ইয়েমেন থেকে পাথরে ভেসে আসেন মহান সাধক শাহ রুস্তম বাগদাদী (র.)

ইয়েমেন থেকে পাথরে ভেসে আসেন মহান সাধক শাহ রুস্তম বাগদাদী (র.)

আবুল বাসার আব্বাসী, মানিকগঞ্জ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:৪৯ ৪ মে ২০২১   আপডেট: ১৩:১৯ ৫ মে ২০২১

সুফি সাধক হযরত শাহ রুস্তম বাগদাদীর (র.) মাজার ও ঐতিহ্যবাহী মাচাইন মসজিদ।

সুফি সাধক হযরত শাহ রুস্তম বাগদাদীর (র.) মাজার ও ঐতিহ্যবাহী মাচাইন মসজিদ।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে ইয়েমেন শহর থেকে পাথরে ভেসে এসে ইসলাম প্রচার শুরু করেন মহান সাধক শাহ রুস্তম বাগদাদী (রহ.)। উপজেলার মাচাইন গ্রামে খানকা প্রতিষ্ঠা করে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজ শুরু করেছিলেন। এটি একটি ঐতিহাসিক স্থান। 

মাকিগঞ্জ জেলা শহর থেকে ২২-২৩ কিলোমিটার দক্ষিণে হরিরামপুর ও শিবালয় উপজেলার সীমান্তে ইছামতি নদীর পাশেই গ্রামটি অবস্থিত। এই গ্রামে রয়েছে সুফি সাধক হযরত শাহ রুস্তম বাগদাদীর (র.) মাজার ও ঐতিহ্যবাহী মাচাইন মসজিদ। 

শিলালিপি অনুযায়ী ১৫০১ সালে দৃষ্টি নন্দন মসজিদটি হোসেন শাহ্ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। চুন, সুরকি ও সাদা সিমেন্ট দিয়ে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট আকর্ষণীয় এই মসজিদটি দেশের অন্যতম পুরাকীর্তির একটি।

ইয়েমেন শহর থেকে পাথরে ভেসে এসে ইসলাম প্রচার শুরু করেন মহান সাধক শাহ রুস্তম বাগদাদী (রহ.)
  
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৪৫ শতাংশ জায়গার ওপর নির্মিত মসজিদটির মূল অংশের ওপর রয়েছে তিনটি গম্বুজ। উত্তর ও দক্ষিণ পাশের গম্বুজের চেয়ে মাঝের গম্বুজটি একটু বড় যা সবার দৃষ্টি কাড়ে। মসজিদটির মূল অংশের ওপর রয়েছে নিখুঁত কারুকাজ। প্রাচীন এ মসজিদটি ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। কয়েক বছর আগে মসজিদটি সংস্কার-করা হয়েছে। মাজার এবং মসজিদের মাজখানে সংরক্ষণে রাখা হয়েছে ছফর সঙ্গী হিসেবে ভেসে আসা পাথর। রঙিন টিনের একটি চারচালা হুজরা খানা, এবং এতিমখানা।

সুফি সাধক হযরত শাহ রুস্তম বাগদাদীর (র.) মাজার ও ঐতিহ্যবাহী মাচাইন মসজিদ।

স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী প্রায় ৮০০ বছর আগে সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে হযরত শাহ রুস্তম বাগদাদী নামে এক কামেল দরবেশ ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ইয়েমেন থেকে সমুদ্র পথে পাথরে ভেসে এ দেশে আসেন। তিনি ইছামতি নদীর চরে বাঁশের তৈরি মাচানে বসে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করতেন। সে সময় মাচাইন গ্রামে একটি খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। 

খানকার পাশে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণ করেন। যা মাচাইন মসজিদ নামে পরিচিত। হজরত শাহ রুস্তম অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তার এ অলৌকিক গুণে মুগ্ধ হয়ে এলাকার লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে হজরত শাহ রুস্তমের অনুসারীরা খানকার আশপাশে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন। মাচানের নামানুসারে মাচাইন নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে জানা যায়।

ইয়েমেন শহর থেকে পাথরে ভেসে এসে ইসলাম প্রচার শুরু করেন মহান সাধক শাহ রুস্তম বাগদাদী (রহ.)

হজরত শাহ রুস্তম যখন মাচাইন গ্রামে আসেন, তখন কোশী ও তিস্তার স্রোতধারা অবলম্বন করে প্রাচীন ভুবনেশ্বর নদী প্রবাহমান ছিল বলে জানা যায়। বিক্রমপুর, সোনারগাঁও, ঢাকা, সাভার ও ধামরাইয়ের সঙ্গে পশ্চিমবাংলা ও পশ্চিম ভারতীয় রাজধানীগুলোর জলপথের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ অঞ্চল ছিলো মাচাইন গ্রামে।

সুফি সাধক হযরত শাহ রুস্তম বাগদাদীর (র.) মাজার

তৎকালীন স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ নদীর ওপর মাচায় বসা ধ্যানরত মহান সাধক হজরত রুস্তম শাহ (র.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তার নৌকার মাঝি-মাল্লাদের যাত্রাবিরতির নির্দেশ দেন। পরে হজরত রুস্তম শাহ্ (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

সুলতান আলাউদ্দিন মুসলিম শাসক ছিলেন। তিনি হজরত রুস্তম শাহের ইসলাম প্রচারে খুবই খুশি হন। এই মহান সাধকের প্রতি তার বিশেষ ভক্তি-শ্রদ্ধা বিশ্বাস বেড়ে যায়। তার শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ এলাকায় ইসলাম প্রচারের সুবিধার্থে ১৫০১ সালে এখানে একটি সুরম্য মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তিন গম্বুজবিশিষ্ট নান্দনিক শিল্পে মুসলিম শাসক আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্ প্রতিষ্ঠিত মসজিদটি, হজরত রুস্তম শাহ্ (রহ.) নামে নামকরণ করেন। 

সুফি সাধক হযরত শাহ রুস্তম বাগদাদীর (র.) মাজার

উপজেলার বাস্তা গ্রামের রমেশ দাস বলেন, শাহ্ হজরত রুস্তম শাহ্ (রহ.) হলেন জিন্দা ওলি। প্রতি বছর ফাল্গুনের ২২, ২৩ তারিখে দুইদিন ওরস হয়। দেশ-বিদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ আসেন। এখানে জাত-বেজাত নেই। ভক্তদের পদচারণায় তখন মাচাইন এলাকা থাকে মুখরিত। 

তিনি আরো জানান, প্রথমে মাজারের জায়গা ছিলো কম। মাত্র ৩৩ শতাংশ। কিন্ত মানুষের জায়গা না হওয়ায় এলাকার দুই মামা ভাগ্নে আনোয়ার হোসেন এবং সোনা মিয়া ১৪ শতাংশ জমি মাজারের নামে দান করে দিয়েছেন। এখন মাজার দেখাশুনার দায়িত্ব সরকার নিয়ে গেছে। ইউএনও এর সভাপতি। মাজারের আয় ব্যয় সরকার নিয়ে যায়। 
 
মাওলানা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ১৩ বছর যাবত এই মসজিদের ইমাম হিসিবে মাজারের খেদমতে আছি। এখানে প্রতিদিন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ আসেন। অলির দরবার দেখতে আসেন। বর্ষাকালে এবং শুক্রবারে বেশি মানুষ আসেন। এখন করোনার কারণে মানুষ কম আসেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে