্ডার ডেলিভারি দিয়েছি। যা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। ঘরোয়ার পণ্য দেশের যে কোনো জায়গা থেকে কালেক্ট করা যাবে। ফ্রেশ পণ্য নিতে চাইলে ‘Ghorowa-ঘরোয়া’ ফেসবুক পেজে মেসেজ বা ফোনে অর্ডার করতে পারবেন। ঢাকার মধ্যে হোম ডেলিভারি এবং ঢাকার বাইরে সুন্দরবন কুরিয়ারের মাধ্যমে ডেলিভারি দেয়া হয়।

এতকিছু থাকতে উদ্যোক্তা কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বন্ধন বলেন, নিজের পরিচয় গড়ার জন্য এই পথ বেছে নিয়েছি। এখানে আমি নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবো। নিজে কিছু করার জন্য শুধু চাকরিই কেনো করতে হবে। আমি মনে করি যার যে কাজের প্রতি ভালোবাসা আছে তার সে কাজ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিত। 

এক কন্যা সন্তানের জননী বন্ধনের স্বামী কাজী খায়রুল কবির বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। নিজের উদ্যোক্তা হওয়ার পিছনে স্বামীর সহযোগিতা ও অবদানকে স্বীকার করে বন্ধন বলেন, প্রথম থেকেই তিনি আমাকে এই কাজে সাপোর্ট দিয়ে আসছে। তার সহযোগিতা ছাড়া এতদূর কখনো আসা সম্ভব হতো না।

ঘরোয়া নিয়ে আরো বহুদূর যাওয়ার স্বপ্নের কথা উল্লেখ্য করে বন্ধন বলেন, আমার চাওয়া ঘরোয়া একদিন সারাদেশে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে যাতে ৮/১০জন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি সে প্রত্যাশা।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম