মাছ কুটে জীবন সংসার

মাছ কুটে জীবন সংসার

কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:২৮ ১০ জুন ২০২১   আপডেট: ১৬:৩৪ ১০ জুন ২০২১

মাছ কুটে জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রসনজিৎ দাস

মাছ কুটে জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রসনজিৎ দাস

ছোট একটি দোকান, দা, বটি নিয়ে বসে আছেন এক যুবক। পাশে রাখা আছে ছাই। যারা মাছ ক্রয় করছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখানে এসে দাঁড়াচ্ছেন। হাতে থাকা মাছভর্তি ব্যাগ আবার তার হাতে তুলে দিচ্ছেন। ব্যাগের ভেতরে থাকা মাছগুলো সযত্নে কুটে আবার ব্যাগে ভরে দিচ্ছেন। এ কাজের বিনিময়ে তাকে দেয়া হচ্ছে টাকাও। 

এমন দৃশ্য দেখা যায় ব্র্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় পৌর শহরের সড়ক বাজারের মাছ সবজি বাজারে। 

কথায় আছে মাছে ভাতে বাঙালি। ছোট বড় সবার কাছে মাছ খুবই প্রিয়। অনেকেই ছোট বড় মাছ কিনতে চান কিন্তু কুটতে সমস্যা তাই বাড়ি নিতে চান না। বর্তমানে মাছ কুটার মধ্যেও যেন আধুনিকতা ছোঁয়া পৌঁছে গেছে। এভাবেই মাছ কুটে জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রসনজিৎ দাস নামে এক যুবক। 

পৌর শহরের সড়ক বাজার এলাকায় মাছ বাজারে ভাড়ায় একটি দোকান নিয়ে তিনি ৬ বছর ধরে এ কাজ করে আসছেন। মাছ কুটার কাজ করে দৈনিক তার আয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। 

প্রসনজিৎ সদর উপজেলার শ্যামনগর গ্রামের নিহিল দাসের ছেলে। পরিবারে বাবা, মা, স্ত্রী, ছেলেসহ ৫ জন সদস্য রয়েছেন। মাছ কুটে তিনি পরিবারে অভাব অনটন গুছিয়ে বর্তমানে সুখ শান্তিনেই দিনানিপাত করছেন। 

প্রসনজিৎ বলেন, প্রতিটি মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডির মধ্যে দৈনন্দিন কিছু না কিছু কাজ করে সাংসারিক জীবন ব্যবস্থার মান উন্নয়ন করার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে অনেকের সাংসারিক জীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে আসে আবার কারো আসে না। আমি শুধু সেই চেষ্টা করছি।

মাছ কুটার কাজ করে দৈনিক তার আয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। 

তিনি আরো বলেন, এক সময় মাছের আড়তে শ্রমিকের কাজ করতাম। সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় চলা খুবই কষ্টকর হয়ে যায়। তাই এই পেশা ছেড়ে এখন বাজারে মাছ কুটার কাজ করছি। প্রতিদিন সকাল ৮ থেকে দুপুর পর্যন্ত এ কাজ করি। 

বিভিন্ন শ্রেণি পেশার কর্মজীবী লোকজন অনেকেই মাছ কিনে কুটার জন্য তার কাছে নিয়ে আসেন। তিনি প্রতি কেজি মাছ কুটে নেন ১৫ টাকা। প্রতিদিন এভাবে মাছ কুটে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা তার আয় হয় বলে জানান। তবে সপ্তাহে ছুটির দিন শুক্রবারে বাজারে ক্রেতা সমাগম বেশি হওয়ায় তার ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই কাজের সহযোগিতার জন্য তার দোকানে একজন শ্রমিক রাখা হয়েছে। প্রতি মাসে দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিক বেতন ,অন্যান্য খরচ বাদে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা তার আয় হয়। 

তিনি বলেন, পথে নামলে পথ চেনা যায়। কোনো কাজকে ছোট ভাবতে নেই। কোনো কাজের ইচ্ছা শক্তি আর আগ্রহ থাকলে ক্ষুদ্র কাজের মধেমেও জীবন বদলানো যায়। সেই চেষ্টাই করছি। 

বাজারে আসা একাধিক কর্মব্যস্ত লোকজন জানান, সারা দিন তাদের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। বাসায় কাজের লোকের সমস্যা রয়েছে। দৈনিক স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের কাজ, কেনাকাটা আর রান্নাবান্নার মতো জরুরি কাজ করে তারা এক প্রকার হাঁপিয়ে উঠছেন। তাই সময় বাঁচাতে বাজার থেকে মাছ কিনে সেখান থেকেই কুটে বাসায় নিয়ে যান। এতে আর কোনো বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় না। 

পৌর শহরের রাধানগর এলাকার মো. আশিক মিয়া বলেন, তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আছেন। বাসায় তার স্ত্রী ও ১ ছেলে রয়েছে। স্ত্রী বেশ কয়েক দিন ধরে অসুস্থ হওয়ায় তাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। তাই বাজার থেকে কেনা মাছগুলো কুটে নিয়েছেন। এজন্য প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা করে দিতে হয়েছে। 

হীরাপুরের মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, করোনার এই সময়ে সব সময় বাজারে আসা হয় না। তাই এক সঙ্গে ১৫ দিনের বাজার করা হয়। এরমধ্যে ১০ কেজি রুই ও কাতল মাছ রয়েছে। বাড়িতে বাড়তি ঝামেলা এড়াতে বাজার থেকেই মাছগুলো কুটে নেই।

মাছ কুটার কাজ করে দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।  

সড়ক বাজারের ব্যবসায়ী মুসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, বাসায় কাজের মানুষ না থাকায় খুবই কষ্ট হচ্ছে। যখন মাছ কেনা হয় তখন এইগুলো কুটে নেয়া হয়। এই ব্যবস্থা না থাকলে আমাদের মতো পরিবারগুলো যেন মাছ খাওয়া ছেড়ে দিতে হতো। মাছ কুটার ঝামেলা না থাকায় এখন রীতিমতো মাছ কিনে খাওয়া যাচ্ছে। 

শিক্ষক আয়েশা আফরোজ জানান, তার স্বামী ঢাকায় ব্যবসা করেন। তিনি এক ছেলে নিয়ে আখাউড়ায় আছেন। তার বাসায় মেহমান আসবে বলে বাজার থেকে তিনি ৫ কেজি ওজনের একটি কারফিউ মাছ ক্রয় করে সেটি কেটে বাসায় নিয়ে যান । মাছ কুটার কাজটি করতে পেরে তিনি খুবই খুশি। তিনি মনে করেন এটি এক ধরনের সেবা। যারা বাসা বাড়িতে নানা সমস্যায় আছেন তাদের অনেক উপকার হচ্ছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে