সর্বাধুনিক বাস টার্মিনাল সিলেটে

সর্বাধুনিক বাস টার্মিনাল সিলেটে

আহমেদ জামিল, সিলেট ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৫০ ৫ আগস্ট ২০২২   আপডেট: ২০:২৯ ৫ আগস্ট ২০২২

দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মিত হচ্ছে সিলেটে। সিলেটের ঐতিহ্য ও আধুনিক নির্মাণশৈলীর মিশেলে নির্মিত হচ্ছে এ নয়নাভিরাম স্থাপনা। প্রায় ৮ একর জায়গার উপর ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বাস টার্মিনালে রয়েছে উন্নত সব সুযোগ সুবিধা। আগামী মাসেই নির্মাণ কাজ শেষ হলে উদ্বোধন হবে সর্বাধুনিক এ বাস টার্মিনাল। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আসাম প্যাটার্নের বাড়ি ও আধুনিক স্থাপত্যরীতির মিশেলে নির্মিত বাস টার্মিনাল সাজানো হয়েছে কীন ব্রিজ ও আলী আমজদের ঘড়ির রঙে। টার্মিনালটির নকশা করেছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষক। তাদের দাবি, এটিই হবে দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক বাস টার্মিনাল। 

সিলেট নগরের কদমতলী এলাকায় পুরনো বাস টার্মিনালের জায়গায়ই প্রায় ৮ একর জায়গা জুড়ে নতুন বাস টার্মিনাল নির্মাণ হচ্ছে। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) উদ্যোগে ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে মিউনিসিপাল গভর্নমেন্ট সার্ভিস প্রজেক্ট (এমজিএসপি) প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। ৬ তলা ভিত্তির ৩ তলা কমপে¬ক্স প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ডালি কনস্ট্রাকশন। ইতোমধ্যে কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। 

নতুন এই টার্মিনালের নকশা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের তিন শিক্ষক সুব্রত দাশ, রবিন দে এবং মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। নকশাকার সুব্রত দে বলেন, বাস টার্মিনালের নকশায় সিলেটের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। সিলেটের ঐতিহ্য আসাম প্যাটার্ণের বাড়ি ও চাঁদনীঘাটের ঘড়ির আদলে এর নকশা করা হয়েছে। একইসঙ্গে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।

ছবি ডেইলি বাংলাদেশ

সরেজমিনে টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ইট রঙের স্টিলের ছাউনির নিচে নির্মাণ করা হয়েছে কারুকার্যময় লাল ইটের দেয়াল। রয়েছে বিমানবন্দরের আদলে আলাদা প্রবেশ ও বহির্গমন পথ এবং গাছপালা আবৃত গ্রিন জোন। যাত্রীদের জন্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ আসনের বিশাল ওয়েটিং লাউঞ্জও রয়েছে এখানে।

নির্মাণ সংশ্লিষ্টরা জানান, পুরো টার্মিনালের নির্মাণ কাজ তিনটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম অংশের বহির্গমন ভবনের দৈর্ঘ্য সাড়ে ৩০০ ফুট। এই অংশে ৪৮টি বাস একসাথে অবস্থান করতে পারবে। এছাড়া যাত্রীদের বসার জন্য রয়েছে ৯৭০ আসনের বিশাল হল, ৩০ আসনের ভিআইপি কক্ষ, ৩০টি টিকিট কাউন্টার ও নামাজের জন্য আলাদা কক্ষ। পুরুষ, নারী ও বিশেষ সুবিধা সম্পন্নদের ব্যবহার উপযোগী করে ৬টি টয়লেটও থাকবে এখানে। উপরে উঠার জন্য রয়েছে লিফট এবং খাবারের জন্য রেস্টুরেন্ট ও ফুড কোর্ট। এমনকি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়া যাত্রীর জন্য আলাদা শয্যা ও ব্রেস্ট ফিডিং জোন থাকবে এ টার্মিনালে।  

দ্বিতীয় অংশের আগমনী ভবনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০০ ফুট। এখানেও রয়েছে যাত্রীদের জন্য ৫১০ আসনের বসার স্থান ও ৩০ আসনের ভিআইপি কক্ষ, আধুনিক টয়লেট সুবিধা, ব্রেস্ট ফিডিং জোন, লিফট, রেস্টুরেন্টসহ অন্যান্য সুবিধা। আগমন ও বহির্গমন ভবন আলাদা করা হলেও পুরো টার্মিনালকে এক সঙ্গে সংযুক্ত করেছে একটি করিডোর। 

টার্মিনালের পেছনের দিকে তৃতীয় অংশে নির্মিত হয়েছে একটি মাল্টিপারপাস ওয়েলফেয়ার সেন্টার। মালিক ও চালক সমিতির জন্য থাকবে ২৪ বেডের বিশ্রাম কক্ষ, গোসলের ব্যবস্থা, অফিস, লকার ব্যবস্থা, ক্যান্টিন এবং মিটিং ও অনুষ্ঠানের জন্য মাল্টিপারপাস মিলনায়তন।

এছাড়া টার্মিনালের পশ্চিম-দক্ষিণ কর্নারে সড়কের সঙ্গেই গোলাকার ৫ তলা টাওয়ার বিল্ডিংয়ে রয়েছে টার্মিনাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা অফিস। যেখানে থাকবে পুরো টার্মিনালের সিকিউরিটি কন্ট্রোল ও সিসিটিভি মনিটরিং কক্ষ, পুলিশ কক্ষ এবং পর্যটন অফিস। 

নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডালি কনস্ট্রাকশনের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, এই প্রকল্পের স্টিলের টিন আনা হয়েছে তাইওয়ান থেকে। স্টিল স্ট্রাকচারের জন্য লোহার বার আনা হয়েছে চায়না থেকে এবং প্রতিটি জিনিস বুয়েটে টেস্ট করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, এখানে বিমানবন্দরের মতো বিশাল ওয়েটিং স্পেস রাখা হয়েছে। রয়েছে পার্কিং জোন ও গাছপালায় ঘেরা গ্রীণ জোন। পরিবহন শ্রমিকদের জন্য মাল্টিপারপাস বিল্ডিংয়ে থাকবে বিশাল হলরুম, অফিস, ওয়াশরুম, রেস্টরুমসহ বিভিন্ন সুবিধা।

প্রকল্পটির কাজ সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম মাহবুব। তিনি জানান, একেবারে আধুনিক বিমানবন্দর বা রেল স্টেশনের মত এই বাস টার্মিনালকে সাজানো হয়েছে। এক সাথে ৪৮ বাস যাত্রী উঠানাম করাতে পারবে। আন্তজেলা ও সারাদেশের গণপরিবহণগুলো একটি নিয়মের মধ্যে চলবে এই টার্মিনালে। প্রতিটি কাউন্টার থেকে বাস ছাড়ার আগে যাত্রীদের অবগত করার জন্য সাউন্ড সিস্টেম থাকবে। এটিএম বুথ থেকে শুরু করে সব ধরণের সেবা মিলবে এ স্টেশনে। কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ না করে কেউ বাসে ওঠতে পারবেন না। এসব পদ্ধতি চালু ও সার্বক্ষণিক দেখাশুনার জন্য বাস চালক ও মালিকদের সাথে আমরা বৈঠক করবো। 

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল হবে দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক বাস টার্মিনাল। এতে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে। ঐহিত্য ও আধুনিকতার মিশেলে নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীও সবার নজর কাড়বে। 

তিনি বলেন, গত জুন মাসে এই বাস টার্মিনালের কাজ শেষ করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বন্যা পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। আরো মাস দুয়েকের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। 

এ ব্যাপারে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, দৃষ্টিনন্দন এ টার্মিনাল পরিচালনার জন্য আলাদা নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। এখানে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা ও যাত্রী ওঠানামা করা যাবে না। ইচ্ছামতো কাউন্টার বসানো যাবে না। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে বসেই নীতিমালা তৈরি করা হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ