অপ্রতিরোধ্য নাজমুন, দেশ ভ্রমণে ছোঁবেন ইতিহাসের অবিস্মরণীয় মাইলফলক

অপ্রতিরোধ্য নাজমুন, দেশ ভ্রমণে ছোঁবেন ইতিহাসের অবিস্মরণীয় মাইলফলক

আশিক ইসলাম, রাবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৪২ ২৩ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৯:১০ ২৩ জানুয়ারি ২০২১

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের রাজধানী ফ্রিটাউনে নাজমুন

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের রাজধানী ফ্রিটাউনে নাজমুন

দিন-রাতের তোয়াক্কা না করেই কখনো পর্বত, কখনো দুর্গম জঙ্গল বা বন্যপ্রাণীময় পাহাড় কিংবা অজানা ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীদের এলাকায় যেতে ভয় পাননি। বন্যপ্রাণীতে ভরা জঙ্গলে রাত কাটিয়েছেন, তীব্র ক্ষুধায় গরুর কাঁচা মাংস খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন, মৃত্যুর আশঙ্কা থাকার পরও ছুটেছেন উচ্চ পর্বতশৃঙ্গের দিকে। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও পিছনে ফিরে তাকাননি কখনো। অদম্য সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে গিয়েছেন। বলছিলাম লাল-সবুজের পতাকা হাতে একের পর এক দেশ জয় করা অপ্রতিরোধ্য নারী পরিব্রাজক নাজমুন নাহার এর কথা।

২০০০ সালে প্রথম ভারত সফর দিয়ে শুরু হয় তার পৃথিবীর ভ্রমণ অভিযাত্রা। গত ২০ বছরে বিশ্বের ১৪৪টি দেশে পদচিহ্ন রেখেছেন। অচিরেই তিনি ১৫০তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক স্পর্শ করবেন। তার স্বপ্ন কতটা শক্তিশালী বাস্তবে তিনি ঠিকই প্রমাণ করছেন। লাল-সবুজের পতাকা হাতে পা রাখবেন পৃথিবীর প্রতিটি দেশে এমনই প্রত্যাশা তার। বিশ্বজয়ী পরিব্রাজক হিসেবে এর মধ্যেই দেশের ‘পতাকা কন্যা’ খ্যাতি লাভ করেছেন তিনি।

স্পেনের গ্রান্ড ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জের রহস্যময় রাজ্যে

১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুরের হামছাদী ইউনিয়নের গঙ্গাপুর গ্রামে তার জন্ম। মধ্যবিত্ত পরিবারের বেড়ে ওঠা নাজমুন তিন ভাই, পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট। লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ২০০৬ সালে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্কুল-কলেজ জীবনে ছড়া-কবিতা লেখা নাজমুন কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছেন। এখন স্বপ্ন একটাই, তা হলো বিশ্বভ্রমণ। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য বহু প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে চলেছেন তিনি।  

নাজমুন নাহার একটি বাস্তব অভিযাত্রার ইতিহাস, যেন এক পৃথিবীর গল্প। যার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে পৃথিবীর অনেক উচু উচু পর্বত শৃঙ্গ, ভলকানিক সামিট, সমুদ্রের দ্বীপ-উপদ্বীপ, অচেনা সব শহর, নগর সীমান্তের বাস্তব গল্প। এর মধ্যে পাঁচবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। সকল বাধা পেরিয়ে একা একাই পাড়ি দিচ্ছেন পৃথিবীর দুর্গম পথগুলো।

জাপানের মিয়াজিমি দ্বীপে

নাজমুন নাহার তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানান, অনেক দ্বীপে রাতের অন্ধকারে পথ হারিয়ে আবার খুঁজে পেয়েছি। আফ্রিকার গিনি কোনাক্রিতে ২৬ ঘণ্টা রাতের অন্ধকারে জঙ্গলে আটকা পড়েছিলাম। জর্জিয়ার সনেটি প্রদেশ যাওয়ার সময় পথে গুলির মুখোমুখি হয়ে পাহাড়ে ৪ ঘণ্টা শুয়ে ছিলাম। সাহারা মরুভূমিতে ভয়ঙ্কর মরুঝড়ের মুখোমুখি হয়েছি, গুয়াতেমালায় ছিনতাইকারীর গুলি আর চুরির মুখোমুখি হয়েও ফিরে এসেছি কৌশলে। শুধু তাই নয় কিরগিস্তানের আলা আরচা পর্বত সামিটে উঠার সময় পা পিছলে পড়ে ছোট্ট একটা বুনো গাছের সাথে ঝুলে ছিলাম। ইথিওপিয়ার জঙ্গলে হামার আদিবাসীদের সাথে গরুর কাঁচা মাংস, আফ্রিকাতে তিনমাস আলু খেয়ে থাকতে হয়েছিল। সর্বোচ্চ আড়াই দিন না খেয়ে থাকার রেকর্ডও আছে।

জার্জিয়ার কাজবেগি ককেশাস পর্বতমালায় লাল সবুজের পতাকা হাতে নাজমুন নাহার

বেশির ভাগ ভ্রমণে তিনি সড়কপথ বেছে নিয়েছেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে দেখার জন্য সড়কপথকে সহজ মনে হয়েছে। সড়কপথে ভ্রমণের খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন দেশের ম্যাপ নিয়ে রিসার্চ করতাম কিভাবে কম খরচে ভ্রমণ করা যায়। শুধু কোন একটা দেশের শহর ঘুরে ফিরেই আসিনি, চেষ্টা করেছি তাদের কৃষ্টি, কালচার, ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার।

ভ্রমণের খরচের ব্যাপারে নাজমুন বলেন, ভ্রমণ খরচে আমি বরাবরই খুব স্পষ্টবাদী। ২০০৬ সালে সুইডেনে পড়াশোনা করতে গিয়ে সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করতাম। সামারে কখনো ১৭ ঘণ্টা কখনো ১৮ ঘণ্টা প্রচুর পরিশ্রম করে পয়সা জমাতাম শুধু ভ্রমণ করার জন্য। কম খরচে থাকতাম পৃথিবীর বিভিন্ন ট্রাভেলার্স হোস্টেলে, কখনো তাবু করে, কখনো কোচ সার্ফিং এর মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত নিজের যোগ্যতায় নিজের বলেই পৃথিবীর এতগুলো দেশ ভ্রমণ করেছি।  

দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ সোয়াজিল্যান্ডের মানজনি আদিবাসীদের সাথে
 
নাজমুন নাহারের প্রাপ্তির ঝুলিতে রয়েছে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা। কখনো তিনি হয়েছেন পিচ টর্চ বিয়ারার, কখনো আর্থ কুইন কখনো ডটার অব দ্যা আর্থ, কখনো ফ্ল্যাগ গার্ল, কখনো বা গেম চেঞ্জার অব বাংলাদেশ। বাংলাদেশে তার অর্জনের ঝুলিতে যোগ হয়েছে অনন্যা শীর্ষ দশ আওয়ার্ড। অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ডসহ দেশি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো বেশ কয়েকটি সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম