সব বাধা পেরিয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিহাব পড়ছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে

সব বাধা পেরিয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিহাব পড়ছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে

রুমান হাফিজ, চবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৪৭ ২৪ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১১:১৭ ২৫ জানুয়ারি ২০২১

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শিহাবউদ্দীন ভূঁইয়া

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শিহাবউদ্দীন ভূঁইয়া

বয়স তখন মাত্র ছমাস। হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টি শক্তি হারান তিনি। ঠিক এ বয়সেই মা মারা গেলেন। তবুও অন্ধত্বকে পথ চলার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে প্রশ্রয় দেননি। বলছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শিহাবউদ্দীন ভূঁইয়ার কথা। 

১৯৯৭ সালের ২২ ডিসেম্বর নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার কালুয়ারকান্দা গ্রামে তার জন্ম। তিনবোন আর তিনভাইয়ের মধ্যে শিহাবই সবার ছোটো। মা মারা যাওয়ায় সন্তানদের দেখভালের জন্য বাবা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে তার সন্তানরা মায়ের ছায়ায় বড় হবেন। কিন্তু তার বিয়ের পর সংসারের প্রতিদিনের চিত্র যেনো পাল্টে গেলো। তিনি কাজে বের হওয়ার পর থেকে সংসারে ফুটে উঠে স্ত্রীর আসল চেহারা। এসব তার অগোচরেই থাকতো। তাকে বিশ্বাসই করানো যায়নি সন্তানরা এই স্ত্রীর কাছে ভালো নেই। তবে শিহাব মায়ের ছায়া পেয়েছেন বড়বোনের কাছেই। বোনের বিয়ের পর তিনি একা হয়ে গেলেন। এরপর বড় ভাই একমাত্র ভরসা হলেন। তিনি শিহাবকে বুঝিয়েছেন আটদশজনের মতোই তার জীবন, এর বাইরে কিছু নয়। এরপর ধীরে ধীরে শিহাবের সফলতার ধাপে ধাপে জড়িয়ে গেলেন বড় ভাই।        

একে একে শিহাব কালুয়ারকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চট্টগ্রামের লোহাগড়া সাহাবীর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজে পড়াশোনা শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন।

শিহাবের পড়াশোনার প্রতি যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। পাশাপাশি খেলাধুলাসহ সব ধরনের সৃজনশীল কাজের প্রতি ছিল তার চরম ঝোঁক। ছোটোবেলা থেকেই স্কুলের সব অনুষ্ঠানে যোগদান করার চেষ্টা করতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিহাবের পদচারণা সত্যিই আশ্চর্য করার মতো! নিজেদের স্থানীয় সংগঠন ‘নরসিংদী ডিজঅ্যাবল পিপলস অর্গনাইজেশন টু ডেভেলপমেন্ট’ এ ২০১৪ সাল থেকে কাজ করে আসছেন। বর্তমানে শিহাব সেই সংস্থার সহ-সভাপতি। 

এই সংস্থাটি সবধরনের প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে থাকে। ২০১২ সালে তিনি ‘এবিসি’ নামক একটি সংস্থার সাথে সংযুক্ত হয়। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কম্পিউটার ট্রেনিং থেকে শুরু করে বেশকিছু ট্রেনিংয়ে অংশ নেন। ২০১৮ সালে সমাজসেবা অধিদফতর, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল থেকেও সে কম্পিউটার ট্রেনিং করেন। বনানীতে ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিষ্ঠান থেকে কল সেন্টার টেলিফোন অপারেটরের ট্রেনিংও নিয়েছেন শিহাব। এছাড়াও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর এটিএন বাংলার একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

শিহাব এক বন্ধুর মাধ্যমে চট্টগ্রামের লোহাগড়ায় ‘সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম’ নামে একটি হোস্টেলের সন্ধান পায়। তাই মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করতে নরসিংদী থেকে চট্টগ্রামে চলে আসেন। লোহাগড়ার যে হোস্টেলে শিহাব থাকতো সেখানে ১০ জনের থাকার ব্যবস্থা ছিল। সেই হোস্টেল তৈরির উদ্দেশ্যই ছিল পড়াশোনাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা। হোস্টেলের ঠিক পাশেই ছিলো লোহাগড়া সাহাবীর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। শিহাব সেখানেই ভর্তি হয়েছিল। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা ‘থার্ড আই’ সংগঠনকে পাশে পেয়ে নিজেকে অনেক ভাগ্যবানও মনে করে শিহাব। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীদের জীবন সহজ করে দেয়া যাবে এমন চিন্তা নিয়ে তার সময় কাটে। স্বপ্ন দেখি মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার। স্বার্থপরের মতো ভাবনা নেই, বরং নিজের জীবনকে অন্যের ভালো থাকায় নিয়োজিত করার মাধ্যমেই আমার প্রকৃত সুখ।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম